অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

সিঙ্গাপুর যেভাবে বাকি বিশ্বের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে!

ষাট বছর আগেও যে জায়গাটায় কিছু গরীব জেলে বসবাস করতো শুধু, সেখানে এখন সুরম্য অট্টালিকা, বহুতল ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে যেন আকাশটা ছোঁয়া যায়। সিঙ্গাপুরের কথা বলছি, একটা সময়ে দরিদ্র‍্য আর বেকার লোকজনে ভর্তি ছিল যে সিঙ্গাপুর, তারাই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ, এশিয়ার বুকে এক টুকরো ইউরোপ বললেও বোধহয় ভুল হবে না সিঙ্গাপুরকে।

একটা শহরকে লক্ষ-কোটি মানুষের বসবাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাটা যে কোন দেশের যে কোন সরকারের জন্যেই একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। সেই জায়গাটাতে সিঙ্গাপুরের সরকার একেবারেই অনন্য এবং অসাধারণ কাজ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। দেশটার আয়তন মাত্র ৭২২ বর্গ কিলোমিটার, আর ছোট্ট এই জায়গাটাতে বাস করে প্রায় সাতান্ন লক্ষ মানুষ।

সত্তরের দশকে সিঙ্গাপুর

জেনে অবাক হবেন, পুরো বিশ্ব যেখানে ২০১৯ সালে বসবাস করছে, সিঙ্গাপুর সেখানে প্রযুক্তির দিক থেকে বাস করছে ২০৫৯ সালে! প্রযুক্তির ব্যবহার আর যথাযথ পরিকল্পনার ব্যাপারে ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্রটা যেন বাকী বিশ্বের চেয়ে প্রায় চল্লিশ বছর এগিয়ে আছে!

অল্প জায়গায় এই বিশাল সংখ্যক মানুষের আবাসন এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করাটা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ। সিঙ্গাপুরে যে কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে কি বানানো হবে তারও আগে যেটা মাথায় আসে, সেটা হচ্ছে কোথায় বানানো হবে? কারণ স্থলভাগের প্রায় সবটুকুই ব্যবহার করে ফেলেছে সিঙ্গাপুর। নতুন একটা ভবন যে বানানো হবে, সেটারও জায়গা নেই বললেই চলে। তাহলে উপায়?

উপায় বের করেছে সিঙ্গাপুর সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা মিলে। এই প্রকল্পের নাম তারা দিয়েছে ‘ভূমি পুনরুদ্ধারকরণ’। এত কঠিণ শব্দে না গিয়ে বুঝিয়ে বলি, এটার মানে আসলে যেখানে মাটি নেই, সেখান থেকে জমি তৈরি করা।

মেরিনা বে, সিঙ্গাপুর

ভাবছেন, কিভাবে এটা সম্ভব? সিঙ্গাপুরের চারপাশেই সাগর দিয়ে ঘেরা। সেই সাগর উপকূলের মাটিকেই তারা বহুতল ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের ভূমি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এবং ১৯৬৩ সালে স্বাধীন হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত এভাবে নিজেদের আয়তন প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে সিঙ্গাপুর। দেশটার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ‘মেরিনা বে- ও এই প্রযুক্তিতেই নির্মিত হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে যেহেতু জায়গার অভাবটা প্রকট, তারা এক ইঞ্চি মাটিও অপচয় করেনি কোথাও। সাবওয়ে থেকে শুরু করে হাইওয়ে, মেট্রো কিংবা টেলিকমিউনিকেশন সুপার হাইওয়ে- এগুলোর বেশিরভাগই তারা নিয়ে গেছে মাটির নিচে দিয়ে। রাস্তাঘাট মাটির ওপরে যেটুকু আছে, নিচে আছে তার দ্বিগুণ, তারা এগুলোর নাম দিয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড হাইওয়ে। এমনকি সিঙ্গাপুরে অনেক ভবনের অনেক নিচে পর্যন্ত কমার্শিয়াল স্পেস থাকে, যাতে জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়।

সিঙ্গাপুরে যে পরিমাণ মানুষের বসবাস, তাতে করে এসব আন্ডারগ্রাউন্ড হাইওয়ে কিংবা মাটির নিচে সাবওয়ে বানানোর দরকার ছিল না। কিন্ত তাদের সরকার চিন্তা করেছে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে জনসংখ্যা বাড়বে, সেই বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলাতে যাতে সমস্যা না হয়, সেকারণে পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই ব্যবস্থা নিচ্ছে তারা।

