সিনেমা হলের গলি

শক্তি কাপুর: নামকে ছাপিয়ে অভিনয়ই যার শক্তি!

জুনায়েদ এস প্রান্ত

“বাবা তুমি অন্যের হাতে কেন মার খাও? নায়ক হতে পারো না?” প্রশ্ন শেষে, চোখজুড়ে অভিমানের ছাপ।

ছোট্ট ফুটফুটে রাজকন্যার এমন প্রশ্নেই সেদিন আনমনে হেসেছিলেন বাবা। তখন তিনি যুবক। এখন বয়সের কোটা পঞ্চাশ পেড়িয়েছে বছর ষোল আগে। সেদিনের সেই ছোট্ট রাজকন্যাও বড় হয়েছে, জীবনকে বুঝতে শিখছে ধীরে ধীরে। কাজ করছে সেই জায়গাতেই, যেখানে “অন্যের হাতে মার খাওয়া” বাবাও দাপটের সাথে প্রতিভা ছড়িয়েছেন একসময়।

বাবা সুনীল কাপুরের সেসব ভাবনা ভাবতেই এখন অবাক লাগে, সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে, তাই না?!

ছোট্টসংসারে তিনি সহ স্ত্রী আর দুইসন্তান। আর এই নিয়েই তার গোটা জগৎ। ব্যস্ততা ঘিরে থাকা ব্যস্তময়ী জীবনের এখন ছিটেফোঁটাও নেই। তিনি জানেন, সেসব “রঙিন-কাব্য” এখন শুধুই “অতীত কাব্যগ্রন্থ” জুড়ে। তাইতো অবসর সময়ে, কফির মগ হাতে মাঝেমধ্যে বেখেয়ালি মনে সেসব কাব্যে চোখ বুলানোর ইচ্ছে জাগে। চোখের সামনে প্রতিটি পৃষ্ঠা উল্টে যেতে থাকে,আর শক্তি হারিয়ে যায় নিজের চিরচেনা জীবনগল্পে…

সালটা ১৯৫৮। ক্যালেন্ডারে সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখ। ভাগ্যবিধাতার লেখা এক গল্পের সূচনা সেই দিল্লি শহরে। বাবা সিকান্দার লাল কাপুর, ও মা শুশিলা কাপুরের কোলজুড়ে এলো পুত্রসন্তান। নাম রাখলেন “সুনীল”।

জন্ম আর বেড়েওঠা ভিন্ন নগরীতে হলেও, সুনীল সিকান্দার কাপুরের রক্ত আর দেহজুড়েই যেন ছিলো পাঞ্জাবের এক “মিট্টি”র ছোঁয়া। ছেলেবেলা পার করেছেন ভাইবোনদের সাথে হেসেখেলে, লড়াই করে। বইয়ের সাথে কখনো সখ্যতা করতে চাইতেন না। আর ফলাফল হিসেবে পরীক্ষায় কখনো থার্ড ডিভিশনের বেশি পাওয়া হতো না! পড়েছেন কখনো ‘হলি চাইল্ড’, কখনো ‘ফ্র্যাংক এন্থনি পাবলিক’, বা কখনো ‘সালওয়ান পাবলিক স্কুল’ এর মতো বিভিন্ন বিদ্যালয়ে।

অন্যদের সাথে মারামারি,আর দুষ্টমির মাত্রা এতোটাই ছিলো যে, যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে প্রায় তিনটি বিদ্যালয় থেকে বের করে দিয়েছিলেন শিক্ষকেরা! কলেজ জীবনে পড়েছেন নয়াদিল্লির ‘কিরোরিমাল কলেজে’। ব্যাচেলর অফ কমার্স বিষয়ে স্নাতক লাভ করা অল্পবয়সী সুনীলের, তখনও ঠিক বুঝা হয়নি, জীবনের রঙিন মঞ্চের নিয়ম কেমন! চোখজোড়া কিছু স্বপ্ন, আর মনের গভীরে কিছু আশা নিয়ে কিছুটা পথ অতিক্রম করেছিলো। একটি সময় এমন গন্তব্যে পৌছালো, যেখানে প্রায় হাজারো চোখ, লাখো স্বপ্ন নিয়ে আসে নিজের ইচ্ছেকে নিজের সামর্থ্য বানাতে!

