অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

আমাকে দিয়ে হবে না!

– আমি অস্থির মানুষ।
– কেন?
– প্ল্যান নিই অনেক কিছু করার। দুইদিন করার পর আবার থেমে যাই। রুটিন মানতে পারি না।
– কী করতে চাও?
– অনেক কিছুই। কিন্তু কীভাবে করব বুঝতেই পারছি না।
– তোমার সামনে এটা কত তলা বিল্ডিং?
– দশ তলা।
– একটা ইট দিয়ে দশ তলা বানানো সম্ভব?
– না।
– কয়টা লাগে?
– অনেকগুলো।
– একদিনেই অনেকগুলো ইট দিয়ে দশতলা বিল্ডিং বানিয়ে ফেলা সম্ভব?
– না।
– কয়দিন লাগে?
– অনেকদিন। এক দুই বছর।
– যদি এমন হয়, টানা এক মাস কাজ করে মালিকের টাকা শেষ হল বা অসুস্থ হল। দুইমাস সব থামিয়ে রাখা হল। এরপর আবার কাজ শুরু হয়, বিল্ডিং নষ্ট হয়ে যাবে?
– না।

– তারা যদি ১০ তলা বানাতে গিয়ে ৫ তলা বানানোর পর কাজ বদলে অতিরিক্ত ইট সিমেন্ট দিয়ে রাস্তা বানানো শুরু করে, লাভ হবে?
– না। তাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না।
– রাইট। বড় কিছু করার প্ল্যানটাও এমন। একদিনেই স্বপ্নপূরণ হবে না। একটু একটু করে শ্রম দিতে হবে। মাঝখানে গ্যাপ পড়বে কিন্তু ভেবে নিতে হবে সেটা এক ধরণের রিলাক্সেশন পিরিয়ড। বা শক্তি শেষ হয়েছে, সেই শক্তি রিফিলিং পিরিয়ড। পিরিয়ড যত বড়ই হোক, কাজ থাকবে নির্দিষ্ট। বদলে ফেলা যাবে না। অর্ধেক বিল্ডিংবানানো শেষে রাস্তা বানানো যাবে না।
– সেটাই তো পারি না। দুই দিন পর আবার পূর্বের অবস্থা। নতুন করে আর শুরু করি না।
– তুমি কি আতেল শ্রেণির ছাত্র?
– না।
– ক্লাশের পড়া নিয়মিত করো? মস্তিষ্ক স্থির রেখে পড়াশোনা করো?
– না।
– তার মানে তুমি অস্থির। তোমার প্ল্যান কখনোই দীর্ঘমেয়াদি হবে না। তোমার হবে স্বল্পমেয়াদি।
– যেমন?
– তুমি প্ল্যান ৩ মাসের নিবে না। প্ল্যান নিবে মাত্র ৩ দিনের।
– ৩ দিনেই স্বপ্নপূরণ তো অসম্ভব।

