খেলা ও ধুলা

সাকিব আল হাসান: আমাদের সুপারম্যান!

নাজিবুল্লাজ জাদরান এগিয়ে এলেন বলটাকে সপাটে হাঁকাতে। সাকিব সম্ভবত আগেই ব্যাটসম্যানের মনোভাবটা পড়ে ফেলেছিলেন। গুডলেন্থে পড়ে বলটা সামান্য বাঁক নিলো, তারপর নাজিবুল্লাহ’র ব্যাটকে ফাঁকি দিয়ে জমা পড়লো মুশফিকের গ্লাভসে। নাজিবুল্লাহ তখন উইকেট ছেড়ে অনেকটা বাইরে, মুশফিক ভাঙলেন স্ট্যাম্প। গ্যালারিতে গর্জন শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে, টেলিভিশন বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে বসে আমরা চেঁচাচ্ছি আউট! আউট! করে, বারবার নাম নিচ্ছি সাকিবের।

রেকর্ডবুকের পুরনো অনেকগুলো পাতা খুলে গেল আজ, ঢুঁ মারতে হলো স্মৃতির চোরাগলিতে। ক্রিকেট পরিসংখ্যান আজ সাকিবের ওপর বিরক্ত হবে নিশ্চিত, অনেকগুলো পাতায়, অনেকগুলো লাইন ওলট পালোট করে নিজের নামটা যে সেখানে লিখে ফেলার কাজটা করেছেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার।

ব্যাট হাতে অর্ধশতক, বল হাতে পাঁচ উইকেট- আজকের ম্যাচটা কতটা সাকিবময় ছিল, সেটা বলে না দিলেও চলছে। সাকিবের এই পারফরম্যান্সের মাহাত্ম্য বোঝা যাবে তখন, যখন জানবেন বিশ্বকাপের একই ম্যাচে অর্ধশতকের পাশাপাশি পাঁচ উইকেট শিকারের ঘটনা ঘটেছিল একবারই, ২০১১ বিশ্বকাপে সেই কীর্তি গড়েছিলেন যুবরাজ সিং। দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি আজ করলেন সাকিব।

বিশ্বকাপের এক আসরে কমপক্ষে একটি সেঞ্চুরি এবং এক ম্যাচে পাঁচ উইকেট শিকারের কীর্তি এর আগে ছিল দুটি, সাকিব সেই সংখ্যাটাকে আজ তিনে নিয়ে গেলেন। ১৯৮৩ বিশ্বকাপের কপিল দেব, ২০১১ বিশ্বকাপের যুবরাজ সিঙের পাশে এখন জ্বলজ্বল করছে সাকিব আল হাসান আর বাংলাদেশের নামটা।

ব্যাট হাতে জ্বলছিলেন আগে থেকেই। দুই সেঞ্চুরীর পাশাপাশি আগের পাঁচ ম্যাচে ছিল দুটি হাফসেঞ্চুরীও। অর্ধশতকের সংখ্যাটাকে আজ তিনি নিয়ে গেলেন, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের আসনটাও ডেভিড ওয়ার্নারের কাছ থেকে পুনর্দখল করলেন আবার। কিন্ত বল হাতে সময়টা খুব বেশি ভালো যাচ্ছিল না। মানে সাকিবীয় মানের কাছাকাছি ছিলেন না।

সেই মিশনে সফল হবার জন্যে আজকের ম্যাচটাকেই হয়তো টার্গেট করেছিলেন সাকিব। ধীরগতির স্পিনসহায়ক উইকেট, বল টার্ন পাচ্ছে দারুণভাবে- সাউদাম্পটনের সেই উইকেটটাকে আফগানদের জন্যে বধ্যভূমি বানাবেন বলে স্থির করেছিলেন হয়তো সাকিব। বোলিং আক্রমণে এসেই উইকেট তুলে নিলেন, পাওয়ার প্লে-তে যে আফগানরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তারাই শামুকের মতো খোলসের ভেতরে ঢুকে গেল সাকিবের ভয়ে।

নাইব, রহমত, আফগান, নবী এবং নাজিবুল্লাহ- এই পাঁচ ব্যাটসম্যান সাকিবের শিকার। এরমধ্যে নবীকে আউট করেছেন পুরোপুরি ফাঁদে ফেলে। উইকেটে আসার পরে প্রথম বলটা ফেলেছিলেন সোজাসুজি। পরের আর্ম ডেলিভারিটাও একই লেন্থে, একই লাইনে, শুধু সামান্য একটু ভেতরে ঢুকলো, তাতেই বোকা বনে গিয়ে বোল্ড হলেন নবী। তিন বলের মধ্যে দুই উইকেট শিকার সাকিবের!

এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রানের মালিক এখন সাকিব, নামের পাশে জমা পড়েছে দশটি উইকেটও। বিশ্বকাপে তার মোট রান এখন ১০১৬, উইকেট ৩৩টি। কমপক্ষে এক হাজার রান এবং ত্রিশটি উইকেটের কম্বো নেই দুনিয়ার কোন ক্রিকেটারের দখলে, সেটার মালিক একমাত্র সাকিব আল হাসান, আমাদের সুপারম্যান, বাংলাদেশের জান, বাংলাদেশের প্রাণ!

Image Courtesy- espncricinfo.com

আজকের বোলিং ফিগারটা সাকিবের ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। এর আগে ওয়ানডেতে একবারই পাঁচ উইকেট পেয়েছিলেন সাকিব, ২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। আর সাকিবের হাত ধরে বিশ্বকাপে পাঁচ উইকেট শিকারী বোলার পেলো বাংলাদেশ দল। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে এর আগে কেউই বিশ্বকাপে এক ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিতে পারেননি।

বিশ্বকাপের এই আসরে সাকিবের রান ৪৭৬, গড় ১১৯! বল হাতে উইকেট নিয়েছেন দশটি। প্রথম পর্বে বাংলাদেশের বাকী আছে আরও দুই ম্যাচ, যেমিফাইনালে উঠতে পারলে পাওয়া যাবে বাড়তি একটা ম্যাচও। পারফরম্যান্সটা বজায় থাকলে যে মিশন নিয়ে সাকিব বিশ্বকাপে এসেছেন, নিজের জাত চেনাচ্ছেন, সেটা পূরণ হবে নিশ্চিত। মিশনের নামটা জানেন তো? ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়া! আজ যে কীর্তিতে সাকিব নাম লিখিয়েছেন যুবরাজের পাশে, তিনি কিন্ত বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন। তাহলে কি সাকিবও…?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button