খেলা ও ধুলা

ফয়সাল থেকে সাকিব আল হাসান- এ জার্নি বাই ক্রিকেট

দাদা বলেছিলেন, অনেক বড় হতে হবে দাদুভাই; এতো বিখ্যাত হতে হবে যে, দুনিয়ার সবাই জানবে তোমার নাম। যখন তুমি বাড়ী আসবে, সবাই দল বেঁধে ভিড় জমাবে তোমায় দেখতে।

ছোটবেলায় দাদার খুব ন্যাওটা ছিলেন। সারাক্ষণ আশেপাশে ঘুরঘুর। রোজ রাতে দাদা গল্প শোনাতেন। রাজা রাণীর গল্প, পাতালপুরির রাক্ষস খোক্ষসের গল্প, রাজকুমারীকে উদ্ধার করতে আসা সাহসী রাজকুমারের গল্প। যাকে গল্প শোনাচ্ছেন, সেই নাতীও যে একদিন রাজপুত্র হবেন, দাদা ভেবেছিলেন কি কখনো? কে জানে! দাদার কোলে বসে গল্প শোনা সেই বছর চারেকের ছেলেটা এখন মাগুরায় নিজের বাড়ীতে গেলে শহরবাসীর ঢল নামে। একনামে তাঁকে চেনে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব। একটা ম্যাচ জেতার পর ফোনে তাঁকে অভিনন্দন জানান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী! ষোলকোটি মানুষের একটা দেশের প্রিয় খেলাটার আশা আকাঙ্খা স্বপ্ন সবকিছু মিশে থাকে এই যুবকের নামের সাথে! প্রত্যাশার হিমালয়সম বোঝা মাথায় নিয়ে নিরন্তর যিনি মাঠের সবুজের বুকে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের ছোট্ট তালিকায় আজ সসম্মানে উচ্চারিত হয় তাঁর নামটা।

বলটা গোল, খেলাটা আলাদা

মাশরুর রেজার ফুটবলের খুব শখ ছিল ছোটকালে। তৃতীয় বিভাগে কিছুদিন খেলেছিলেনও। কিন্ত জীবিকার তাগিদে জীবন নদীর গতিপথটা পাল্টে হয়ে গেলেন পুরোদস্তুর ব্যাংক কর্মকর্তা। প্রথম সন্তান ফয়সালের যখন জন্ম হলো, ঠিক করেছিলেন ছেলেকে ফুটবলার বানাবেন, নিজের দেখা অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণ হবে ফয়সালের চোখে। কিন্ত ভাগ্যদেবতার ইচ্ছেটা ছিলো অন্যরকম। ফয়সালের বেড়ে ওঠার সময়টায় এই বঙ্গে ক্রিকেট ডালপালা মেলছে, কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জয়, মালয়েশিয়ায় আকরাম-নান্নু-মিনহাজদের পাগলাটে দৌড় ফয়সাল দেখেছিলেন কিনা কে জানে! তারপর তো ১৯৯৯ বিশ্বকাপে নর্দাম্পটনে রূপকথার পাকিস্তানবধ! ফুটবল ছেড়ে বছর বারো’র ছেলেটা প্রেমে পড়লো ক্রিকেটের। নতুন একটা গল্পের সূচনা হলো, শুরু হলো আমাদের ছোট্ট ক্রিকেটীয় রূপকথার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়টার।

টেপ টেনিস বলে তাঁর বাঁহাতি পেসে হরহামেশাই নাকাল হতেন প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানেরা, মাঝেমধ্যে রান আটকানোর নেশায় স্পিনটাও করতেন। আশেপাশের গ্রামগুলোয় কোন টুর্নামেন্ট হলেই সবার চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতেন সেদিনের ফয়সাল, বলকে উড়িয়ে সীমানা ছাড়া করতেও ভালো জানতেন বেশ। নিজের এলাকায় ইসলামপুর রোড ক্রীড়াচক্রের হয়ে মাগুরা ক্রিকেট লীগে খেলতে নেমে প্রথম বলেই নিলেন উইকেট, প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটেই ক্রিকেট বলে তাঁর করা প্রথম ডেলিভারী ছিলো সেটি!

বিকেএসপির বৈঠকখানায় 

সাভারের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংক্ষেপে বিকেএসপি; বাংলাদেশের খেলাধুলা শিক্ষার আঁতুড়ঘর। এখানেই শুরু মাগুরার এক অখ্যাত কিশোরের বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার মিশনের। বিকেএসপির খাতায় “সাকিব আল হাসান” নামটা লেখা হলো কলমের কালিতে, সেই নামকে কি দারুণ কৃতিত্বে সাকিব লিখেছেন প্রতিটা বাংলাদেশীর হৃদয়ে; প্রত্যেক ক্রিকেটপ্রেমীর অন্তরেও নয় কি? স্বর্ণাক্ষরে ছাপানো তিন শব্দের এই নাম, বিশ্বক্রিকেটের হাজারো কীর্তি আর কীর্তিমানের ভীড়ে হীরকখণ্ডের মতো চকচক করে এক বাংলাদেশীর কৃতিত্ব- রূপকথার চেয়ে কম কোথায়?                         

