ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ধর্ষক-নিপীড়ক-খুনীর মুক্তির দাবীতে যেখানে মিছিল করা হয়!

আমার মাঝেমধ্যেই মনে হয়, পুরো বিশ্বে যতো অসভ্য, ইতর এবং হিংস্র প্রজাতির যতো মানুষ আছে, তাদের সিংহভাগই বাংলাদেশে বসবাস করে। নইলে বিশ্বের আর কোন দেশে ধর্ষক-নিপীড়ক বা হত্যাকারীর মুক্তির দাবীতে কয়েকশো লোক একত্রিত হয়ে মিছিল করতে পারে? ফেনী জেলার সোনাগাজীতে সেটাই হয়েছে। নিপীড়নের শিকার হওয়ার পরে মামলা করায় এক কলেজছাত্রীকে আগুনে ঝলসে দেয়া হয়েছে সেখানে, মেয়েটা এখন মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। শরীরের সত্তরভাগ পুড়ে গেছে তার, ডাক্তারেরাও খুব একটা ভরসা দিতে পারছেন না। আর সেই মূহুর্তে আসামী হিসেবে আটক মাদ্রাসা অধ্যক্ষ্যের মুক্তির দাবীতে রাস্তায় নেমেছে কিছু অমানুষ!

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ্য সিরাজ উদ দৌলা নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানী করেছিল সেই তরুণীর, এই অভিযোগে গত ২৭শে মার্চ মামলা করে সেই মেয়ের পরিবার। অধ্যক্ষকে গ্রেফতারও করা হয়। এরপর থেকেই ক্রমাগত হুমকি-ধামকি পেয়ে আসছিল পরিবারটি। গত ৬ই এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে গিয়েছিল মেয়েটা। তার এক বান্ধবীকে কেউ আটকে রেখে মারধর করছে, এই কথা বলে কৌশলে তাকে ছাদে নিয়ে যায় আক্রকণকারীরা। ছাদে যাওয়ার পরেই চারজন আততায়ী তাকে বেঁধে ফেলে, এবং বলে সে যাতে পুলিশের কাছে স্বীকার করে যে অধ্যক্ষ্যের বিরুদ্ধে তার করা মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মিথ্যা।

তাদের কথামতো কাজ করতে রাজী না হওয়ায় ওড়না এবং দড়ি দিয়ে সেই কিশোরীর হাত বেঁধে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষ্য সিরাজ উদ দৌলার পাঠানো চ্যালাচামুন্ডারা। সেই ছাত্রীকে খুন করার সবরকম প্রস্তুতি নিয়েই সেদিন এসেছিল লোকগুলো। হামলার শিকার সেই মেয়েটার অবস্থার অবনতিই হয়েছে দিনকে দিন, শরীরের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, দেশের বাইরে পাঠানোর মতো অবস্থাও নেই এখন।

মজার ব্যাপার কি জানেন? নুসরাত জাহান রাফী নামের এই কিশোরীর পুড়ে অঙ্গার হওয়াটাকে বড় করে না দেখে একটা পক্ষ ঠিকই ওই খুনী লম্পট অধ্যক্ষ্যের গ্রেফতার হওয়াটাকেই বড় করে দেখছে। পুরো ব্যাপারটাকেই ‘সাজানো ঘটনা’ হিসেবে দাবী করে একদল অমানুষ এবং পটেনশিয়াল রেপিস্ট মিছিল বের করেছে অধ্যক্ষ্যের মুক্তির দাবীতে, যেন নারী নিপীড়নকারী ধর্ষককে জেলের ভেতরে রাখাটাই অপরাধ! এদের সংখ্যা একদম হাতেগোনাও তো নয়। ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে সোনাগাজীতে মিছিল বের করার সামর্থ্য যখন তারা রাখে, বুঝতেই হবে এরা যথেষ্ট প্রভাবশালী।

আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই অধ্যক্ষ্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ কিন্ত এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে, মাদ্রাসার দপ্তরিই পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে বলেছে এসব কথা। তবে নুসরাত জাহান রাফীর আগে কেউ সাহস করে মামলা করতে পারেনি, ধর্ষকামী এই লম্পট সিরাজ উদ দৌলাকে জেলের ভাত খাওয়াতে পারেনি কেউ। রাফী পেরেছেন, আর তাই শরীরের সত্তরভাগ পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে তাকে কাতরাতে হচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে।

রাফীর ওপরে হামলার বিচার দাবীতে মানববন্ধন হয়েছে ঢাকায়, আরও কয়েক জায়গায় অনেকেই ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়েছে, জানান দিয়েছে, রাফীর পাশে আছেন তারা। কিন্ত এই মানুষগুলোর সংখ্যা একদমই হাতেগোনা। কারণ এদের কাউকে নগদ টাকা দেয়া হয়নি, খাবার খাওয়ানো হয়নি। তবুও তারা রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন মানবতার তাগিদে। অথচ যে জায়গায় রাফীর ওপরে হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেখানেই মানববন্ধন বা প্রতিবাদ কর্মসূচী করতে দেয়া হচ্ছে না! প্রভাবশালী লোকজনের পক্ষ থেকে নাকি হুমকি দেয়া হচ্ছে। মানববন্ধন তো দূরের কথা, সেখানে উল্টো নিপীড়ক সেই অধ্যক্ষ্যের মুক্তির দাবীতে মিছিল বের করা হয়েছে!

রাফীর ওপরে যারা হামলা করেছিল, তাদের মধ্যে অন্তত একজন ছিল নারী, রাফী যাকে ‘শম্পা’ বলে উল্লেখ করেছেন। অধ্যক্ষ্য সিরাজ উদ দৌলার মুক্তির দাবীতে সোনাগাজীতে যে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, সেটার অগ্রভাগেও বোরখা পরিহিত কয়েকজন নারীকে দেখা গেছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারী পুরুষদের প্রায় সবারই পরণে ছিল পাঞ্জাবী-টুপি। মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেয়ার জন্যেই হয়তো এই বেশভূষা।

মিছিলে অংশগ্রহণকারী, বা মিছিলের আয়োজক এই লোকগুলো কারা, সেটা আমরা জানতে চাই। কারা ধর্ষকের মুক্তি দাবী করে, তাদের নাম-ঠিকানা আমাদের জানা দরকার। এরা প্রত্যেকে একেকজন পটেনশিয়াল রেপিস্ট, সুযোগ পেলেই হায়েনার মতো নারীদের ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলার জন্যে এরা প্রস্তুত হয়ে থাকে সবসময়, আর তারপর ধর্ষণের জন্যে নারীর পোষাককে দোষারোপ করে। সিরাজ উদ দৌলার পাশাপাশি এই লোকগুলোকেও গ্রেফতার করা সময়ের দাবী, নইলে কাল-পরশু হয়তো এরাই ধর্ষণ করবে কাউকে। এই অমানুষদের সামনে তো কেউই নিরাপদ নয়। একজন ধর্ষক, নিপীড়ক, আগুনে পুড়িয়ে মারতে চাওয়া একজন হত্যাকারীর মুক্তি যারা দাবী করে, তাদের মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর তো কোন অধিকার নেই।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button