সময়টা ১৯৭৩। সুনীল এক গেটের বাহিরে দাড়িয়ে আছে। উপরে বিশাল এক বোর্ড। গাঢ় করে লেখা “ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউশন অফ ইন্ডিয়া”।

সেখানে দাখিলা নেবার পর একদম প্রথমদিকেরই ঘটনা। হোস্টেলের নীচেই ধুতি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে হাত বাড়িয়ে পরিচয় হয়েছিলো সেদিন। “হ্যালো আমি মিঠুন চক্রবর্তী”। সুনীলও নিজের বাম হাতে থাকা বিয়ারের বোতল অফার করেছিলো তাকে। কিন্তু কিছুক্ষন পরে যা ঘটতে যাচ্ছিলো তা সুনীল কাপুরের কখনো ভাবনায়ও আসার কথা না। মিঠুন পিছন থেকে চুল ধরে বলেছিলো “আমি তোমার সিনিয়র এখানে”।

আরো তিনেক ছেলেকে সাথে নিয়ে, চারপাশের চুল কেটে জম্পেশ র্যাগিং করেছিলো রুমের ভেতর নিয়ে। অবশ্য পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি স্নেহ ও সহায়তা সুনীল, মিঠুন থেকেই পেয়েছেন।
মুকেশ খান্না, নাসিরুদ্দিন শাহ, রামেশ্বরীরা তখন তার ইন্সটিটিউটের ক্লাসমেট। বিজেন্দ্র ঘাটকে, রঞ্জিতা, মিঠুন চক্রবর্তীরা ছিলেন এক ব্যাচ সিনিয়র। লেকচারার হিসেবে পড়াতে আসতেন শাবানা আজমি।

ইন্সটিটিউটে ২য় বর্ষে থাকাকালীনই পেয়ে যান ছোট্ট সুযোগ। পরিচালক অর্জুন হিঙ্গোরানী তখন নতুন মুখের খোঁজে। ধর্মেন্দ্র, শাবানা আজমির সেই সিনেমায় ছোট্ট একটি চরিত্রে কাজ করা লাগবে। সিনেমার নাম “খেল খিলাড়ি কা”।
সত্যি বলতে, সুনীল ঠিক তখনো হয়তো জীবনের কঠিন দর্পনের মুখোমুখি হয়নি। হয়েছেন যখন, তখন তিনি ১৯৭৫-এ ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে বেরিয়ে গেছেন।

কাজের অভাব, ঠিকানা নেই, পেটে ক্ষুধা। জীবনের গল্পে এক নতুন পথ, যে পথের সীমা, জানা ছিলো না তার..

ছোট্ট একটি কক্ষ। মানুষ সংখ্যা গুণে গুণে ছয়জন। রুমমেট হিসেবে ছিলেন সেই মিঠুন চক্রবর্তীও। সবার জীবনই তখন থমকে আছে স্ট্রাগলিং-এ ভর করে। কখনো অনাহারে বা কখনো রুটি ভাগাভাগি করে খেয়ে বেড়িয়ে যান কাজের সন্ধানে। স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিও। যেখানেই ছোটোখাটো কাজ পাচ্ছেন, সেগুলো আপনমনে করেছেন। নায়ক হবেন, না কি করবেন! কিচ্ছু জানেন না, শুধু কাজের প্রয়োজন। প্রয়োজন টাকার। তবে ইচ্ছা ছিলো আরো বড় কিছুর। এমন করে আর কয়দিন?!

শুনেছিলেন সুনীল দত্ত সাহেব নতুনদের অনেক কাজ দেন। বিনোদ খান্না, লীনা চান্দ্রাভারকার, রঞ্জীতদের ব্রেক কিন্তু তিনিই দিয়েছেন। আগ্রহ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন দত্ত সাহেবের কাছে। রূপতারা স্টুডিওতে তখন তিনি শুটিংয়ে ব্যস্ত। কথা বলেছেন এরই ফাঁকে। কাজ চাওয়ার পর, দত্ত সাহেব তার চোখজোড়া দেখে বলেছিলেন, এমন চোখই প্রয়োজন নেগেটিভ চরিত্রে,একজন ভিলেইন হিসেবে। ছেলে সঞ্জয় দত্তের ডেবিউ সিনেমা ‘রকি’র একটি চরিত্র পেয়ে যায় সে। তবে নাহ, এই নাম দিয়ে যে হবে না!

