মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

কেন স্মিথদের ট্রিটমেন্ট নিতে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যেতে হয়?

স্টিভেন স্মিথকে ডাক্তার দেখাতে ফিরে যেতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। বাংলাদেশেই তো দেখাতে পারতেন। সাকিবরা যখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন, তারা তো সেখানেই দেখান। তাহলে স্মিথ বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় কেন দেখাবে না এখানে? এমন নয় যে অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসকরা এলিয়েনদের বই পড়ে ডাক্তার হয়েছে। আমরা যা পড়েছি তারাও তাই পড়েছে। এমন না যে অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তাররা আমাদের চাইতে বেশি রোগী হ্যান্ডেল করেছে। একজন ব্রিটিশ সার্জনের সাথে দেখা হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিলাম তিনি প্রতিদিন গড়ে কতগুলো রোগী দেখেন। তিনি জবাব দিয়েছেন- সপ্তাহের ২/৩ দিন যায়, রোগী না দেখেই কাটিয়ে দিতে হয়। কারণ সেখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা। চমৎকার রেফারেল সিস্টেম। আমার ধারণা আমি ইন্টার্ন লাইফে যে পরিমান রোগীর ট্রিটমেন্ট অর্ডার লিখেছি, তারা ১০/২০ বছরেও তত রোগী দেখে না। আমাদের অভিজ্ঞতা, রোগী ম্যানেজ করার চাইতে তাদের স্কিল বা অভিজ্ঞতা তো বেশি নয়।

তাহলে কেন স্টিভেন স্মিথ খেলা অবস্থায় এখানে দেখিয়ে, ডায়াগনোসিস করে ট্রিটমেন্ট নিতে পারছেন না?

আমাদের চিকিৎসকদের নিজেদের কিছু ভয়ানক এথিক্যাল এরোর আছে। প্রফেসরদের চেম্বারে ১০০ জন রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে ঠেলাঠেলি করে। যুদ্ধ করে এই মানুষগুলো একসময় চেম্বারে প্রবেশ করে। সামান্য জ্বর, অতিপরিচিত টাইফয়েড, কমনেস্ট IBS , মন ভালো নাই, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি রোগের ট্রিটমেন্ট নিয়ে ফেলেন৷ অথচ সারাদেশে হাজার হাজার ছোট ডাক্তার কোন রোগী না দেখেই শুধু বই পড়ে খ্যাপ মেরে কাটিয়ে দেয়। সেই খ্যাপও এথিক্সের চুড়ান্ত অবমাননার একটা ব্যাপার।

মিনিমাম রেফারেল ব্যবস্থা পর্যন্ত নাই। প্রফেসররা রোগীর দীর্ঘ লাইন দেখে, ল্যাব রিপোর্টের ৩০-৪০ ভাগ কমিশন পেয়ে ঢেকুর তোলেন। কেউ একজন প্রফেসর সামনে এসে লাথি দিয়ে দীর্ঘকালের অভ্যাসটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেন না।

ভাবুন তো- একজন প্রফেসর এক রোগীকে দেখে বলল, আপনার রোগ খুবই সামান্য। আপনি অমুককে দেখাবেন। সে এই রোগের চমৎকার ট্রিটমেন্ট দিতে পারবে। এমন ছোটখাটো রোগশোক, বা বড় রোগও শুরুতে তাকে দেখিয়ে আনবেন। যদি সেখানে ভাল না হয় আমি ট্রিটমেন্ট দিব। তার প্রেস্ক্রিপশন না দেখাতে পারল আমি আপনাকে দেখব না।

ফলে কী হবে?

সবাই শুরুতে ছোট ডাক্তারদের দেখাবে। ভালো হলে তো খুবই ভালো। এতে রোগীর সময় বাঁচল। নবীন ও ডিগ্রি ছাড়াও ডাক্তাররা রোগী পেল৷ অল্প কিছু সম্মানী পেল। শেষ পর্যন্ত লাভটা হল ঐ রোগীরই। চেম্বারে ঠেলাঠেলি করতে হল না। হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে দামী দামী ল্যাবে রিপোর্ট করাতে হল না। অথচ চিকিৎসাটা পেল পারফেক্ট। এদেশে সময় ও টাকা বাঁচানোটাই মেইন ফ্যাক্ট নয় কি? সাথে একটা রেফারেল সিস্টেম দাঁড়িয়ে যাবে। সব ডাক্তাররাই রোগী দেখবে৷ বাধ্য হয়ে খ্যাপে গিয়ে ক্লিনিক মালিকদের চাপে পড়ে নবীন ডাক্তারদের মনুষ্যত্ব নষ্ট করতে হবে না। তারা পাশ করেই নিজ বসবাসের এলাকায় ছোট্ট একটা খুপরীর মত চেম্বার দিবে। মানুষজন সেখানেও ট্রিটমেন্ট নিবে মহানন্দে। কারণ তারা জানে, প্রফেসরের কাছে যে ট্রিটমেন্ট, এখানেও একই ট্রিটমেন্ট। বরং এই ডাক্তারের হাতে সময় বেশি। সে ঔষুধের চাইতে নিয়মকানুন বেশি শিখিয়ে দিবে। ওষুধ ছাড়াও যে রোগী ভালো হয় এই কাউন্সেলিংটা পেয়ে যাবে।

