খেলা ও ধুলা

প্রত্যাবর্তনের গল্পটা এরচেয়ে ভালোভাবে লেখা যেতো না আর!

রিভিউটা অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে যেতেই স্টুয়ার্ড ব্রড মুখ বাঁকালেন। অভিজ্ঞ এই পেসার হয়তো তখনই বুঝে গিয়েছিলেন, উইকেটে খুঁটি গেঁড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আজ ভুগিয়ে ছাড়বে তাদের সবাইকে।

শেষমেশ স্টিভেন স্মিথকে বোল্ড করেছেন সেই ব্রডই, ওই উইকেটটা নিয়ে ইনিংসে পাঁচ উইকেট হয়ে গেছে তার। কিন্ত তারপরও দিনশেষে স্টুয়ার্ট ব্রড বা জো রুটরা মুখে হাসি নিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরতে পারলেন কই? ওই হাসি তো কেড়ে নিয়েছেন এক স্টিভেন স্মিথই!

পনেরো মাস পরে টেস্ট ক্রিকেটে ফিরেছেন। জোহানেসবার্গের সেই অভিশপ্ত টেস্টটাকে স্মিথ হয়তো আর মনে করতে চাইবেন না কখনোই। বল টেম্পারিঙের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন ক্যামেরন ব্যানক্রাফট। সতীর্থকে বাঁচাতে নিজেদের কাঁধে দায়ভার তুলে নিয়েছিলেন সেই সময়কার অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ এবং সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার। ফলাফল? ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া দুজনকে নির্বাসনে পাঠালো এক বছরের জন্যে।

নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরেছেন দুজনেই। দারুণ একটা আইপিএল কাটিয়েছেন ওয়ার্নার, বিশ্বকাপেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছেন রোহিত শর্মার চেয়ে মাত্র এক রান পেছনে থেকে। সেই তুলনায় স্মিথের ব্যাটের হাসিটা ছিল মলিন। কে জানে, গোলাবারুদ সবটা হয়তো অ্যাশেজ্র জন্যে জমিয়ে রেখেছিলেন। গতকাল বার্মিংহামে ঢেলে দিলেন ভাণ্ডারের সবটুকুই।

১২২ রানে পতন ঘটেছে অষ্টম উইকেটে। সেখান থেকে একটা দল বড়জোর কত রানে অলআউট হতে পারে? মাথায় রাখবেন, ব্রডের গতি কিংবা ওকসের সুইঙের কোন জবাবই তখন খুঁজে পাচ্ছেন না অস্ট্রেলিয়া। ১৩০? ১৪০? ১৫০? নাহ, অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থামলো ২৮৪ রানে! শেষ দুই উইকেটে এসেছে পাক্কা ১৬২ রান! লেজের দিকের দুই ব্যাটসম্যান পিটার সিডল আর নাথান লায়নকে সঙ্গে নিয়ে একাই লড়েছেন স্মিথ, বাউন্ডারি, সিঙ্গেল আর ডাবলের ফুলঝুরি ছুটিয়েছেব মাঠের চারপাশে।

ফণা তুলে ধেয়ে আসছিলো আগুনের গোলা, সামলে খেলেছেন প্রতিটা মূহুর্তে। বাজে বল পেলেই শায়েস্তা করেছেন, ওভারের শেষপ্রান্তে স্ট্রাইক রোটেট করে আগলে রেখেছেন সতীর্থকে। শেষ উইকেটে ৭৪ রান তুলেছে অস্ট্রেলিয়া, তাতে লায়নের অবদান মাত্র ১২, অতিরিক্ত কয়েক রান বাদে বাকীটা এসেছে স্মিথের ব্যাট থেকেই।

মঞ্চ প্রস্তুত ছিল, তাকে বরণ করে নেয়ার জন্যে নয়। ইংল্যান্ডের দর্শকেরা শিরিশ কাগজ নিয়ে এসেছিলো মাঠে, স্লেজ করার জন্যে। দুয়োধ্বনি তো চলছিলোই। সেসব সামলে নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিংটা করে গেছেন। নিষেধাজ্ঞায় পড়ার আগে কেন তাকে বিশ্বের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান বলা হতো, তার প্রমাণ দিয়েছেন প্রতিটা মূহুর্তে। টেম্পারমেন্টের দারুণ পরীক্ষা নিয়েছেন ইংরেজ বোলারেরা, তাতে লেটার মার্ক নিয়ে পাশ করে গেছেন স্মিথ।

২১৯ বলে ১৪৪ রানের ইনিংস, ১৬টা চার, দুটো ছক্কা। স্কোরবোর্ড কখনও বোঝাতে পারবে না, মাঝারি এই ইনিংসটাতে ধ্রুপদী রোমাঞ্চ, স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনা আর সংগ্রামের কি দারুণ একটা গল্প মিশে আছে। স্মিথ প্রমাণ করলেন, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট! স্মিথ দেখিয়ে দিলেন, এভাবে রাজার মতোই ফিরে আসতে হয়, রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে হয়। এই টেস্টের ফলাফল কি হবে সেটা এখনও অজানা। কিন্ত স্মিথ যে তার লড়াইটাতে জিতে গেছেন, এটা তো নিশ্চিত।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button