– হ্যাঁ, কিন্তু এই ৩ দিন তোমাকে শেখাবে কীভাবে ৩ মাস লাগাতার রুটিন মানা যায়। আজ এখনই সিদ্ধান্ত নাও আগামী তিনদিন তুমি দৈনিক ২ ঘণ্টা করে তোমার স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করবে। সেটা পড়াও হতে পারে, এডোবিতে ফটো এডিটিং শেখাও হতে পারে, মোবাইলে সিনেমাটোগ্রাফির কাজ শেখাও হতে পারে, লেখক হবার জন্য গল্প লেখাও হতে পারে, জ্ঞান বাড়ানোর জন্য ২ ঘন্টা বই পড়াও হতে পারে। দৈনিক মাত্র ২ ঘন্টা করে টানা ৩ দিন। পারবে না?
– পারব।
– ৩ দিন পর এই প্ল্যান শেষ। যেহেতু ৩ দিনেই শেষ তাই খুব কষ্টকর নয়। মাত্র ২ ঘন্টা। সেটাও কেটে যাবে চোখের পলকে।
– কিন্তু বড় স্বপ্নের জন্য তো ৩ দিন যথেষ্ট নয়।
– অবশ্যই যথেষ্ট নয়। কিন্তু ৩ দিন পর দেখবে তুমি অন্য মানুষ। ৩ দিন পর খুব ছোট করে হলেও তোমার মাঝে বিশ্বাস গজিয়ে যাবে। কিছু করতে পারার বিশ্বাস। তোমার মনে হবে- ৩ দিন তো পারলাম। আমি ৭ দিনও পারব। ৭ দিনের কাজটার জন্য ৩ দিনের কাজটা জরুরি। ৩ দিন আসলে আত্মবিশ্বাস তৈরি করার ভিত্তি।
– এরপর?
– এরপরের প্ল্যান হবে ৭ দিনের। একই কাজ করবে টানা ৭ দিন। মনে মনে ভাববে ৭ দিন পর এই কষ্ট শেষ। এরপর আর কিছু করব না। এভাবে একদিন একদিন করে ৭ দিন কেটে যাবে। ৭ দিন পর তুমি আরো বেশি বদলে যাওয়া আরেকটা মানুষ।
– ৭ দিনেই ২ ঘণ্টা করে পড়ব?
– চাইলে ২ ঘন্টার সময়কাল ১ ঘন্টাও করতে পারো। কিংবা ৩০ মিনিটও করতে পারো। কিন্তু সময় নির্দিষ্ট। কমও করা যাবে না। বেশিও করা যাবে না। ৩০ মানে ৩০। ৩১ মিনিট নয়।
– ৩০ মিনিটের টাস্ক কমপ্লিশনের কি আরো কোন নিয়ম আছে?
– হ্যাঁ, শর্ত হলো- ৩০ মিনিট হবে প্রতিদিন একই সময়ে। রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটাও হতে পারে। কিংবা সাড়ে এগারো থেকে রাত বারোটাও হতে পারে।
– অন্য সময়ে করা যাবে না?
– না। প্রতিদিন একই সময়ে। যত ঝড়বৃষ্টি-দুর্ঘটনাই ঘটুক, সময় বদলাবে না। ৩০ মিনিট তোমাকে কীভাবে বদলে দিবে শুনতে চাও?
– হ্যাঁ।

– ৩০ মিনিট যখন নির্ধারিত হবে, তুমি একটা শৃংখলার ভেতরে ঢুকে যাবে। ৩০ মিনিটের বৃত্ত। একটা সময় এই বৃত্তে তুমি স্থায়ীভাবে আটকে যাবে। চাইলেও বের হতে পারবে না।
– কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ব্যাপারটা বুঝলাম না।
– যদি প্রতিদিন একটা নির্ধারিত সময়ে করো, তাহলে তুমি সারাদিন ঐ মুহুর্তের অপেক্ষায় থাকবে। ফলে মানসিকভাবে তুমি বিশেষ মুহুর্তের জন্য সারাদিনই প্রস্তুতি নিচ্ছ। যে মস্তিষ্ক আবোলতাবোল চিন্তা করত, সেই মস্তিষ্কও সারাদিন ৩০ মিনিটের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাববে। যেহেতু নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করছ, তাই আগেভাগেই ব্যক্তিগত বাকী কাজগুলো শেষ হয়ে যাবে। তুমি পড়ে থাকা কাজগুলো গুছিয়ে অপেক্ষা করবে ৩০ মিনিটের জন্য। তুমি গোছানো শিখে যাবে অনেক কাজ। যেগুলো তুমি আগে করতে না। একইসাথে শৃংখলা এবং ম্যানেজমেন্ট শিখে যাওয়া ব্যাপারটা হুলস্থুল ইমপ্রুভমেন্ট। আরেকটা শর্ত আছে।
– কী?
– তোমার কাজ হবে নির্দিষ্ট। প্রতিদিন একই কাজ।
– তুমি কী করতে চাও?
– পড়তে চাই।
– কী পড়া?
– ইতিহাস।
– ভেরি গুড। তোমার নির্ধারিত টপিক হল- ইতিহাস। বিজ্ঞান বা গল্প-উপন্যাস নয়। সুনির্দিষ্ট টাস্কের লাভ হল- তুমি একটা জিনিস খুব ভালোভাবে জানবে। অনেক কিছু ঝাপসা জানার চেয়ে, অল্প অল্প পারার চাইতে একটা জিনিসে মাস্টার হওয়া ভালো। রাইট?
– রাইট।
– এটাকেই বলে ‘Short time shooting’। হুট করে উদয় হয়ে, অল্প সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট টার্গেটকে ধুপধাপ গুলি করে কাজ হাসিল করে অদৃশ্য গেলে। যারা অস্থির, দীর্ঘদিন রুটিন মানতে পারে না, তারা হবে শর্ট টাইম শ্যুটার। তুমি কী চ্যালেঞ্জটা নিতে চাও?
– চাই।
– Are you serious?
– Yah!
– Are you serious?
– Damn, Yah!
– Are You serious?
– I ammmm serious!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button