মতামত

চাই উন্নত মানের শো-অফ!

ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা যা করি, সবই শো-অফ। বেড়াতে গিয়ে আপনি একগাদা সেলফি আপলোড করেন কেন? মাঝরাতে খিচুড়ি রান্না করে সেটা খাওয়ার আগে ছবি তুলে ফেসবুকে দেন কেন? কুরবানীর ঈদের আগে গরুর সাথে সেলফি তুলে আপলোড করেন, কোনটা গরু আর কোনটা আপনি সেটাই বোঝা যায় না ঠিকটাক- কেন এটা করেন? বেঙ্গল বই বা দীপনপুরে গিয়ে বই আর চা-কফির কাপ পাশাপাশি রেখে ছবি তুলছেন ভালো কথা, সেটা ফেসবুকে আপলোডের কি দরকার? একটাই কারণ- শো অফ। আমরা শো অফের জন্যেই এসব করি। তাহলে মন্ত্রী মশাইয়েরা এক-দুইদিন শো-অফ করলে কি সমস্যা?

দেখুন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা রাজনীতিবিদদের শো অফ, হেঁটে অফিসে যাওয়া, হেলমেট ছাড়া বাইকে চড়া বা আরও যেসব কর্মকাণ্ড, এসবে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। শো-অফ ক্ষতিকারক কিছুও নয়। যতো খুশি শো অফ করেন, কিন্ত পুরো ব্যাপারটা বাস্তবসম্মত হতে হবে তো! নইলে যে জিনিসটা আবর্জনায় পরিণত হচ্ছে, সেটাও তো মাথায় রাখা দরকার!

এই যে ধরুন মন্ত্রীমশাইরা ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, পাবলিক বাসে চড়ছেন, কিংবা মোটরসাইকেলে উঠে পড়ছেন হেলমেট ছাড়া- এগুলোর ভালো রেজুলেশনের ভিডিও কেন ধারণ করা হচ্ছে না? এসব ৩৬০ পিক্সেলের যুগ কি এখন আছে? এখন তো আর কেউ ওয়াপট্রিকে ঢুঁ মারে না। লোকে চায় এইচডি, ফোর-কে হলে তো আরও ভালো! ক্যামেরা এত শেকি কেন? ফোকাস ঠিক থাকছে কোথায়?

ইদানিং তো শর্টফিল্মেও ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। তাহলে একজন মন্ত্রীর শো-অফ ভিডিওতে কেন ড্রোন থাকবে না? ভিডিওগুলো দেখে পরিস্কার বোঝা যায় যে এগুলো কোন প্রফেশনালের কাজ নয়, একদম আনাড়ি হাতে করা ভিডিও। একটা বিয়ের অনুষ্ঠানেও তো চার-পাঁচজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার থাকে, অথচ একজন মন্ত্রীর আশেপাশে প্রফেশনাল কেউ নেই, এটা মানা যায় নাকি?

কিছুদিন আগে দেখলাম, এক উপজেলা চেয়ারম্যানের মাটি কাটার ছবি ভাইরাল হলো। সেটা দেখে এক বড়সড় নেতাও গায়ে কাদামাটি মেখে ছবিটবি তুললেন। রাজনৈতিক নেতা নিজের গায়ে মাটি মাখবেন নাকি ময়লা মাখবেন, সেটা তার ব্যাপার। কিন্ত আমি হতাশ হলাম ছবির কোয়ালিটি দেখে। মন্ত্রীমশায়ের পেছনে এক লোক বেক্কলের মতো হাসছে! ব্যাকগ্রাউন্ডটা যে ব্লার করে দিতে হবে, এই জিনিসটাই তাদের মনে ছিল না! একজন রাজনৈতিক নেতা দেশের হাজারটা সমস্যা নিয়ে ভাবেন, ফটোগ্রাফির এসব টেকনিক্যাল ব্যাপারস্যাপার তাদের না-ও জানা থাকতে পারে। কিন্ত বাকিরা তো খেয়াল রাখবে এদিকে, তাই না?

শো-অফের নমুনা দেখে আসলেই হতাশ। ছবির লাইটিং ঠিক নেই, সাবজেক্টের ওপরে ফোকাস নেই, ভিডিওজুড়ে কাঁপাকাঁপি- এভাবে শো অফ হয়, বলুন? ইউটিউবে যে আপুটা দিয়াবাড়ি আর তিনশো ফিট নিয়ে ট্রাভেল ভ্লগ বানায়, তিনিও তো এরচেয়ে যত্ন করে কাজ করেন। তাহলে মন্ত্রী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি আর ভিডিওতে কেন যত্নের ছাপ থাকবে না?

আমাদের দেশে কাকের চেয়ে নাকি ফটোগ্রাফারের সংখ্যা বেশি। প্রেমিকা, বান্ধবী আর ভার্সিটির সিনিয়র-জুনিয়রদের ছবি তোলা ছাড়া এদের বেশিরভাগেরই অন্য কোন কাজ নেই। এই কর্মক্ষম যুবশক্তিকেও তো কাজে লাগানো যায় এসব শো-অফ সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে। ট্যাঁ-ফ্যাঁ করে ঘুরে বেড়ানো এই তরুণদের কাজে নিযুক্ত করার মাধ্যমে তো বেকার সমস্যারও সমাধান করা যায়। তাহলে আর ভোটের ইশতেহারে ঘরে ঘরে চাকরি কিংবা সরকারী চাকরিতে বয়সসীমা তুলে নেয়ার মতো হাস্যকর প্রতিশ্রুতি দিতে হয় না। এত এমপি, এত নেতা, এদের সবাই যদি শো-অফ শুরু করেন, তখন বরং এই দেশে বেকার খুঁজে পাওয়া যাবে না বোধহয়!

আবারও বলছি, শো অফ অবশ্যই হবে, একশোবার হবে। কিন্ত সেটাকে জাতে তুলুন, এসব গরীবি মার্কা ছবি-ভিডিও দিয়ে কিসের শো-অফ? আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করে সেখানে ‘মানিক ভাই’কে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হোক, দরকার হলে শো-অফের জন্যে ভাতার ব্যবস্থা করা হোক, তবুও সেগুলো যেন দৃষ্টিনন্দন হয়, ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে যেন আনন্দ পাওয়া যায়। আমাদের দেশের এমপি-মন্ত্রী-নেতাদের শো-অফের ভিডিও নিয়ে যেন আমরা গর্ব করতে পারি, আর বলতে পারি- এমন শো অফ-টি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button