বাংলাদেশ নাও চিনে 

মাত্র পনেরো বছর বয়েস তখন, ডাক পেলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ২০০৫-এ তিনজাতি সিরিজের ফাইনালে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঝোড়ো সেঞ্চুরীর পাশাপাশি নিলেন তিন উইকেট, হলেন ম্যাচসেরা। বয়সভিত্তিক দলে পারফরম্যান্স নজরকাড়া, ছিলেন জাতীয় দলের রাডারেই। মোহাম্মদ রফিককে সঙ্গ দেয়ার মতো বাঁহাতি স্পিনারের খোঁজে তখন হন্যে হয়ে ঘুরছেন নির্বাচকেরা। প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ একটা জুয়া খেললেন ২০০৬-এ; মুশফিক-ফরহাদ রেজার সাথে সাকিব; তিন নবাগতকে পাঠিয়ে দিলেন জিম্বাবুয়ে সফরে। আগেই সিরিজ হার নিশ্চিত হয়ে যাওয়া ম্যাচে শাহরিয়ার নাফীসের সেঞ্চুরীতে আট উইকেটে জয়; সেদিন সাকিবকে হয়তো আলাদাভাবে নজর দিয়ে দেখেননি কেউই। ব্যাটিংয়ে ত্রিশ রানের পাশে হাত ঘুরিয়ে আউট করেছিলেন এলটন চিগাম্বুরাকে। কিন্ত সাকিব তো রাজপুত্র হতে এসেছেন, সবার নজর নিজের দিকে টেনে নেয়াই যার কাজ!

বিশ্বমঞ্চে দৈত্যবধ

ক্যারিবিয়ান সাগরপাড়ে ২০০৭ বিশ্বকাপের মঞ্চ, অচেনা মাঠে চেনা প্রতিপক্ষ। তারপরের গল্পটা সবার জানা। মাশরাফি তোপের পর তামিমের ব্যাটে চড়ে সাদা বলের গ্যালারীর দিকে ভেসে যাওয়া, সাকিব মুশফিকের দৃঢ়তায় একশো বিরানব্বইয়ের ভারতকে মাড়িয়ে ছুটেছিলো টাইগারদের জয়রথ। একটা প্রজন্মের বিদায়ে ব্যাটনটাও কি হাতবদল হলো না তাতে? এই ম্যাচ দিয়েই হয়তো প্রতীকিভাবে বাশার-রফিকদের হাত থেকে মাশরাফি-সাকিব-তামিম নামের এই তরুণ তুর্কীদের হাতে উঠে গেলো বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্বটা। সুপার এইটে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরেকটি অর্ধশতক; আঠারো পেরুনো মাঝারী উচ্চতার এক বাংলাদেশী পুরো ক্রিকেটবিশ্বকে সেই বসন্তে বার্তা দিয়েছিলেন- “রিমেম্বার দ্যা নেম! সাকিব আল হাসান”…

যত কাণ্ড বাইশগজে 

ভারতের বিপক্ষে ২০০৭-এ টেস্ট অভিষেক, এখন পর্যন্ত সাকিব লাল বলের ম্যাচ খেলেছেন পঞ্চান্নটি। প্রায় চল্লিশ বেশি গড়ে তাঁর মোট রান  ৩৮০৮, চব্বিশটি হাফসেঞ্চুরীর পাশে মাত্র পাঁচটি শতক বড্ড বেমানান। বোলার সাকিব আবার দেশসেরা; ঝুলিতে উইকেটসংখ্যা ২০৫ টি। বাংলাদেশী বোলারদের মধ্যে শুধুমাত্র মোহাম্মদ রফিকেরই আছে একশো উইকেট। তবে বোবা পরিসংখ্যানের সাধ্য কি বাংলাদেশ দলে সাকিবের অবদানটা তুলে ধরার! সাকিবের খেলা পঞ্চান্ন টেস্টের মধ্যে একুশটিতে বাংলাদেশ হারেনি, নয়টিতে পেয়েছে জয়। এই একুশ ম্যাচে ব্যাট হাতে ইনিংসপ্রতি প্রায় পঞ্চাশ গড়ে রান করেছেন সাকিব, বল হাতে নিয়েছেন ৮৯টি উইকেট। ক্যারিয়ারের বোলিং গড় একত্রিশ, এই আঠারো ম্যাচে সেটা পঁচিশেরও কম!

রঙিন পোশাকে যাই। সাত শতক আর চল্লিশ অর্ধশতকে সাকিবের রান সাড়ে ