অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ভ্যালেন্টাইন ডে, ‘বোন দিবস’ ও একদল মাথামোটা পাকিস্তানী!

দুনিয়ার যতো অদ্ভুত আর আজব কর্মকাণ্ডের নমুনা দেখানোর জন্যেই যেন পাকিস্তান নামের দেশটা পৃথিবীতে টিকে আছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নিয়মিত হাস্যরসের খোরাকে পরিণত না হলে এদেশের মানুষের পেটের ভাত হজম হয় না, সেটা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হোক, সর্বোচ্চ আদালত হোক, কিংবা হোক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী অথবা বিশ্ববিদ্যালয়- হাসির পাত্রে পরিণত হওয়াটা এদের নেশা হয়ে গিয়েছে সম্ভবত। নইলে কি আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে তারা ‘ভাই-বোন’ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দিতে পারে? না, মাথামোটা কোন কট্টরপন্থী সংগঠন থেকে আসেনি এই ঘোষণাটা, আগামী ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে ‘বোন দিবস’ বা ‘সিস্টার্স ডে’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়!

বছর দুয়েক আগে পাকিস্তানের এক প্রাদেশিক আদালত ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিল, এবং পুরো দেশে কেন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না, এই মর্মে একটা রিটও জারী করেছিল। ইসলামাবাদ হাইকোর্টের সেই রায়ে ‘উন্মুক্ত স্থান এবং সরকারী অফিস-আদালতে’ প্রকাশ্যে ভালোবাসা দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ করা হয়। আর এখন তো ভালোবাসা দিবসের নিয়ম-কানুনই পাল্টে ফেলতে চাইছে ফয়সালাবাদ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়!

ফয়সালাবাদ ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাগ্রিকালচারের উপাচার্য্য দাবী করেছেন, ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস একটা বিজাতীয় সংস্কৃতি, এটা ইসলাম এবং পাকিস্তানী সংস্কৃতির পরিপন্থী। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসার কোন স্থান নেই, এখানে সবাই ভালো-বোনের মতো। আর তাই তারা এই দিনটাকে বোন দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ১৪ই ফেব্রুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রায় এক হাজার ছাত্রীকে শাল, কাপড় এবং হিজাব উপহার হিসেবে দেয়া হবে। এজন্যে তারা স্পন্সরও খুঁজছেন বলে জানিয়েছেন উপাচার্য্যের এক সহকারী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য জাফর ইকবাল বলেছেন, তাদের সমাজে নাকি নারীদের অনেক সম্মান দেয়া হয়, স্ত্রী হিসেবে, বোন হিসেবে, মা হিসেবে, সব জায়গাতেই নারীদের সম্মান পুরুষদের চেয়ে বেশি। আর তাই ভ্যালেন্টাইন ডে’র মাধ্যমে নারীদের অপমান করতে চান না তারা! তরুণদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যেই তারা এই ‘উদ্ভট’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তার দাবী!

ভ্যালেন্টাইন ডে’র সাথে পাকিস্তানীদের বৈরীতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মামনুন হোসেন বলেছিলেন, মুসলিম প্রধান দেশটিতে ভালোবাসা দিবস নিয়ে আলাদা উৎসবের কোনো সুযোগ নেই। এসব ‘অপসংস্কৃতি’ ঝেড়ে ফেলে তরুণদের লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে বলেছিলেন মামনুন।

সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় পাকিস্তানি তরুণী কান্দিল বালুচ তখন প্রেসিডেন্ট মামনুনের ওই বক্তব্যকে খণ্ডন করে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতাদের কড়া সমালোচক ছিলেন কান্দিল বালুচ। সেই ভিডিও প্রকাশের কিছুদিন পরেই নিজের ভাইয়ের হাতে খুন হতে হয়েছিল তাকে।

সারা বিশ্বের মতো পাকিস্তানেও ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের ছোঁয়া লেগেছে, বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরেই এই দিনটা পাকিস্তানের শহুরে তরুণ-তরুণীদের অনেকের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষ্যে তারা ভালোবাসার মানুষটিকে উপহার হিসেবে কার্ড, চকলেট, ঘড়ি বা এরকম উপহার দেয়। তবে এখন যেভাবে সঅরকার, আদালত আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই দিনটার পেছনে লেগেছে, তাতে আসছে ভ্যালেন্টাইনে পাকিস্তানে ভালোবাসার পরিমাণ কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে, সেটা নিয়েই জেগেছে শঙ্কা।

কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী আর তাদের নেতাদের কথা বাদই দিলাম, ওই লোকগুলো নাহয় মাথায় গোবর নিয়ে ঘোরাফেরা করে, আমাদের দেশে যেমন কেউ কেউ নারীদের ক্লাস ফোর-ফাইভের পরে আর পড়ালেখা করাতে নিষেধ করে দেয়, সেরকম আরকি। কিন্ত একটা দেশের আদালত কি করে এরকম বুজরুকি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে, একটা স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে ভালোবাসা দিবসে হাস্যকরভাবে ‘বোন দিবস’ পালনের ঘোষণা দিতে পারে, আবার সেটার জন্যে স্পন্সরও খুঁজতে পারে, সেটা পাকিস্তান নামের দেশটা দুনিয়াতে না থাকলে জানা হতো না কখনও।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button