সুনীল দত্ত সাহেবের মতে এমন ভারী নাম প্রয়োজন যা তোমার নেগেটিভ ব্যক্তিত্বকে আরো উজ্জ্বল করবে। দত্ত সাহেব ও নার্গিস’জি মিলে দিয়ে দিলেন এক নতুন নাম। শুরু হলো জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এক নতুন পরিচয় “শক্তি কাপুর”।

শক্তির আসা-যাওয়া তারপর দত্ত সাহেবের অফিস “অজন্তা আর্টস”-এ হয়ে গেলো নিয়মিত। ফাইটিং, ঘোড়া সওয়ারীতে প্রশিক্ষন নিলেন উনার অধীনেই। তবে সুনীল দত্তকে শক্তি অনেক জ্বালাতন করতো। খাবারের টাকা প্রয়োজন , চুল কাটা লাগবে সহ বিভিন্নভাবে। আর তিনি এতোটাই স্নেহ করতেন যে অজন্তা আর্টসের পক্ষ হতে মাসিক ১৫০০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেন। শক্তি কাপুর হরহামেশাই বলেন, আমার বাবা দিল্লিতে ছিলো ঠিকই, কিন্তু এই বোম্বে শহরে একজন বাবা হিসেবে আমি যাকে পেয়েছিলাম, তিনি সুনীল দত্ত।

ক্যারিয়ারের রঙিন মূহুর্ত তখনো অধরাই ছিলো শক্তির কাছে। পাওয়া বাকি ছিলো অনেক কিছুই। তবে নতুন এক গল্পের মোচড় ভিন্ন দিক দিয়ে নিয়ে যাওয়া একটি ঘটনাই যেন বদলে দিয়েছিলো কিছুটা পথ। পথটা চিনতে হলে আমাদের ‘লিংকিং রোড’ ধরে যেতে হবে!
পুরাতন মডেলের এক গাড়ি দিয়ে যাচ্ছিলেন শক্তি। পিছন থেকে বড় এক মার্সিডিজ দিয়ে ধাক্কা লাগে তার। গাড়ি থেকে বের হয়েই অকথ্য ভাষায় বেশ কিছু গালি ছুড়ে দেয় সে। তবে মার্সিডিজ থেকে যিনি বের হয়েছিলেন তাকে দেখে থমকে যাওয়া ছাড়া উপায় কি!

ততক্ষণে ভীড় জমে গেছে। না এই ঘটনার জন্য নয়! সেই ব্যক্তিটিকে দেখার জন্যে। আর তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যার রাগকে তখন পুরো ইন্ডাস্ট্রি চলে সমীহ করে। নাম “ফিরোজ খান”।হতভম্ব হয়ে যাওয়া শক্তি কাপুর কোনোকিছু চিন্তাভাবনা ছাড়াই বলেছিলেন ” স্যার, স্যার, আমি শক্তি কাপুর, আপনার সাথে কাজ করতে চাই, আমি ফিল্ম ইন্সটিটিউশনে ছিলাম..”

কিন্তু ততক্ষণে ফিরোজ সাহেব গাড়িতে চড়ে চলে যাচ্ছেন। শক্তি পথের দিকে চেয়েই দাড়িয়ে থাকলেন..

