খেলা ও ধুলা

স্যরি, আমি দুঃখ বিলাস করতে পারছি না…

স্যরি, শেক্সপিয়ার হতে পারছি না। আরেকটি ট্র্যাজেডি নাটক লিখতে পারছি না। দুঃখ বিলাস করতে পারছি না…

একবার-দুবার শোকগাঁথা রচনা করা যায়। আয়োজন করে দু:খ পান করা যায়। ভাগাভাগি করে কষ্ট কমানো যায়। কিন্তু এভাবে বারবার হলে হতাশ লাগে। বিরক্ত লাগে। রাগও হয়…

ক্রিকেট নিয়ে শেষ আশাবাদী মানুষটিই হয়ত আমি। তবু আজ হতাশ লেগেছে। দু:সময়ে দলের পাশে দাঁড়ানো শেষ মানুষটিও হয়ত আমি। আজ তবু বিরক্ত লেগেছে…

বিরক্তি এসেছে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখে। হতাশা এসেছে সম্ভাব্য শঙ্কা থেকে…

এই ম্যাচটি হতে পারত, কিংবা হতে পারে, আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর… দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে…

হতে পারে আগামী ২ জুলাই। এজবাস্টনে ভারতের বিপক্ষে। কিংবা ৫ জুলাই। লর্ডসে পাকিদের বিপক্ষে। যে ম্যাচের ফলের ওপর হয়ত নির্ভর করবে ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা…কিংবা কে জানে, হয়ত এমনটি হতে পারে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেই, এজবাস্টন কিংবা ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে…!

বিদেশের মাটিতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়ের হাতছানি কম গুরুত্বপূর্ণ নয় অবশ্যই। এই সিরিজকে ছোট করে দেখার কারণ নেই। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা যেভাবে চলছে, আরও বড় মঞ্চে যখন হবে, আরও বড় উপলক্ষ্যে যখন হবে, যেমনটি আগে হয়েছে এশিয়া কাপ বা টি-টোয়েন্টে বিশ্বকাপে, আবার হলে কি হবে?

তখন আবার আমরা শোকগাঁথা রচনায় বসে যাব? হ্যাঁ, প্রেক্ষাপট, পারিপার্শ্বিকতা, সেদিনের বাস্তবতা চাইলে আবারও শেক্মপিয়ার হতে পারি। কিন্তু সেই দিনটি যেন না আসে, তার প্রস্তুতি তো থাকতে হবে!

এবার ভরা গ্যালারির চাপ ছিল না, উপলক্ষ্যের বিশালত্ব ছিল না, বিদেশের মাটিতে র‌্যাঙ্কিংয়ে নিচে থাকা দলের সঙ্গে খেলা, প্রতিপক্ষের বোলিংয়ে ভয়ঙ্কর কেউ ছিল না। এই ম্যাচেও এসব পরিস্থিতিতে না পারলে, এই ম্যাচেও আগের ভুল শোধরাতে না পারলে কিভাবে হবে!

চাইলে আজকের ম্যাচে একজন একজন করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। মোসাদ্দেক, কেন দুটি বল ডট যাবে? চার-ছক্কা না হোক, স্মার্টলি খেলে দুই বলে দুটি ডাবল নেওয়া যেত না? মানছি ওই পজিশনে ওই পরিস্থিতিতে তার জন্য কাজটা কঠিন। কিন্তু এসব দিনই তো সুযোগ! এই ছোট ছোট সুযোগ কাজে না লাগালে বড় ক্রিকেটার হবে কিভাবে ভাই..! দেশকে জেতানোর সুযোগ, হোয়াট আ ব্লাডি অনার…!

সাব্বির…এই সব পরিস্থিতির জন্যই তো তাকে দলে নেওয়া। ২৯ বলে ৪০ লাগত, হাতে ৬ উইকেট। আদর্শ প্রেক্ষাপট। সেখান থেকে ১৩ বলে ১৪ রান। এই সুযোগ কতটা হেলায় হারালেন! ১১ বল খেলেছেন, চারটি পেয়েছিলেন ফুল টস… চার-চারটি ফুল টস, নট আ ব্লাডি জোক…! ওই চার বলে অন্তত তিনটি বাউন্ডারি তো হওয়া উচিত ছিল…খেলা তাহলে কবেই শেষ!

