তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

মাছের কাঁটা ভালোবাসা: শশী কাপুর ও রূপকথা!

(১) “কাভি কাভি” সিনেমার একটা দৃশ্য আমার খুব পছন্দের। গল্পটিতে দেখায় রাখী কলেজ জীবনে একজনকে ভালোবাসতো, কিন্তু সে মানুষটা যখন দেখলো যে রাখীর বিয়ের কথা চলছে, সে কোন চেষ্টাই করলো না তাকে পাওয়ার, বরং ‘স্যাক্রিফাইস’ করে বসলো। সে লোকটি অমিতাভ, কবি মানুষ, এমন মেলোড্রামাটিক দুনিয়াতেই যে ডুবে থাকতে স্বস্তি বোধ করে, সেটি যে স্বার্থপর হতে পারে, সেটি তার মাথাতেই আসে না। যেমন, সে রাখীর মনের কথা শুনতে চায় না; আবার সে নিজে যখন বিয়ে করে তার স্ত্রীর সাথেও খুব ফর্মাল একটা সম্পর্ক বজায় রাখে, পুরোনো প্রেমের স্মৃতিটাই ধরে থাকে।

ওদিকে রাখী যাকে বিয়ে করে, সেই শশী কাপুর, তার মধ্যে রোমান্টিকতা কম, সে সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা-দুষ্টুমি করতেই থাকে; তার যে দায়িত্বশীল স্বভাব আর স্ত্রীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা মাঝে মাঝে এই হাসি ঠাট্টাতেই তলিয়ে যায়। যেমন, অমিতাভ দিব্যি কবিতা লিখেছিলো রাখীর চোখ দুটো নিয়ে; রাখী একদিন শশীকে জিজ্ঞেস করে, তার চোখ দুটো তার কাছে কেমন লাগে, কোন সুন্দর রোমান্টিক পংক্তি শোনার একটা নস্টালজিক আকাঙ্খা থেকে। শশী কিছু বলার চেষ্টা করে, শেষমেশ বেরসিকের বলে উঠে, মাথার উপরে ঝোলানো হাজার ওয়াটের বাতিটার মতন। এমন ‘প্র্যাকটিকাল’ কথা কে শুনিতে চায়? অতএব, কথাটি সেখানেই থেমে যায়।

আমার প্রিয় দৃশ্যটার কথা বলি। বহু, বহু বছর পর অমিতাভের সাথে শশী ও রাখীর ফের দেখা হয়ে যায়। শশী দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলে, এবং প্রথমদিকে তার একটু বেশ মন খারাপ হয়, ঈর্ষা বোধ হয়। কিন্তু সে মনোভাবনা সাময়িক; সে মন থেকেই সবাইকে সহজ করে দিয়ে বলে ওঠে, দেখো দেখি, কী বোকার মতো স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছিলাম আরেকটু হলে, এর কোন মানে হয়? বাড়ি ফিরে সেদিন রাখী খুব কাঁদে, (আর আমার প্রিয় দৃশ্যটি হলো), শশী সেটি লক্ষ্য করে রাখীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে, বন্ধুর মতো করে পাশে বসে বলে, “কি হলো?” শশী কাপুরের কোন রোমান্টিক কবিতা কপচানো লাগে না, সুখে দুঃখে স্ত্রীর যথার্থ সঙ্গী হয়ে থাকাটাই তার কাছে ভালোবাসা। রাখী তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি মানুষ না দেবতা? শশী হেসে বলে, এই এক জীবনে যদি ঠিকঠাক মানুষ হতে পারি, তবে সেটিই হবে অনেক বড় পাওয়া!

(২) বহুকাল আগে কখনো আমার মনে একটা তীব্র ভয় ছিলো, ‘সংসার’ নামক জিনিসটা নিয়ে।

মানে, প্রেমের কবিতা লিখি বুঝলাম, পাতার পর পাতা চিঠি লিখে যেতে পারি বুঝলাম, হঠাৎ সারপ্রাইজে যদি কাছের মানুষদের ঠোঁটে হাসি ফোটাতে পারি তাহলে বিশেষ মানুষটাকেও হয়তো আনন্দে ভরাতে পারি – সেটাও বুঝলাম। কিন্তু সংসার বড় জটিল জিনিস না? এই যে মা বাবাকে দিনের পর দিন কত ‘সাধারণ’ দিনে দেখি; সেই সাধারণ দিনগুলোতে কি কারো সাথে থাকতে পারবো? ক্লান্ত হয়ে যাবো না?