সেই ঘটনার দুদিন পর, শক্তির হাতে পয়সা-কড়ি নেই তেমন। খাবার খেতে শক্তি চলে গেলো রাইটার “কে.কে শুক্লা” এর বাড়িতে। শুক্লা বলেন “তোর কিচ্ছু হবে নারেহ, তোর নসিবটাই খারাপ” ফ্রাস্টেশনে ডুবে থাকা শক্তি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে “কেন এখন আবার কি করলাম?” কে.কে শুক্লা বলেছিলেন “আমি একটি কাহিনী লিখছি, সেটায় একটি চরিত্রে কাজ করার জন্য তোর কথা বলেছিলাম, সিনেমার নাম কুরবানী। কিন্তু ফিরোজ খান সাহেব মানা করে দিয়েছেন। সে বলেছেন কোন এক ছেলের সাথে নাকি টক্কর হয়েছে লিংকিং রোডে! রাগান্বিত ছেলেটির চোখই নাকি ছিলো ভিন্নরকম! যার চোখ দেখে ফিরোজ সাহেব ভয়ও পেয়েছেন ও মুগ্ধও হয়েছেন! তাকেই খুঁজে তিনি নিতে চান”। ”

“সেই ছেলে তো আমিই!” শক্তি কাপুর হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলো।

১৯৮০ ও ৮১ তে “রকি” আর “কুরবানী”র সফলতা,১৯৮৩ তে “হিরো” আর “হিম্মতওয়ালা” হিট! বলিউড যেন পেয়ে যায় এক নতুন স্টার। এক নতুন জাদুকরী ভার্সেটাইল ভিলেন। যার আন্দাজ, কন্ঠ সবকিছুই নিজেকে করে দেয় সবার থেকে আলাদা। নেগেটিভ শেডে রাজত্ব শুরু হয় তার নতুনভাবে। দারুণ ক্রিয়েটিভিটির সাথেই শক্তি পুরো ৭০ ও ৮০ দশক মাতিয়ে বেড়িয়েছেন নিজের মতোন করে। নায়ক হবার প্রচেষ্টাও চালিয়েছেন বর্ণীল ক্যারিয়ারে। তবে সে প্রচেষ্টা করার ভুল আর ২য় বার করা হয়নি।
কেননা “জখমি ইনসান” সিনেমাটি শুরু হবার আধঘন্টা পরই নামিয়ে দেয়া হয়! ফাঁকা সিনেমাহলে, সিনেমা চালিয়ে কি লাভ!

অবশ্য শক্তি ঠিকই বুঝে গিয়েছিলেন নিজের “শক্তির” জায়গাটা। নায়িকাকে কাছে টেনে সুরের তালে ভালোবাসা নয়, বরং ছিনিয়ে নিয়ে বা উঠিয়ে নিয়ে এসেই তার প্রতিভা দেখাতে হবে। শক্তি নিজের অভিনয়ের ছাপ এমনই ফেলেছেন যে, অনেক মেয়েরা নাকি শক্তিকে দেখেই ভয় পেতো! চরিত্রে ঢুকে যাওয়া শক্তির ক্ষিপ্রতা এতোটাই ছিলো পর্দায়, মজার ছলে বলা হতো “শক্তি কাপুর কোনো মেয়েকে ছুঁয়ে দিলেই, হয়ে যাবে প্রেগনেন্ট”!

সময়ের সাথে সাথে নিজেকে ভেঙ্গেছেন, নিজেকে গড়েছেন। তৈরি করেছেন নানান জুটিও। শক্তি গিয়েছিলেন ছেলে সিদ্ধান্ত কাপুরকে স্কুলে ভর্তি করতে। শিক্ষক ছোট্ট সিদ্ধান্তকে জিজ্ঞেস করলো “তোমার বাবার নাম কি?” উত্তরে বললো “শক্তি কাপুর”। মায়ের নাম? বললো ” শিবাঙ্গি কাপুর”। বোনের নাম? বললো “শ্রদ্ধা কাপুর”। তোমার দাদার নাম? উত্তরে বলেছিলো “কাদের খান”!

