ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

বাজেট ট্যুর- এই শীতে কম খরচে ঘুরে আসুন নর্থ সিকিম

Didar Us Shams:

শুরুতেই বলি, সিকিম ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় মার্চ-এপ্রিল/সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। অন্য সময়ে সিকিমের নয়নাভিরাম নীল পানির লেক গুলো বরফ জমে সাদা হয়ে থাকে। অনিন্দ্যসুন্দর ফুলে আবৃত উপত্যকা গুলো হয়ে থাকে একদম নির্জীব। আর রাস্তায় শক্ত বরফ জমার দরুণ প্রায়ই মূল গন্তব্যস্থল গুলোতে পৌঁছানো কঠিন, অসম্ভব হয়ে পরে। তবে এসময় খুবই কম খরচে সহজেই বরফ, তুষারপাত উপভোগ করতে পারবেন এবং প্রচন্ড শীত মোকাবেলার একটা অভিজ্ঞতাও হয়ে যাবে।

গত ১৩-১৮ জানুয়ারি মাথাপিছু মাত্র ১১,৫০০ টাকা বাজেটে আমরা ৭ বন্ধু সিকিম ঘুরে এলাম। এমনিতে সাধারণত এজেন্সি ছাড়াই ভ্রমণ করলেও প্রথমবার সিকিম ভ্রমন বলে আমরা এজেন্সির সহায়তা নিয়েছিলাম শুধু নর্থ সিকিমের ২ রাত/৩ দিনের জন্য। প্যাকেজে ছিল পারমিশন, গাড়ি, দুবেলা খাবার আর হোমস্টে তে থাকা, সোমগো লেক, ছাঙ্গু লেক ভ্রমণ। বাকি ব্যাপারগুলো নিজেরাই যোগাড় করেছি।

সিকিমের পথে যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিলাম-

সাতদিন আগে টিকেট কেটেছিলাম হানিফ নন-এসি বাসের। সেই বাসে করেই বিকাল ৫.৩০ টার দিকে কল্যাণপুর/গাবতলী থেকে চলে যাই বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়িয়া বর্ডার। খরচ মাথাপিছু ৭০০ টাকা। রাতে ফুড ভিলেজ থেকে ডিনার করে নিয়েছিলাম। বাংলাবান্ধা বর্ডার পর্যন্ত শ্যামলির এসি বাসও যায়; সেক্ষেত্রে ভাড়া মাথাপিছু ১৫০০ টাকা।

প্রথম দিন – নাস্তা করে নিয়ে প্রথমেই বর্ডার থেকে হানিফের ফিরতি বাসের টিকিট (মাথাপিছু ৬০০ টাকা) করে নেই। দুই বর্ডারেই কিছু টাকা ঘুষ/উন্নয়ন ফি প্রদান করতে হয়। ফুলবাড়িয়া থেকে ডলার ভাঙিয়ে উঠে পড়ি সিলিগুড়িগামী অটোতে। অটো ভাড়া মাথাপিছু ৫০ রুপি। অটো সিলিগুড়ি SNT যেখানে সিকিম যাওয়ার ট্রান্সপোর্ট পাওয়া যায়, সেখানে নিয়ে যাবে আমাদের। অটো অবশ্য খুবই ধীরে চলে তাই চেষ্টা করবেন সময় কম নষ্ট করতে।

অটো থেকে নেমে লাঞ্চ করেই উঠে পড়ি যেকোনো গ্যাংটক গামী বলোরো/সুমো গাড়িতে। রিজার্ভ নিলে খরচ পড়বে ম্যাক্সিমাম ৩০০০/২৫০০ রুপি। পথে র‍্যাংপো চেকপোস্ট থেকে পাসপোর্টে সিল এবং ILP করিয়ে নেই (চেকপোস্টের সামনে থেকে ILP এর ২০ কপি ফটোকপিও করিয়ে নিই তখনই)।

কোথাও অতিরিক্ত বিলম্ব না হলে ৬/৭ টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক। হোটেল ঠিক করে ফ্রেশ হয়ে তারাতারি ডিনার করে নেই। কারণ, এইদিকে মোটামুটি রাত ৮/৯ টার মধ্যেই খাবার দোকান বন্ধ হয়ে যায়। সেই রাতেই এজেন্সিকে আমরা আমাদের পাসপোর্ট,ভিসা ফটোকপি, ILP ফটোকপি ও ছবি জমা দিয়ে দেই। অবশ্যই ঢাকা থেকে ১০ কপি পাসপোর্ট,ভিসার ফটোকপি ও ১০ কপি ছবি নিয়ে নিবেন।