ধীরে ধীরে কমে যাবে, এমনকী উধাও হয়ে যাবে কোয়াকদের দৌরাত্ম্য। ফার্মেসীওয়ালা, মেডিকেল এসিস্টট্যান্ট বা সাব-এসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO) নামের গালভরা পোস্টের নন-ডাক্তাররা ডাক্তার সেজে চিকিৎসা দেবার ব্যাপারটি আর চালাতে পারবে না। চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটা ম্যাজিক্যাল পরিবর্তন…ভাবা যায়?

প্রফেসররা কী করবে?

চিকিৎসকরা যখন প্রফেসর হয়ে যান, তখন অধিকাংশ সময় সেটা আমাদের কল্যাণ বয়ে আনে না। তার ভিজিট বেড়ে যায়। রোগীদের সিরিয়াল আরো লম্বা হয়। তখন তিনি দেবতা লেভেলে পৌছে যান৷ তাকে দেখানোর জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে অথচ হবার কথা ছিল উল্টোটা।

উল্টোটা কী?

একজন ডাক্তার তার প্রথম প্রাকটিসের দিন একটা ডায়েরি কিনে ফেলবে। সেখানে তিনি লিখতে শুরু করবে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা।

-আমাকে দেখানোর আগে রোগটা কেন ভালো হচ্ছিল না?
-এবার কেন ভালো হল?
-চিকিৎসা তো দুই ডাক্তার একই দিল, সেখানে হল না, এখানে কেন ভালো হল?
-রোগটা কেন দেরিতে ভাল হল?
-রোগটা কেন আর ভালো হবে না, অথচ সবার ভালো হয়?
-রোগটার পাশাপাশি আর কী কী লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে যেটা বইতে ছিল না?
-এমন অদ্ভুত রোগ তো আগে দেখি নাই! এর পিক্যুলারিটি কী?
-এই রোগটা স্বাভাবিক লাইন হতে কতটুকু অস্বাভাবিক লাইনে বেঁকে গেছে?

এভাবে তার ডায়েরি লেখা চলতে থাকবে। বছরের পর বছর তিনি তার অভিজ্ঞতা লিখতে থাকবেন। জমে যাবে ডায়েরির স্তুপ।

এবার?

প্রফেসর হবার দিন থেকে প্রাইভেট চিকিৎসা বন্ধ।

তিনি প্রাকটিস বাদ দিয়ে শুরু করবেন লেখালেখি। সারা জীবন অভিজ্ঞতার আলোকে জীবনের শেষদিকে সেগুলো বই আকারে বের হবে। পরবর্তী প্রজন্মের ডাক্তাররা জানবে, একই রোগের ধরণ পরিবেশ, জাতিগতভাবে কীভাবে বদলে যায়। কীভাবে চিকিৎসা দিলে রোগটা নির্মূল হয়। বইতে লেখা ছিল না কিন্তু তিনি কীভাবে নিজের স্টাইপে সামলিয়েছেন?

পুরো বইটা স্বাভাবিক চিকিৎসা শাস্ত্রের মত হবে না। হবে ডিটেইল আকারে। যা মাথায় আসবে তাই লিখবে। হোক বোরিং বা হোক আনন্দের। কিন্তু সেটা তো সত্য!

লেখাটা হয়তো হলো এমন,

রোগীটা প্রথমদিন আমার কাছে আসল পেটে ব্যাথা নিয়ে৷ যতক্ষণ সামনে ছিল ব্যাথা ছিল। এই ব্যাথার কমপ্লেইন ২ মাসের। বিশজন গ্রাম্য ডাক্তার দেখিয়েছিন, ভুলভাল এন্টিবায়োটিক খেয়েছেন, একজন ওঝা ওনার পেটে ঝাড়ুপেটা করছে। এরপর সদর হাসপাতালে ছিলেন ১ মাস। আল্ট্রা, ইসিজি, সিটি স্ক্যান, এম.আর.আই সব করেছেন। কিছুই পাওয়া যায়নি….কিন্তু আমার কাছে আসার পরই আমি বুঝলাম- it’s an interesting case… আমাকে ঠিক কোথায় হাত দিতে হবে। দিলেই ম্যাজিক্যালি এই রোগীর প্রগনোসিস র‍্যাপিড হবে। আমি শুরু করলাম, ম্যাজিক্যাল টাচ…