ছোট্ট সিদ্ধান্তের এ উত্তরের পিছনে যুক্তি আছে অবশ্য, কেননা বলিউড ইতিহাসের কিংবদন্তী অভিনেতা “কাদের খান” এর সাথে মিলে শক্তি করেছেন প্রায় ১২৫ টিরও বেশি চলচ্চিত্র! প্রায় অনেকগুলোর মাঝে কাদের সাহেব বাবা, আর শক্তি হয়েছেন ছেলে। দুজনই ছিলেন দুর্ধর্ষ ভিলেইন, আবার দেখুন কাদের খান সাহেব ও শক্তি কাপুর পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কাজটিকেই একপর্যায়ে আপন করে নিয়েছিলেন! পর্দায় “অন্যকে হাসানো”।
চোখ দিয়ে ভয় ঢুকিয়ে দেয়া শক্তির চ্যালেঞ্জটা বোধহয় তখন আরো কঠিন। নানারকম অঙ্গভঙ্গির সাথে, চমৎকার কমিক টাইমিং আর পেটে খিল ধরানো ডায়লগবাজী তো রয়েছেই।

আন্দাজ আপনা আপনা’র মোগেম্বোর ভাতিজা ক্রাইম মাস্টার গোগো হোক, কিংবা রাজাবাবুর নান্দু, শক্তি দিয়েছেন নিজের সেরাটা। সালমানের “জুড়ুয়া”য় রাঙ্গিলার তোতলামিতে দর্শক হেসে গড়াগড়ি খেয়েছে। বন্ধু ডেভিড ধাওয়ান, গোবিন্দ, কাদের খান,সাতিশ কৌশিক, জনি লিভারদের সাথে কাজের মাঝে নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। সেসময়গুলোতে সবচেয়ে সহায়তা পেয়েছেন বন্ধু গোবিন্দ আর ডেভিডের কাছেই। তারাই সহায়তা করেছেন ভিন্ন উপস্থিতির জন্য।

হাসির হোক কিংবা ভয়ানক, সংলাপকে রসালো করেই ছাড়তেন শক্তি। “আউউ ললিতা” যতনা তেলেগু “দেবতা” সিনেমায় কাজে লেগেছে, তারচেয়ে বেশি “তোহফা” সিনেমায় এটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন শক্তি কাপুর।
শক্তির জীবন গল্পকে যদি একটি মুদ্রা ধরি, তাহলে মুদ্রার একপিঠে যেমন কষ্ট, লড়াই, অর্জন, সফলতা, ঠিক অন্যপিঠে জমা হয়েছে, ধূসর কালো মেঘ। শক্তি বহুবার বহুভাবে জড়িয়েছেন নানান কনট্রোভার্সিতে।

২০০৫ এর দিকের কথা, নায়িকা হয়ে কাজ চাইতে আশা নারীটি ছিলেন মূলত একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক। তাদের মূল লক্ষটা ছিলো, স্টিং অপারেশন করে “কাস্টিং কাউচ” এর মতো বিষয় প্রকাশ্যে আনা। গোপনভাবে করা ভিডিওতে দেখা যায় শক্তি বলছে ” যদি ফিল্মে কাজ করতে চাও, তাহলে কাস্টিং কাউচের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে” পরবর্তীতে তিনি সেগুলো অবশ্য অস্বীকার করেছেন, নকল বলেছেন। বি-গ্রেডের সিনেমায় কাজ করেও হয়েছেন সমালোচিত। এই বয়সে ভিন্ন ধারার মুভিতে পুনম পান্ডের সাথে কাজ করেও হয়েছেন সমালোচনার পাত্র। রিয়েলিটি শো “নাচ বালিয়ে” ও “বিগ বস” এও অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি।

প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ৭০০ এরও বেশি চলচ্চিত্রে কাজ করা শক্তির সাথে সুসম্পর্ক ইন্ডাস্ট্রির বহু অভিনেতা, অভিনেত্রী, প্রযোজক, পরিচালকদের। কাজের মাধ্যমে ভালো সময় কাটানো থেকে শুরু করে,অভিনয় দিয়ে মুগ্ধ করে দেয়া, বিভিন্ন কারনেই এই হাসিখুশি মজার মানুষটি অনেকের প্রিয়।
পরিচালক সাইদুর রহমান সাইদের পরিচালনায়, রিয়াজ ও শাবনূর অভিনীত “এরই নাম দোস্তি” নামের বাংলাদেশী সিনেমায়ও কাজ করেছেন। এছাড়া, উরিষ্যা, গুজরাটি, নেপালী, মালায়লামসহ বহু ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছে শক্তি কাপুর। রাজাবাবুর নান্দু চরিত্রের জন্য জীবনে একটিই পুরষ্কার অর্জন, সেটি ১৯৯৫ এর ফিল্মফেয়ার।

