ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ক্যাসিনো সম্রাট, ‘ল্যাংড়া’ খালেদ ও ভেঙ্গে পড়া তাসের ঘর!

নেটফ্লিক্সে যারা নার্কোস দেখেছে তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে মাদক সম্রাট পাবলো এস্কোবার নিজেকে বাঁচাতে কি করত। রাষ্ট্রকে একপ্রকার আঙ্গুল দেখিয়ে বহাল তবিয়তে বসবাস করত। পুলিশের হাতে সে ধরা দিতে চাইতো না। নিজের তৈরি তার এক জেল ছিল। আশেপাশের দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সরকারি বাহিনী থাকবে না। তাকে পাহাড়া দেবে তার সহচররা। সেখানে এক আলিশান জীবন ছিল তার।

পাবলো এসকোবার, কিং অফ কোকেন

রাষ্ট্রকে আঙ্গুল দেখিয়ে এরকম সাম্রাজ্য বিস্তারকারী সম্রাট এখন আমাদের দেশেও আছে। তার নামও সম্রাট। যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের কথা বলা হচ্ছে।

ঢাকায় ওপেন সিক্রেট ক্যাসিনোগুলোতে এখন প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন অভিযান চালাতে শুরু করেছে, তখন একে একে ধরা পড়তে এবং এসব কাণ্ডের সাথে জড়িতদের নাম বের হতে শুরু করেছে।

যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে গ্রেফতারের পরই আলোচনা আসে দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নাম। শোনা যাচ্ছিলো গ্রেফতার হতে পারেন তিনিও।

গ্রেফতারের ভয়েই কিনা কে জানে, গত কদিন কাকরাইলে রাজমনি সিনেমা হলের অপরদিকে আটতলা এক ভবন, যাকে লোকে চেনে সম্রাটের অফিস নামে, সেই অফিস থেকে বের হচ্ছেন না সম্রাট। কাকরাইলে সেই অফিসে তাকে ‘পাহাড়া’ দিয়ে রাখছে তার অনুগত কর্মী বাহিনী৷ যারা মাঝে মাঝে চিৎকার দিয়ে স্লোগান দিয়ে উঠে এই বলে, “সম্রাটের কিছু হলে,জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’, ‘সম্রাট ভাই ভয় নাই,রাজপথ ছাড়ি নাই”।

যুবলীগ নেতা সম্রাট
যুবলীগ নেতা সম্রাট

এই যুবলীগ নেতা সম্রাটের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগের পাহাড়। যা প্রধানমন্ত্রীর কানে পর্যন্ত গেছে। মূলত প্রধানমন্ত্রী সভায় যুবলীগের কিছু নেতার কার্যক্রমকে রেফার করে যখন বলেন, ” এরা শোভন রাব্বানীর চাইতেও খারাপ” তখনই ধারণা করা হচ্ছিলো যুবলীগের ব্যাপারে কঠোর হতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা।

তার পরপরই ক্যাসিনো কাণ্ডে খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ওরফে ‘ল্যাংড়া খালেদ’কে আটক করা হয়। কোটি কোটি টাকা সহ আটক করা হয় আরেক যুবলীগ নেতা জি কে শামীমকে।

বলা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাতেই এবং সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। আর অভিযানের এই ঝড় থেকে নিজেকে বাঁচাতে যদি সম্রাট এই পাহাড়ার আয়োজন করে থাকেন, এর মাধ্যমে তিনি কাকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছেন?

পত্রিকায় এসেছে সম্রাটকে জুয়ারিরা ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ বলে জানে। তার প্রিয় নেশা এই জুয়া খেলা। তিনি সিঙ্গাপুরে ‘টাকার বস্তা’ নিয়ে জুয়া খেলতে যান বলেও কথিত আছে। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস’ ক্যাসিনোতে তার ভিআইপি মর্যাদা। সিঙ্গাপুরে চেঙ্গি এয়ারপোর্টে শুধু প্রথমসারির জুয়ারি হবার কারণে তাকে রিসিভ করার বিশেষ ব্যবস্থাও নাকি আছে। যুগান্তর পত্রিকার এক রিপোর্টে এই তথ্যগুলো এসেছে।

সম্রাটের এই কাকরাইলের অফিসেও নাকি চলে জুয়ার আসর। কিন্তু এখান থেকে জিতে আসার উপায় নেই। কেউ জিতলেও তার টাকা জোর করে রেখে দেয়া হয়। জোরপূর্বক এভাবে জুয়া খেলাকে জুয়ারিদের ভাষায় বলা হয় ‘চুঙ্গি ফিট’/ ‘অল ইন’। ‘অল ইন’ মানে একেবারে সর্বশান্ত হওয়া।

জুয়ার জগতে তার অন্যতম সহযোগী খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া গ্রেফতার হওয়ার পর সম্রাটেরও স্বস্তিতে থাকার উপায় নেই। আজ জানা গেল, খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ওরফে ‘ল্যাংড়া খালেদ’ গোয়েন্দাদের কাছে গড়গড় করে অনেক কথাই বলেছেন।

খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া
ছবি- বাংলা ট্রিবিউন

“স্যার, ধরা যখন পড়েছি, তখন আর চুপ থেকে ফায়দা কী। আমি সব বলব।

আমি একাই দোষী নই। সম্রাট ছাড়া কিভাবে ক্যাসিনো ব্যবসা হয়? কাউসার ও সাঈদও আমার সহযোগী। জি কে শামীমও এই কারবারে জড়িত। ক্যাসিনো মানে জুয়া খেলা। এখানে কাঁচা টাকা। শত শত কোটি টাকার খেলা। কাঁচা টাকা পেলে তহন সবাই হাত পাইতা দেয়। এই টাকার ভাগ পুলিশকে দিছি।”

এসব কথা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া বলেছেন গোয়েন্দাদের কাছে। খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া নিজেই ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে ক্যাসিনো দরবারের ‘গডফাদার’ বলে দাবি করে।

এই যখন অবস্থা তখন সম্রাট এই শহরে বহাল তবিয়তে আছেন, ‘সম্রাট’ এর মতোই। তাই বারবার মনে হয়, কেন মানুষ কষ্ট করে এন্টারটেইনড হওয়ার জন্যে নার্কোস দেখে, মাফিয়া, গডফাদারদের নিয়ে সিনেমা দেখে! দেখার মতো দৃশ্যের অভাব নেই আমাদের শহরেই…

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button