সেই মেয়েটারই একদিন কোথাও কারো রান্নাঘরে ‘মাছের কাঁটা’ পরিষ্কার করতে গিয়ে হঠাৎ ‘লাইট বাল্ব’ মোমেন্ট এসেছিলো, যে, আরেহ, দৈনন্দিনের ভালোবাসাটি, যাকে আমরা সংসার বলি, এতো কঠিন কিছু নয়; সবার জন্য এই মায়াটি জন্মায় না, কিন্তু যাদের জন্য জন্মায়, তাদের জন্য কিছু করতে হলে বুঝি ‘সহজ’ হয়ে যায়। আমার ভালোবাসার প্রকাশটা সাধারণত এমন গৃহস্থলীর কাজেকর্মে হয় না, তাই সেদিন বড় ‘আরাম’ বোধ হয়েছিলো, যে, হুউউউ, এতটাও বুঝি ‘আকাইম্মা’ আমি নই!

(৩) আমার ভীষণ প্রিয় একটি ভালোবাসার গল্প লিখে শেষ করি। বেশ ক’বছর আগে এক কাছের মানুষের মন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছিলো, সে নিজেই একদম গুঁড়িয়ে গিয়েছিলো। আমরা বেশ অনেকেই ছিলাম তার পাশে; আমি একদিন তার মনের মেঘ কাটাতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আর কোনদিন যদি ভালোবাসা এসে তার দ্বারে কড়া নাড়ে, তবে রোমান্টিক ডেইটে সে কোথায় যেতে চাইবে? তার নিজের তখন বিন্দুমাত্র আর বিশ্বাস নেই এমন কিছুতে, তাই তার জন্য সবচাইতে ‘অসম্ভব’ শহরটার নাম’ই সে বলেছিলো। তাকে টুকরো অবস্থাতে দেখতে ভালো লাগছিলো না বলেই আমি সেই স্বপ্নের শহরের একটি প্রতিচ্ছবি তার জন্য কিনে এনেছিলাম; বলেছিলাম, এমন কোথাও রাখো, যেখানে প্রতিদিন তোমার চোখ যাবে, একটা সময় হয়তো তুমি নিজেই আর খেয়াল করবে না, কিন্তু তোমার মনের চোখ ঠিকই প্রতিনিয়ত দেখবে। স্বপ্নটি সত্যি হবে কি হবে না জানা ছিলো না, আমি শুধু চেয়েছিলাম, সে আরেকবার বিশ্বাসটা অন্তত করতে শিখুক!

সে কথা রাখলো; একসময় দুজনাই ভুলে গেলাম। প্রায় দুবছর পরে একদিন সে ডাকলো আমাকে তার বাড়ি; – বললো, “তুমি ছবিটা দিয়েছিলে বলে আমি শুধু তোমাকেই বলছি,… বলো তো, আগামী সপ্তাহে আমি কোথায় যাচ্ছি?” তার মনের মেঘ ছিলো কখনো, কে বলবে তা? তার ঝলমল হাসিতেই সে বলে চলে, “আমি যাচ্ছি আমার স্বপ্নের শহরে, আমার স্বপ্নের মানুষটার হাত ধরে; আমিও কি কখনো ভেবেছিলাম, এমনটা সত্যি সত্যি কখনো হবে?” মনভাঙা সে মেয়েটা যেদিন যে সম্ভাবনার কথা মনে ধারণ করতেও পারেনি, আজ সে স্বপ্নটাই তার জন্য চিরন্তনের সত্যি।

এখনকার দিনে তার প্রিয় উক্তি? “Once in a while, right in the middle of an ordinary life, love gives us a fairy tale.”

সব কটি সাধারণ/অসাধারণ দিনগুলোতে, সবার প্রতি রইলো অন্তত একটি করে রূপকথার শুভ কামনা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button