আচ্ছা, মাটির ওপরের আর নিচের সব জায়গাও যদি মানুষে ভর্তি হয়ে যায়, তখন কি হবে? সিঙ্গাপুরের বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীরা সেটাও ভাবছেন এখনই! এবং সেই ভাবনা থেকেই তারা ড্রোন টেকনোলজি নিয়ে কাজ করছেন।

সিঙ্গাপুরের ড্রোন টেকনোলজি

না এই ড্রোন ফটোগ্রাফিতে ব্যবহার করা হবে না, এই ড্রোনে করে মানুষ ভেসে বেড়াবে শূন্যে, অফিস করবে, এমনকি রাতে ঘুমাবেও এখানেই! ড্রোনের মাধ্যমে যাতে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কার্গো পাঠানো যায়, চলছে সেই চেষ্টাও। এয়ার স্পেস টেকনোলজিকে সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই করছেন সিঙ্গাপুরের বিজ্ঞানীরা!

সিঙ্গাপুরের জন্যে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। মানুষের মৌলিক চাহিদায় খাবারের অবস্থান সবার আগে, কিন্ত সিঙ্গাপুরে তো সাতান্ন লক্ষ মানুষের খাদ্য যোগান দেয়ার মতো কৃষিজমি নেই।

এখন সিঙ্গাপুরে মোট খাবারের শতকরা ৯৩ শতাংশই বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। কিন্ত নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা যাতে দেশের ভেতর থেকেই করা যায়, সেটা নিয়েও কাজ করছে সিঙ্গাপুর। কমার্শিয়াল ভার্টিক্যাল ফার্ম নামে একটা প্রোজেক্ট শুরু করেছে তারা, বদ্ধ স্থানে স্বল্প জায়গা সর্বোচ্চ পরিমাণের ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন গবেষকেরা।

কমার্শিয়াল ভার্টিকাল ফার্ম

একটা বিশ ফুট বাই বিশ ফুট ঘরের ভেতরেই তাকে তাকে রাখা হবে খাদ্যশস্য, গম, ভূট্টা, আলু থেকে শুরু করে স্ট্রবেরি, আপেল বা এরকম নানা ফলগাছও। লাগবে না সূর্যের আলো, এমনকি দরকার হবে না মাটিরও। বিশেষভাবে তাপ দিয়ে অল্প সময়েই এসব ফসল ফলানো সম্ভব, তবে এটা এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে।

আরেকটা জিনিস সিঙ্গাপুর করেছে, সেটা হচ্ছে দেশকে দূষণমুক্ত রাখা। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেয়া যাক। পেট্রোল বা ডিজেলচালিত গাড়ি সেদেশে চলে না অনেক বছর ধরেই, এমনকি গ্যাসচালিত গাড়িও বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা, কারণ গ্যাস উৎপাদনে পরিবেশ দূষিত হয়।

এর পরিবর্তে ইলেক্ট্রনিক কার রাস্তায় নামিয়েছে তারা। ফুল চার্জে একটা ইলেক্ট্রনিক কার ঘন্টায় দুইশো কিলমিটার বেগে ছুটতে পারে। মাত্র পনেরো মিনিট চার্জ দিলেই একঘন্টা রাস্তায় চলতে পারে এই গাড়ি। ভবিষ্যতের সিঙ্গাপুরের গায়ে যাতে দূষণের দাগ বিন্দুমাত্রও না লাগে, সে ব্যাপারে তারা দারুণ সচেতন।

গরীব এবং আকারে ছোট বলে যে দেশটাকে একটা সময়ে প্রতিবেশীরা অবজ্ঞা করতো, সেই সিঙ্গাপুর এখন এশিয়ার দেশগুলোর জন্যে রোল মডেল। বেকার মানুষে যে সিঙ্গাপুর ভর্তি ছিল, তাদের মাথাপিছু আয় আজ বছরে প্রায় এক লক্ষ ডলার। আর এসবকিছুর মূলে আছে সেদেশের মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর সরকারের নেয়া দারুণ কিছু উদ্যোগ। এভাবেই তো পুরো বিশ্বের চেয়ে চার দশক এগিয়ে আছে তারা!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button