দ্বিতীয় দিন – দ্বিতীয় দিন নিজেরা নাস্তা করেই ১০ টার মধ্যে প্যাকেজের সুমো গোল্ড এ করে রওনা দেই লাচেনের উদ্দেশ্যে । যাত্রা পথে দেখা পাই কিছু ঝর্নার। পথে দুপুরের মধ্যাহ্নভোজের বিরতি নিয়ে একটা দোকান থেকে লাঞ্চ সেরে নেই। রাতে পৌছাই লাচেন শহরে। রাতের ডিনার প্যাকেজেই থাকে। লাচেন থেকে ড্রাইভারের সাথে কথা বলি, ৩০০০ রুপি অতিরিক্ত দিবো তাকে। তিনি আমাদের লাচেনের চোপটা ভ্যালি এবং কালা পাত্থারে নিয়ে যাবেন। আএ লাচুংয়ের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ঘুরিয়ে নিয়ে আসবেন। এই জায়গাগুলো কিন্তু প্যাকেজের বাইরে।

প্যাকেজে থাকে লাচেন টু থাঙ্গু ভ্যালি, লাচুং টু ইউমথাং ভ্যালি। থাঙ্গু/ইউমথাং ভ্যালিতে যাওয়ার অনুমতিও সাধারণত সরকার দেয়না। ওটা ড্রাইভার/গাইড ম্যানেজ করবে প্যাকেজ অনুযায়ী। এখানে এটাও বলে রাখি অনেকেই গাইড ছাড়া সিকিম ঘুরলেও আমাদের এজেন্সি এটাতে একদমই রাজি হয়নি। রাতে এখানে প্রচুর তুষারপাত হয়। ফলে প্রচন্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে আমরা শুয়ে পড়ি।

তৃতীয় দিন – ভোর ৪ টায় ঘুম থেকে উঠে পড়ি সবাই। অতঃপর রওনা দেই থাঙ্গু ভ্যালি-কালা পাত্থারের পথে। লাচেন পুলিশ তুষারপাতের কারণে অনুমতি নিয়ে গড়বড় করে। যদিও বলে দিয়েছিল তারা, বেশিদূর যাওয়া যাবে না। পরে অবশ্য সকাল ৭ টায় অনুমতি পাই আমরা। ড্রাইভার সাহস করে ইউমথাং ভ্যালি, চোপটা ভ্যালি পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু চোপটা ভ্যালিতে গিয়ে পড়তে হয় বিপদে। দূর্ভাগ্যবশত একটা খারাপ ব্রিজে আমাদের গাড়ির টায়ার একদম চিড়ে যায়! ফলে সেদিন আমরা কালা পাত্থার যেতে পারিনি। যদিও ওইদিন শুধু আমাদের গাড়িই লাচেন থেকে বেরিয়ে ছিল। আর কোন গাড়ি সাহস করেনাই তাই ড্রাইভারকে কিছু টাকা দিয়ে বলি বাকিটা পরদিন জিরো পয়েন্ট নিয়ে গেলে দিবো।

চোপটা ভ্যালি থেকে নিজেরাই হাল্কা নাস্তা করে ফিরে আসি হোটেলে বিকাল ৩টায়। দুপুরের খাবার প্যাকেজেই ছিল। খেয়েদেয়ে রওনা দেই লাচুংয়ের উদ্দেশ্যে। লাচুং এসে হোমস্টেতে চেক-ইন করে প্যাকেজের ডিনার করে নেই। লাচেনের তুলনায় লাচুং শহরটা বেশ ছিমছাম আর কিছুটা জনবহুল। পরদিনের গন্তব্য ইউমথাং ভ্যালি-জিরো পয়েন্ট।

চতুর্থ দিন – সকালে নাস্তা না করেই বেরিয়ে যাই ইউমথাং/জিরো পয়েন্ট এর উদ্দেশ্যে। খুবই দুর্ভাগ্যবশত ইউমথাং যাওয়ার কিছু আগে গিয়ে দেখি সামনের রাস্তা পুরোটা শক্ত আর পিচ্ছিল বরফে বন্ধ হয়ে আছে। তাই ওইদিন আর আগানো সম্ভব হয়না আমাদের। ড্রাইভারকেও অতিরিক্ত টাকা দেওয়া লাগেনি। অগ্যতা ওখান থেকেই ফিরে আসি হোমস্টেতে। আর প্যাকেজের লাঞ্চ করে ১২টার মধ্যে বেরিয়ে যাই গ্যাংটক যাত্রায়।বিকালে গ্যাংটক পৌঁছিয়ে কিছু কেনাকাটা,ঘুরাঘুরি,ডিনার সেরে হোটেলে এসে ঘুম দেই।

পঞ্চম দিন – সকালে নিজেরাই নাস্তা করে প্যাকেজের গাড়িতে করে চলে যাই গ্যাংটক শহর থেকে চাঙ্গু লেক। পথে এক যায়গায় ৫০ রুপি দিয়ে গামবুট ভাড়া করি। গামবুট আমরা লাচুংয়েও ভাড়া করেছিলাম। তবে গামবুট জিনিসটা সব ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়না। বরফ জমে শক্ত হয়ে গেলে এটা গ্রিপ দিবেনা। তাই সম্ভব হলে নিজেরাই গ্রিপওয়ালা বুট কিনে নর্থ সিকিমে যাবেন। চাঙ্গু লেক ঘুরে সেখানে রোপওয়েতে চড়ে চলে যাই একদম ১৫,০০০ ফিট উচ্চতায়। চাঙ্গু লেক এন্ট্রি মাথা পিছু ১০ রুপি আর রোপওয়ে রেট মাথাপিছু খরচ হয় ৩২৫ রুপি। চাঙ্গুলেক ঘুরে লাঞ্চ করে বিকাল নাগাদ হোটেলে ফিরি। সন্ধ্যায় গ্যাংটকে ঘুরে কিছু কেনাকাটা করে ডিনার করে হোটেলে এসে ঘুমিয়ে পরি।

ষষ্ঠ দিন – সকাল ৮ টায় নাস্তা সেরে ম্যাক্সিমাম ৩০০০ টাকায় গাড়ি রিজার্ভ করে চলে আসি শিলিগুড়ি কসমস প্লাজার এর বিগবাজারে। এখানে কিছু কেনাকাটা লাঞ্চ সেরে নেই। দুপুর ২টায় অটোতে মাথাপিছু ৫০ রুপি দিয়ে পৌঁছাই ফুলবাড়িয়া-বাংলাবান্ধা বর্ডার। রুপি টাকা করে দুই বর্ডারে কিছু টাকা ঘুষ দিয়ে সন্ধ্যা ৫.৩০ টায় উঠে পরি হানিফে। ঢাকা পৌঁছাই পরদিন সকাল ৭টায়।

পুনশ্চ – সাতজন ভ্রমণ করেছি বলে মাথাপিছু ১১,৫০০ টাকার মতন খরচ হয়েছে এবং মোটামুটি আরামেই সুমো/বলেরোতে গাইড সহ বসতে পেরেছি। প্যাকেজের বাইরে গ্যাংটকের এমজি মার্জের হোটেল DZhong এ তিন রাত ছিলাম মোট ৯,০০০ রুপিতে। এখানে টাকা আরো বাঁচানো সম্ভব। আলাদা করে নর্থ সিকিম সোমগো/ চাঙ্গু লেকের প্যাকেজ নিয়েছিলাম মোট ২৯,০০০ (২৪,৫০০+৪,৫০০) রুপিতে। প্যাকেজ নিয়েছিলাম হাই হিলস ট্যুরস এন্ড ট্রাভেল নামক রেজিস্টার্ড এজেন্সি থেকে।

৫ রাত ৪ দিন এর জন্য ট্যুরে মোট ১৮ বেলা খাবার খরচের ৪ বেলা বহন করেছিল এজেন্সি। বাকি ১৪ বেলায় মাথাপিছু ১০০ রুপি ধরে বাজেট করেছি। এতে অনায়াসেই রাস্তাপথের জন্য খাবার/চা খরচের যোগানও হয়ে যাবে। লাচেন থেকে কালা পাত্থার আর লাচুং থেকে জিরো পয়েন্ট যেতে চাইলে অতিরিক্ত ৩০০০ রুপি দিতে হবে ড্রাইভারকে। এই টাকা কোনভাবেই আগে দিবেন না। যেহেতু আমরা এজেন্সি থেকে পুরো সিকিমের প্যাকেজ নেইনি সেহেতু লোকাল ট্যাক্সি বাবদ মোট ৪০০ রুপি খরচ হয়েছে আমাদের যেটা মোটামুটি অবধারিতই ছিল।

কিছু পরামর্শ –
১। আবহাওয়া/রাস্তা খারাপ থাকায় গন্তব্যে পৌঁছানো না গেলে সিকিমের এজেন্সি সাধারণত টাকা ফেরত দেয়না। পারলে আবহাওয়ার অবস্থা দেখে সিকিম ট্যুর প্ল্যান করুন।

২। তীব্র শীতে কোথাও ঘুরতে গেলে অবশ্যই পর্যাপ্ত ভারি জ্যাকেট, উলের কানমোজা/হাতমোজা/পা মোজা আর থারমাল ইনার নিয়ে যাবেন।

৩। অবশ্যই সাথে পর্যাপ্ত ঔষধ, লিপবাম, লোশন, শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, টয়লেট পেপার এবং পর্যাপ্ত কফির স্যাশে সাথে রাখবেন।

৪। সাথে করে ফ্লাস্ক নিয়ে যাবেন। এগুলো শেয়ার করতে গেলে বিপত্তি বাধবেই।

৫। পারলে বর্ডার ক্রস করেই ওপার থেকে ইন্ডিয়ান সিমকার্ড কিনে নিন। শহরের ভিতরে সিমকার্ড পাওয়া ভারি মুশকিল।

বলে রাখি, সিকিম খুবই পরিচ্ছন রাজ্য। আর নর্থ সিকিমে প্লাস্টিকের বোতল নেয়া নিষিদ্ধ। তাই দয়া করে যেখানেই যাবেন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবেন। দরকার পড়লে খাবারের খোসা সাময়িক সময়ের জন্য ব্যাগে রেখে দিয়ে পরে ডাস্টবিনে ফেলবেন। সিকিমে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ, বিভিন্ন ধর্ম, জাতের মানুষ বসবাস করে। তাই কারো অনুভুতিতে আঘাত আনতে পারে এমন ইঙ্গিত বা মন্তব্য করবেন না। ভ্রমণ হোক সুন্দর।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button