অথবা কেউ লিখবে,

ঘটনাটা ঠাকুরগাঁওয়ের।

রোগী এসে বলল, অন্তর কাহিল। ঔষুধ দেন। আমি ভাবলাম- অন্তর কাহিল মানে- বুক ধড়পড়ানি। দিলাম পালপিটেশনের ঔষুধ। কিন্ত একদিন পর জানলাম- অন্তর কাহিল মানে ঠাকুরগাঁওয়ের এই এলাকায় বোঝানো হয়- প্রেগন্যান্ট। আমি রোগীর ঠিকানা নিয়ে রোগীর ঔষুধ বন্ধ করে দিলাম। এবার দিলাম- সঠিক ঔষুধ।

সব যে ধর্মের মত নিখুঁত বা পুস্তকের মত তথ্যবহুল হতে হবে তা নয়। কিন্তু একজন প্রফেসর লেভেলের ডাক্তার মাথাভর্তি গিজগিজ করতে থাকা অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা নিয়ে মারা যাবেন…অভিজ্ঞতারা তার সাথে কবরে মিশে যাবে তা তো হতে পারে না।

লেখালেখিটা শুরু হলে….এভাবেই হয়তো জন্ম নিবে মেডিকেল সায়েন্সের অসংখ্য কেইস হিস্ট্রি বুক। যেগুলো আমাদের মতো পোনা ডাক্তাররা পড়ে চমকে যাব, থ্রিল পাবো। বুঝে ফেলব- জনৈক প্রফেসর কীভাবে রোগের পেছনে পেছনে মুভ করেছেন।

আজ আমি স্ট্যাটাস দিয়ে শেষ করছি। আমার ফ্রেন্ডলিস্টের অনেক ডাক্তার আছেন যারা একদিন প্রফেসর হবেন। আপনি হয়তো আমার তুচ্ছ দাবীর কথা সত্যি সত্যিই মেনে নিয়ে একটা বই লিখেও ফেলবেন একদিন৷ নাম দিবেনঃ A Road to Diagnosis অথবা Magic of a Doctor অথবা Last man in the Chamber অথবা ক্যান্সারের পদরেখা ধরে।

ভাবা যায়? কতই না ইন্টারেস্টিং হবে।

একজন প্রফেসর লেভেলের ডাক্তারের ব্রেইন যে কি জিনিস, পৃথিবীর ৯৮% লোকই জানে না। এই ব্রেইন এভাবে নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি লুকিয়ে রেখে মৃত্যুর আগেরদিন পর্যন্ত চেম্বারে রোগী দেখেই কাটিয়ে দিবে, ভাবা যায়?

যারা বড় ডাক্তার হবেন, রেফারেলের কথা একবার হলেও ভাববেন। কেউ এসে এই চিকিৎসাখাতটাকে টেনে তুলবে না। কেউ অর্থ আর রোগীর পরিমান বিসর্জন দিয়ে এগিয়ে আসবে না। আপনি নিজের বুকে হাত রেখে শপথ নিন। দক্ষিন এশিয়ায় টপ লিস্টে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা…ভারতকে ছাড়িয়ে গেছি…হ্যান কে…ত্যানকে পেছনে ফেলেছি এই তৃপ্তির ঢেঁকুরটা বড্ড পানসে লাগে!

শেষ করি। লেখা যে উদ্দেশ্যে শুরু করেছিলাম, সেই উদ্দেশ্যে কনফাইন্ড রাখতে পারিনি। লেখা লাগাম ছিড়ে এই পর্যন্ত এসেছে। আমি দুঃখিত! দেশের ক্রিকেটাররা, মন্ত্রীরা যখন রক্ত-মল-মুত্র আর ইসিজি টাইপের রুটিন চিকিৎসার নাম করে বিদেশে যায়…কোটি কোটি টাকা জলে ফেলে আসে…. আফসোস হয়…রাগ হয়…লজ্জা হয়….অপমান লাগে! অথচ ৫ বছরের ব্যয়িত টাকা একসাথে করলে আমরা একটা মাউন্ট এলিজাবেথ দিতে পারতাম… সেখানে কাজ কত দেশি… বিদেশি ডাক্তাররা… কী পরিষ্কার একটা হেলথ সেক্টর!

এমন স্বপ্ন দেখলেও আনন্দে চোখে জল নেমে পড়ে ঝুপঝাপ!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button