বন্ধু গোবিন্দর সাথে “রাঙ্গিলা রাজা”র মাধ্যমে ফিরে আসার একটা চেষ্টা করেছিলেন বলিউডে। কিন্তু চেষ্টাটা ব্যর্থ। তবে ইন্ডাস্ট্রির মায়াজাল থেকে যে একেবারেই হারিয়ে গেছেন, তেমনটা নয়। রিশি কাপুর, গোভিন্দ, ডেভিড ধাওয়ান সহ বিভিন্ন বন্ধুর ডাকে এখনো উপস্থিত হয় শক্তি। নাচের সহ বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে এখনো অতিথি হিসেবে দেখা যায়। এইতো সেদিন কমেডির এক রিয়েলিটি শোতে, অর্ধাঙ্গিনী শিবাঙ্গির ছোট বোন অভিনেত্রী “পদ্মিনী কোলহাপুরী” কে সাথে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।

ব্যক্তিজীবনের রোমান্টিক অবতারের শক্তি কাপুর, ভালোবাসা আর টুকটাক খুনসুটিকে সঙ্গে করে নিয়েই শিবাঙ্গী কাপুরের সাথে জীবনের ৩৭টি বসন্ত কাটিয়ে দিলেন। বউয়ের ভাষা “মারাঠি” এতোবছর পরও বুঝতে না পারলেও, শিবাঙ্গি ঠিকই পাঞ্জাবি ভাষা শিখে ফেলেছেন। রাগে শক্তি পাঞ্জাবি ভাষায় একটি কথা ছুড়ে দিলে, স্ত্রী ছয়টি কথা তার দিকে ছুড়ে দেয়। যা শক্তি খুবই উপভোগ করে। বাসায় কোনো বিষয় তার থেকে লুকিয়ে রাখতে হলে, ছেলে, মেয়ে ও তাদের মা মারাঠি ভাষায় নাকি একজন আরেকজনের সাথে কথা বলতে শুরু করে, এর উপর কাজের লোক সেও মহারাষ্ট্রের! তখন নিজেকে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় “বেচারা” মনে করেন।

কিন্তু এসব ছোটোখাটো আনন্দ নিয়েই তার জীবন চলছে। কেননা ঐ যে ক্যারিয়ারের সেই রঙিন কাব্য তো, অতীতের কাব্যগ্রন্থে! যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কতশত ভিলেনদের আগমন হচ্ছে। হচ্ছে বহু এমন অভিনেতাদের আবির্ভাব, যারা পর্দায় এসে হাসাবেন। শক্তিদের সময়টাতো বহু পিছনেই রেখে এসেছে। এখন তো আর সেদিন নেই। এখন অপেক্ষা থাকে, মেয়ে শ্রদ্ধা কখন জড়িয়ে ধরে এসে, বাবাকে নিজের সিনেমার গল্প বলবে।

“রাঙ্গিলা, নান্দু সাবকা বান্ধু, কিংবা ক্রাইম মাস্টার গো গো এর আখে নিকালকে গোটিয়া খেলার ” বিষয়গুলো দর্শকদের কাছে কখনো পুরনো হবার নয়। সেই ভিলেন রূপী শক্তিরা এখনো ভয় ধরিয়ে দিতে দ্বিধা করতে চান না। আর এমন গল্পগুলোকে চিরস্মরণীয় করে রেখেই তো ‘শক্তি কাপুর’রা হয়ে থাকেন শতবছরের বলিউডের একেক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাদের অবদান লেখা থাকে মুগ্ধতার কালিতে, কখনো অজস্র ভক্তের হৃদয়ে, কখনোবা শ্রেষ্ঠত্বের পাতায়। যে অবদানগুলো কখনো ভোলা যায়না, আর যে কালি হয়তো কখনোই মেটানো যায়না….

কৃতজ্ঞতা- জাস্ট বলিউড ফেসবুক গ্রুপ

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button