রিডিং রুমলেখালেখি

মেকি ফটোগ্রাফি কিংবা লোক দেখানো কিছুর চেয়ে শুদ্ধ আনন্দ উপভোগ করুন!

ফেসবুকে একটা ওয়েডিং ফটো এসেছে। আলো আঁধারিতে তোলা। ছবির ডিটেইল দেখে ধারণা হলো, এমনভাবে বিয়ে না করতে পারলে প্রতিটি পুরুষ কিংবা নারীর জীবন বৃথা। কখনো ছেলেটিকে দেখে ভাবছি, সে ভাগ্যবান। কখনো মেয়েটিকে দেখেও তাই মনে হচ্ছে।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, একটা ওয়েডিং ফটোশ্যুটে ফটোগ্রাফারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। প্রথমবার আমার মনে হয়েছে, বর-কনের চরম দূর্ভাগ্য হল বিয়ের দিনে তাদের ফটোশ্যুটের মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কেউ কাছে ভিড়তে পারছে না। ফটোগ্রাফার ক্যামেরা হাতে প্রস্তুত। এক অ্যাসিসটেন্ট ছাতার মত কী যেন একটা ধরে আছে। দূরে আরেকজন স্প্রে-ক্যান নিয়ে রেডি। মেয়ের মা কাছে যেতে চাইল। তাকে নিষেধ করা হল। ফটোগ্রাফার রিহার্সেল শুরু করল। নিয়মকানুন বলল। এরপর কাউন্টডাউন শুরু করল। বর-কনে নির্দেশনামত পোজ দিল। স্প্রে করা হল ফোম। ছাতাওয়ালা কী যেন করল। ছবি উঠল। আবার আরেক পোজ। এভাবে কেটে গেল কয়েক ঘন্টা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তারা প্রিওয়েডিং ফটোশ্যুটও করেছে। বিয়ের পর আরো দুইবার হবে।

এরপর থেকেই আমার ধারণা হয়েছে, এত সুন্দর ছবি, চমৎকার তাকানো কিংবা হিম ধরিয়ে দেওয়া চোখের আড়ালে আছে কিছু মেকি রিহার্সেল। এমন ছবি দেখে নিজেদের আনলাকি ভাবার কোন যুক্তিই নাই। আমি যতবার ট্যুরগ্রুপগুলোর সাথে ট্যুরে গেছি, প্রত্যেকবারই মন খারাপ হয়েছে। ট্যুরের আগে তারা গ্রুপভর্তি ছবি দেয়। প্রকৃতি-ঝর্ণা-গাছের ছবি। দামি ক্যামেরায়, ড্রোনে তোলা এসব ছবি এডোবি ফটোশপের ভেতর দীর্ঘ প্রক্রিয়া অতিক্রম করে। এরপর গ্রুপে পোস্ট হয়। এইসব ছবি দেখে আমার ধারণা হয়, এত চমৎকার পৃথিবী? এই এলাকাটায় না যেতে পারলে জীবন বৃথা। ট্যুরে গিয়ে দেখি সবুজ ততটা নয় যতটা ছবিতে ছিল। ঝর্ণা ততবড় নয়, যতটা ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছে। ট্যুর মানেই ক্লান্তি, পায়ের ব্যাথা, দীর্ঘক্ষণ এটাসেটা খেয়ে ক্লান্ত পায়ে পাড়ি দেওয়া। এতটুকুই আনন্দ। বাকীসব ব্যবসায়িক প্রচারণা। ফেয়ার এন্ড লাভলি অ্যাডের মতো।

আমি প্রয়োজন না হলে ছবি তুলি না। এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট। ফটো না তুললে আরাম করে বসা যায়। হাঁটা যায়। ইচ্ছে মতো জিরানো যায়। সুন্দর প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা যায়। নিজের মস্তিষ্কে যতগুলো নিউরন আছে, ততগুলো মেমরি ক্যামেরায় নেই। আমি চাইলেই ইচ্ছেমত স্মৃতি আমার নিউরনে রেখে দিতে পারি। সময়টাকে স্থির ধরে রাখার কোন মানে হয় না। এখানে আরেকবার ফিরব। তখনকার ছবি অবশ্যই আলাদা হবে। আমি সেই দৃশ্যটাও স্মৃতিতেই ধরে রাখব।

আমি সীতাকুণ্ড থেকে ফেরার আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এখানে আর আসব না। ফেরার পর এখন আমি বারবার যেতে চাই। আমার কাছে ছবি থাকলে আমি যেতাম না। আমার নেগেটিভ সাইডগুলো মনে পড়ত। আমার কাছে সীতাকুণ্ড একটা স্থির ছবি হয়ে থেকে যেত। আমি বরং আরেকজনকে ট্যুরের গল্প করে আনন্দ নিতে চাই। একেকজন একেকভাবে মুহুর্তটাকে ধারণা করুক।