কিমো পলের ফুল টসে আউট হলেন। সুইপ মতো খেলে উড়িয়ে মারতে চাইলেন মাঠের সবচেয়ে বড় জায়গা দিয়ে। এটা কি স্মার্ট ক্রিকেট হলো? মানলাম, ফুল টসে আউট হন অনেকে, হতেই পারেন। পলের আরও দুটি ফুল টসে আগে নিয়েছেন সিঙ্গেল, ডিপ পয়েন্ট আর লং অনে। সেই দুটিও মানলাম। কিন্তু হোল্ডারের বলে লেগ স্টাম্পে যে ফুল টসে সিঙ্গেল নিলেন, সেটির ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। ওই বলে ছক্কা, অন্তত চার না হওয়ার কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ থাকতে পারে না…

রিয়াদ, মানছি ওই রানটা হতে পারত। ওসব রান হয়। কিন্তু এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, খুব জরুরী ছিল না… ভয়ঙ্কর চাপ তো ছিল না, ম্যাচ ছিল মুঠোয়! যে দল বারবার এভাবে শেষ দিকে ভেঙে পড়ে, সেই দলের একটা ভরসার জুটির থেমে যাওয়া মানে বিপদকে আমন্ত্রণ জানানো…

সাকিব, এই ম্যাচে শুধু তার ব্যাটিং নিয়েই অভিযোগের জায়গা খুব একটা নেই। তবে অভিযোগ হতে পারে আউটের ধরণ নিয়ে। সেই যে কবে থেকে তামিমকে দেখাতে চান, একটা ম্যাচ শেষ করে আসবেন, সেটি দেখাতে হবে না?

আরও পড়ুন- দুঃখিত, আমি তামিম হেটার নই!

তামিম, ১৮ বলে ২৭ থেকে পরের ৬৭ বলে ২৭, কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়ার মতো নয় ম্যান! আর করলেও সেটি পুষিয়ে দেওয়া উচিত ছিল ঠাণ্ডা মাথায়। আগে অনেকবার করেছেন। কিন্তু আজকে ফিফটি হওয়ার পর থেকেই যে ছটফট করা, বিশু বোলিংয়ে আসার পরই যে অস্থিরতা, বোঝাই যাচ্ছিল, উইকেট হারাতে চলেছেন। দেশের সফলতম ব্যাটসমানের কাছ থেকে আরও পরিণত ব্যাটিংই ছিল প্রত্যাশিত…

বিজয়, ৯ বলেই ফুটিয়ে তুললেন যেন তার ক্যারিয়ার। তার সামর্থ্য কতটা এবং কিভাবে সেটির অপচয় করছেন, তার একটা ডকুমেন্টারি দেখালেন। আগ্রাসী, ইতিবাচক থাকা মানে সব বলে তেঁড়েফুড়ে আসা নয়। হোল্ডারের পেসে বেরিয়ে এসে খেলা আর জোসেফের পেসে বেরিয়ে আসা এক নয়, এই স্মার্টনেস কেন থাকবে না? কী দারুণ সুযোগ হারালেন আজ…!

এবং মুশফিক… এত অসাধারণ ব্যাট করেছেন, দলকে জয়ের দুয়ারে নিয়ে গেছেন, তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়ত ঠিক নয়। কিন্তু শেষ পথ পাড়ি দেওয়ায় সবচেয়ে বড় দায়িত্বটুকু তো তারই ছিল! ফুল টস হোক বা ইয়র্কার, শেল ছুটে আসুক বা ক্ষেপনাস্ত্র, তাকেই সামলাতে হতো… আগেও কয়েকবার কাছে গিয়ে পারেনি বলেই দায় আরও বেশি। ২০১২ এশিয়া কfপে পেরেছিলেন, নিদাহাস ট্রফিতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই কদিন আগেই, আফগানদের বিপক্ষে এভাবেই ঠিক শেষ ওভারের প্রথম বলে আউট হয়েছিলেন। আজ তো সেসবের তুলনায় চাপই ছিল না তেমন…!

প্রথম ওভারে হোল্ডারের দেওয়া ২০ রান কেউ মানে রাখবে না, কারণ তিনি শেষের নায়ক। দুর্দান্ত ইনিংস খেলেও যেমন প্রশ্নবিদ্ধ মুশফিকের শেষটুকু…

ওপরের যে কোনো একজনও নিজের ভূমিকা পালন করলে জিতত দল। প্রশ্ন তাই সবাইকে করতে হবে, গোটা দলকে করতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে…

একটা ব্যাপার তবু ভালো হয়েছে, অধিনায়ক ম্যাচ শেষে অজুহাতের পথে হাঁটেননি। বলেছেন যে বারবার ভুল করেও আমরা শিখছি না। এই বার্তা আশা করি কোচ ও অধিনায়ক আরও শক্ত করে, আরও কড়া ভাবে দেবেন ড্রেসিং রুমে…

সহমর্মিতার সময় এটা নয়, বরং ঘা দিয়ে সহযোগীতার সময়। এই সব ম্যাচ দিয়ে ভুল না শোধরালে বড় মঞ্চে আবার হবে। আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন, আত্মোপলব্ধি প্রয়োজন। বিষাদে ডুবে থাকলে চলবে না। আবেগের বর্ম গায়ে চাপিয়ে ব্যর্থতা আড়াল করা চলবে না..যে ভাবে হোক, যে করে হোক, বারবার জাপ্টে ধরা এই স্নায়ুর জাল ছিঁড়তে হবে… সিম্পল।

সামনের পথচলায় দুবাই বা এজবাস্টন কিংবা ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে আবার একই ধরণের বিষাদকাব্য দেখতে ও লিখতে চাই না…আর শেক্সপিয়ার হতে চাই না…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button