খেলা ও ধুলা

শিরিষ কাগজ, মুখোশ, দুয়ো কিংবা স্টিভেন স্মিথ!

মাইকেল ভন নিজে দীর্ঘদিন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ছিলেন। শচীন টেন্ডুলকারের বিপক্ষে খেলেছেন তিনি, পন্টিঙের অজেয় অস্ট্রেলিয়া দলকে হারিয়ে ২০০৫ সালে অ্যাশেজের ছাইদানীটা ফিরিয়েছেন ইংল্যান্ডে। দুই ব্যাটিং গ্রেটকে চোখের সামনে দেখার পরেও ভন অবলীলায় বলছেন, তার দেখা সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যানের নাম নাকি স্টিভেন স্মিথ! অস্ট্রেলিয়ান এই ডানহাতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ভন আরও যোগ করে দিয়েছেন- ‘হি ইজ অ্যাবসলিউট জিনিয়াস!’

এই প্রশংসাটা স্মিথের প্রাপ্য। ব্র‍্যাডম্যানের পরে টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গড়ের মালিক যিনি, তাকে স্ততির বন্যায় ভাসানোই যায়। ব্র‍্যাডম্যানের ৯৯.৯৪ গড়টা যেমন অবিশ্বাস্য, স্মিথের ফিরে আসার গল্পটাও কি তেমনই অবিশ্বাস্য নয়? শেষ টেস্টটা খেলেছিলেন পাক্কা ষোল মাস আগে, কেপটাউনে। সেই টেস্টেই শিরিষ কাগজ নিয়ে বিতর্ক হলো, ব্যানক্রাফটকে বাঁচাতে বুক পেতে দিলেন অধিনায়ক স্মিথ আর সহ-অধিনায়ক ওয়ার্নার, নিজেদের কাঁধে নিলেন সবটুকু দায়ভার। সেই গল্পটা সবাই জানে।

অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতিতে টেস্ট দলনায়কের জায়গাটা খুব স্পেশাল, প্রধানমন্ত্রীর পরে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবেও তাকেই বিবেচনা করা হয়। সেই সম্মানের আসনে বসে স্মিথ যখন অকপটে স্বীকার করলেন, আমরা চুরি করেছি- সেটা মেনে নেয়াটা অস্ট্রেলিয়ানদের জন্যে সম্ভব ছিল না। আর তাই স্মিথকে বিশ্বাসঘাতকের চোখেই দেখেছে তারা।

স্মিথ যতোই কাঁদুন, যতোই চোখের জল ঝরান, তাতে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ভক্তদের মন গলেনি। ওরা প্রাণভরে ভালোবাসতে জানে, ভালো পারফরম্যান্সের কদর করতে জানে, আবার ভালোবাসার মানুষটা মন ভেঙে দিলে বুকে পাথর বেঁধে তার ওপর থেকে মুখ ফিরিয়েও নিতে পারে। স্মিথের বেলাতেও সেটাই হলো। ওয়ার্নার এবং ব্যানক্রফটের সঙ্গে তিনিও নিষিদ্ধ হয়েছিলেন এক বছরের জন্যে।

কেপটাউনের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে এজবাস্টনে যখন নামলেন, ততদিনে গুণে গুণে ষোলটা মাস পেরিয়ে গেছে ক্যালেন্ডারের পাতায়। দলের খোলনলচেও বদলে গেছে অনেকটা। যে দলটা একদমই তার নিজের ছিল, তিনি ছিলেন নেতা, সেই দলে তিনি এখন সাধারণ একজন সদস্য। মিডিয়ায় গুজব রটে, দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই নাকি তাদের অন্তর্ভুক্তিটা ভালো চোখে দেখছেন না!

ব্যাটিঙে নামার সময় ইংল্যান্ডের দর্শকেরা দুয়ো দিলেন, স্মিথ কানে তুললেন না। স্মিথের কান্নারত মুখের আদলে মুখোশ বানিয়ে নিয়ে এসেছিল অনেকে, স্মিথ সেদিকে তাকালেনও না। রিভিউ নিয়ে একবার বাঁচলেন, ব্রডের হতাশ মুখ দেখেই মনে হলো, তিনি বুঝে গেছেন, স্মিথ আজ জ্বালিয়ে মারবেন তাদের। ১২৮ রানে অষ্টম উইকেটের পতন ঘটলো অস্ট্রেলিয়ার। দল যখন দেড়শোর আগে অলআউট হয়ে যাচ্ছে, তখনই গর্জে উঠলেন স্মিথ, যেন আঘাত লাগলো তার অস্ট্রেলীয় অহংবোধে। সিডলকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়লেন, লায়নকে অন্যপাশে রেখে হানলেন আঘাত। সেঞ্চুরি হয়ে গেল তার, অস্ট্রেলিয়া পেল লড়াই করার মতো পুঁজি। দলের অর্ধেকের বেশি রান এলো তার ব্যাট থেকে- ফিরে আসার রোমাঞ্চকর একটা গল্প লেখা হলো স্মিথের হাতে।

শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়ে যখন ফিরছেন প্যাভিলিয়নে, তখনও ‘বুউউ’ শব্দে গ্যালারি প্রকম্পিত করছে বার্মি আর্মির সদস্যরা। স্মিথ হয়তো তখনই ঠিক করে রেখেছিলেন, ওদের হাততালি না নিয়ে এজবাস্টন থেকে ফিরবেন না। বোলিঙের সময়টাতেও স্লিপে দাঁড়িয়ে দলকে উজ্জীবিত রাখার চেষ্টা করলেন সাধ্যমতো, নিজে এগিয়ে এসে রিভিউ নেয়া-না নেয়া নিয়ে কথা বললেন, নিজের অভিজ্ঞতার সবটুকু ঢেলে দিতে চাইলেন মাঠে। তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক নন, হয়তো আর কখনও হতেও পারবেন না- তাতে কি? স্পোর্টম্যানশীপের দারুণ নজির স্মিথ গোটা এজবাস্টন টেস্টজুড়েই দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন।

দ্বিতীয় ইনিংসে আবারও বিপদে অস্ট্রেলিয়া, এমনিতেই ৯০ রানে পিছিয়ে থাকা, তার ওপর স্কোরবোর্ডে সাতাশ রান জড়ো হতেই দুই ওপেনার হাওয়া। আরও একবার ব্যাটটাকে তুলি বানিয়ে রঙের রুপোলি আঁচড় কাটতে শুরু করলেন স্মিথ, এজবাস্টনের বাইশ গজ হয়ে গেল তার ক্যানভাস। ট্রাভিস হেডকে নিয়ে বিপর্যয় সামাল দিলেন, ম্যাথু ওয়েডকে সঙ্গে নিয়ে গড়লেন জয়ের ভিত।

১৪২ রানে আউট হয়ে যখন ব্যাটটাকে উঁচিয়ে ধরে প্যাভিলিয়নের দিকে ফিরছেন, তখন গ্যালারি থেকে শুধুই তালির শব্দ ভেসে আসছে, ‘বুউউ’ আওয়াজটা তখন গায়েব! স্মিথ দেখালেন, মাঠভর্তি প্রতিপক্ষের সামনে এভাবেই নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয়, এভাবে ফিরে আসার গল্পটা লিখতে হয়, যাতে কয়েক যুগ পরেও লোকে গল্প করতে পারে, স্টিভেন স্মিথ এই কীর্তিটা গড়েছিলেন!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button