বিয়ের ব্যাপারটা বলি। একটা মেয়ের বিয়ে দেওয়া একজন বাবার জন্য অবশ্যই আনন্দদায়ক। জীবনে একবারই সুযোগ আসে এমন দিনের। ধর্মে স্পষ্ট বলে দেওয়া আছে, যে বিয়েতে খরচা কম, সেই বিয়েই সর্বোত্তম। আমাদের সমাজে যে বিয়েতে খরচা বেশি সেই বিয়ে তত সম্মানের। এখন একটা বিয়ে পার করতে বাবাদের বিশ ত্রিশ লাখের নিচে হয় না। অনেকের ক্ষেত্রেই কোটি পার হয়ে যায়। নানা আয়োজন। নানা ধরণের খাবার। লাল নীল লাইট। বংশের সবাইকে কেনাকাটা করে দিতে হয়। তবুও আমরা স্যাটিস্ফায়েড হই না। খেয়েদেয়ে ঘরে ফিরে বলি, মাংসটা কেমন করে রান্না করা। অতিথি যেন কম খেতে পারে। বরের মাথায় চুল নেই, বরটা কালো। কনে কেমন মোটা। কনের বাবা-মা কিপটা।

বাবা নামক অদ্ভুত বোবা প্রাণিটা যত টাকাই খরচা করুন, এই সমাজ সেটাকে গ্রহণ করবে না। বিয়ের পর বাবা কীসের ভেতর দিয়ে যাবে সেটা কেউ ভাববে না। হয়তো গোপনে অনেকগুলো টাকা ঋণও হয়ে গেছে, সেই খেয়াল কেউ রাখবে না। বাবার নিজের কাছে চাপ মনে হলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যাবে। এভাবে কতকাল?

বিয়ে বরং আরো রোমান্টিক হতে পারে। আরো জাঁকজমক হতে পারে। আমার দুই বন্ধু বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছেলেটা বাবাকে ম্যানেজ করেছে ঘরোয়া আয়োজনের। মেয়েটার বাবাকেও ছেলেটা হাত ধরে বলেছে, আমি এভাবেই চাই। দিলে দিবেন। না হলে বিয়ে হবে না। শেষ পর্যন্ত দুইদলই খুশি। কাজি ডাকা হল। ঘরে বিয়ে পড়ানো হল। রাতে তারা প্লেনে উড়াল দিল। বিয়ের আগে দুজন মিলে জমিয়েছে দশ লাখ টাকা। আগামী এক মাস আফ্রিকায় ঘুরবে। একশ মানুষকে খাওয়ানোর চেয়ে আমার কাছে ব্যাপারটা এক্সট্রিমলি রোমান্টিক মনে হয়েছে। বিয়ে মানেই অন্যের জন্য নয়। মানুষ একদিন না খেতে পারলে অভিশাপ দিবে না। কিন্তু একদিনের বোঝা আমৃত্যু কেউ টানবে সেটাও হয় না।

গত সাতদিনে তারা ফেসবুকে কিছু ছবি আপলোড দিয়েছে। প্রথম ভিজিট ছিল সাউথ আফ্রিকায়। ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক। লায়ন-লিওপার্ড-বাফালো-অ্যালিফেন্ট এর ছবি। সাথে তাদের আনন্দময় মুখের ছবি। পরের ভিজিট সম্ভবত কালাহারি।
একদিন মিসরে যাবে। মরুভুমি আর পিরামিডের গায়ে হাত ছুঁইয়ে আসবে। এমন সুযোগ জীবনে কয়বার মেলে? কয়বার একসাথে এতগুলো টাকা খরচা করার সুযোগ হয়?

একটা জীবনের পঁচিশ থেকে ত্রিশটা বছর চলে যায় শূন্য হাতে। এরপর একটা নতুন জীবন শুরু হয়। শুরু না হতেই হয়তো নতুন কিছু কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। কিন্তু একইভাবে পৃথিবী শুদ্ধ মানুষের মতো তো বাঁচা যায় না। একটু আলাদাভাবেও বাঁচা যায়। অর্থ খরচ করে, রিহার্সেল ফটোশ্যুট আর হাজারখানেক মানুষকে একদিন খাইয়ে আর কতদিন? নিজের টাকায়, নিজের জীবনসঙ্গীকে নিয়ে প্রথমদিনেই পৃথিবীর পথে পরিভ্রমণ, এরচেয়ে আনন্দময় কী হতে পারে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button