খেলা ও ধুলা

ফাঁদ পেতে শিকার করেন সাকিব, বন্দুক দিয়ে নয়!

এন্ডু ফ্লিনটফ যখন অবসরের ঘোষণা দেন ২০০৯ সালে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই অলরাউন্ডারকে নিয়ে বহু বহু ফিচার লেখা হয়েছিল। ফিচারগুলোর বেশিরভাগ ছিল ২০০৫ এর এশেজ নিয়ে, যে সিরিজটা ফ্লিনটফকে রূপকথার নায়কে পরিণত করেছিল। শুধু একটা ফিচার ছিল ব্যতিক্রম। সেখানে অলরাউন্ডার ফ্লিনটফ না, বরং বোলার ফ্লিনটফকে নিয়ে গবেষণা করা হয়। লেখক উল্লেখ করেন, “আমরা অলরাউন্ডার ফ্লিনটফকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেক সময়ই বোলার ফ্লিনটফকে আন্ডারএস্টিমেট করে বসি।”

সাকিবের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে বোধহয়। নিঃসন্দেহে অলরাউন্ডার সাকিব একজন বিস্ময়। কিন্তু বোলার সাকিব বোধহয় অলরাউন্ডার সাকিবের চেয়েও ভ্যালুয়েবল। তিন ফরমেটেই সাকিব আমাদের বোলিং নিউক্লিয়াস। সমান সফলতায় তিনি রাজত্ব করছেন সব ফরম্যাটেই। কিন্তু এর পিছনে কারণটা কি? সাকিবের বলে কি এমন আছে যা তাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছে?

সাকিবের বোলিং আমার কাছে এক আনন্দদায়ক গবেষণার ব্যপার। আপনি সোজাসাপ্টা বলতে পারবেন না যে “অমুক বলটার কারণে সাকিব সফল।” সাকিবের বোলিংটা আমি নিজের স্বল্প জ্ঞান থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে প্রথমে সাকিবের বোলিঙের বেসিক নিয়ে কথা বলব। তারপর আলাদাভাবে সীমিত ওভার আর টেস্টে ওর বোলিং নিয়ে কথা বলব।

বেসিক

সাকিব হচ্ছেন একজন বাঁহাতি অর্থোডক্স স্লো বোলার। বাঁহাতি বোলার বলেই ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের উপর তার খানিকটা বাড়তি এডভান্টেজ আছে। কিন্তু সেটা ১২ বছর ধরে সফল হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়। সাকিবের সাথে অপরাপর বাঁহাতি স্লো আর্ম বোলারদের তফাতটা সাকিবের বল রিলিজ পয়েন্ট থেকেই শুরু হয়। বেশির ভাগ বোলাররাই বল রিলিজ করেন মাথার উপর থেকে। এতে বলের লাইন কন্ট্রোল করতে সুবিধা হয়। কিন্তু সাকিবের একশনটা তেমন নয়। তিনি বল করেন রাউন্ড আর্ম, বল রিলিজ পয়েন্টটা থাকে বেশ খানিকটা বাইরে, অনেকটা তার বাম কানের সমান্তরাল থেকে। এভাবে বল করলে লাইন লেংথ ঠিক রাখাটা দূরূহ। তাছাড়া এক্ষেত্রে লাইন এবং লেংথ পরস্পরের পরিপূরক। লাইন বদলাতে গেলে লেংথও বদলাতে হবে, এবং ভাইস ভার্সা। এখানেই সাকিবের মুন্সিয়ানা। বোলিঙের উপর তার এতটাই কন্ট্রোল যে এই দুরূহ এংগেল থেকে বল করলেও আজ অব্ধি তাকে লাইন-লেংথ ভুল করে ফেলতে দেখিনি কখনো। কন্ট্রোল হচ্ছে তার বোলিংয়ের বেসিক স্ট্রেংথ।

সীমিত ওভার

সীমিত ওভারে সাকিবে বল করেন অনেকটা ফ্ল্যাট ট্র‍্যাজেক্টরিতে। স্টক ডেলিভারি হচ্ছে অফ স্ট্যাম্পের ঠিক বাইরে, গুড লেংথের চেয়ে সামান্য ফুলার লেংথে। সাকিব এখানে লাইন (এবং অবধারিতভাবে লেংথ) এমন সুক্ষ্মভাবে চেঞ্জ করেন যে ব্যাটসম্যানদের এই পরিবর্তনটা ধরতেই অসুবিধা হয়। একে তো কোনাকুনিভাবে বল আসছে, তার উপর লাইন লেংথের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম ক্যালকুলেশনের পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে না ব্যাটসম্যাস ফ্ল্যাট ট্র‍্যাজেক্টরি আর ফুলার লেংথের কারণে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো যোগ হচ্ছে সাকিবের পেস ভ্যারিয়েশন। সব মিলিয়ে পৃথিবীর যেকোন ব্যাটসম্যানের ত্রাহি মধুসুদন দশা হওয়ার জন্য এইটুকু যথেষ্ট।

টেস্ট

টেস্টে সাকিব ফ্লাইটের উপর বল করেন। কাজটা তার বোলিং একশনের সাপেক্ষে খুবই কঠিন, কিন্তু সাকিবের কন্ট্রোলটাও সেই লেভেলের। এক্ষেত্রে তার স্টক ডেলিভারি অফ স্ট্যাম্পের উপর/সামান্য বাইরে এবং গুড লেংথে। কোণাকোনি এংগেলে বল এসে পিচ করছে বটে, কিন্তু বলটা স্ট্যাম্প বরাবর রাখার মতো পর্যাপ্ত টার্ন তিনি করাতে পারেন। অনেকের কাছেই সাকিবের টার্নগুলো চোখে পরে না, কারণ অপর বোলারদের টার্ন বলকে ব্যাটসম্যানের আয়ত্ত্বের বাইরে নিয়ে যায়, যেটা ব্যাটসম্যানরাও আশা করে। সাকিবের টার্ন উলটো কাজ করে। বলকে স্ট্যাম্পের মধ্যে রাখে তার টার্ন, যেটা ব্যাটসম্যানরা অনেক সময় আশা করে না। সাথে যোগ হয় তার তাবৎ ভ্যারিয়েশন।

সাকিবের সাফল্য আসলে তার টার্ন, ভ্যারিয়েশনের কারণে আসেনি। তার সাফল্যের মূল কারণ হচ্ছে মস্তিষ্ক। তিনি যত না বোলিং দিয়ে উইকেট নেন, তার চেয়ে বেশি উইকেট নেন মাথা দিয়ে। ফাঁদ পেতে শিকার করেন সাকিব, বন্দুক দিয়ে নয়।

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা- ফারহান আনজুম ধ্রুব

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button