অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

সিয়েরা লিওন- যে দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা!

২০০২ সালে আফ্রিকার এই দেশটিতে বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়।

নব্বুই দশকে সিয়েরা লিওন রাষ্ট্র হিসেবে বেশ বিপর্যস্ত ছিল। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, গৃহযুদ্ধ, অন্তর্গত দ্বৈরথ দেশটিতে শান্তি বিনষ্ট করে ফেলেছিল পুরোপুরি।

১৯৬১ সালে স্বাধীনতা পাওয়া দেশটিতে নব্বুই দশকে এসে এক দশকেরও বেশি সময় ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি বিরাজ করে। অবকাঠামো প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। ৫০ হাজার মানুষ হতাহত হয়। বাস্তুহারা হন অসংখ্য অগণিত মানুষ।

সেই সময়ে দেশটিতে শান্তিরক্ষা মিশনে যান বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনী। জাতিসংঘের মিশনগুলোতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী মিশনের বেশ সুনাম আছে। সিয়েরা লিওনেও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনী দেশটিতে শান্তি ফেরানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশি সেনাবাহিনী দেশটিতে গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশ পুনঃগঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণেও অবদান রাখে।

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর অবদান সম্পর্কে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমদ তেজান কাব্বাহ বলেছিলেন,

“People of Sierra Leone not only welcome Bangladeshi troops, but they are reluctant to let them leave as well.”

এই আহমদ তেজান কাব্বাহ প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থাতেই, ২০০২ সালে ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে সিয়েরা লিওনে বাংলাও অফিসিয়ালি সম্মানসূচক রাষ্ট্রভাষা। উল্লেখ্য, ২০০২ ছিল ভাষা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তির বছর।

এই মুহুর্তে ইংরেজির পর সিয়েরা লিওনে সম্মানসূচক ‘অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবে বাংলা দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত।

সিয়েরা লিওন, রাষ্ট্র ভাষা বাংলা

আপনি জেনে অবাক হবেন, পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটিতে এমনিতেই কিন্তু বহুভাষাভাষী জনগণের আবাস। এখানে ১৬টি আলাদা জাতিগোষ্ঠী বাস করেন, যাদের সবারই আলাদা ভাষা ও সংস্কৃতি আছে।

এই দেশে ‘ক্রিও’ নামক ভাষা কথ্য ভাষা হিসেবে বেশি প্রচলিত। তা স্বত্তেও দাফতরিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি স্বীকৃত। এমন একটি বহুভাষা-সংস্কৃতির দেশ শুধু বাংলাদেশিদের প্রতি ভালবাসা কিংবা কৃতজ্ঞতা থেকে বাংলা ভাষাকে তাদের রাষ্ট্রে সম্মানসূচক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে।

এমন স্বীকৃতি বাংলা ভাষাভাষী জাতি হিসেবে আমাদের জন্যে নিঃসন্দেহে সম্মানের, গর্বের। কিন্তু, কিভাবে সিয়েরা লিওনে বাংলা পরিচিতি পেলো?

বাংলাদেশি সেনারা যখন সিয়েরা লিওনে শান্তিরক্ষা মিশনে যান, তারা শান্তি ফেরাতে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফেরাতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে শুরু করে।

যোগাযোগের ভাষা হিসেবে শান্তিরক্ষী বাহিনী ইংরেজির সাথে বাংলাও ব্যবহার করতেন। স্বভাবতই বাংলা বুঝতে পারতেন না স্থানীয়রা। সৈন্যরা তাই মাঝে মধ্যে টুকটাক বাংলাও শেখাতে শুরু করেন তাদের।

মজার ব্যাপার হলো, স্থানীয়রা বাংলাকে আগ্রহের সাথে গ্রহণ করতে শুরু করে, শিখতে শুরু করে। সিয়েরা লিওনের যেখানে বাঙ্গালি সেনারা অবস্থান করতেন, ওইখানেই স্থানীয় তরুণদের কাউকে কাউকে দেখা যেত বাংলায় কথা বলতে।

বাঙ্গালি সংস্কৃতির সাথেও সিয়েরা লিওনের মানুষেরা পরিচিত হতে শুরু করেছিলেন সেই সময়টায়। সভা বা কোনো অনুষ্ঠানে বাংলা গান নাচ হতো মাঝে মধ্যে।

সিয়েরা লিওনে শান্তিপ্রতিষ্ঠায় আর দেশ গঠনে বাঙ্গালি সেনাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপই ২০০২ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট আহমদ তেজান কাব্বাহ বাংলা ভাষাকে সিয়েরা লিওনের অন্যতম সরকারি ভাষার (সম্মানসূচক) স্বীকৃতি ঘোষণা দেন।

এভাবে সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেলেও সেখানে বাংলার প্রচারে আমাদের ভূমিকা কিংবা আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

নিজেদের দেশেই আমাদের ভাষা-প্রেম দিবসভিত্তিক হয়ে গেছে অনেকটা। জীবন দিয়ে মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া জাতি হিসেবে আজকের দিনে বাংলা নিয়ে আমাদের কিছু ক্ষেত্রে উদাসীনতা কখনো কখনো হতাশাজনক৷

যাহোক, সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষা সম্মানসূচক সরকারি স্বীকৃতি – শুধু একারণে গর্বিত হওয়ার চেয়ে বেশি আনন্দের নিশ্চয়ই হতো, যদি দেখা যেত সেখানে বাংলা ভাষায় চর্চায় আগ্রহীদের জন্যে আমাদের দেশ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হতো। কোনো ভাষা ইন্সটিটিউট কিংবা বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্র হতো। এমন সুযোগ হয়ত এখনো হারিয়ে যায়নি….

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button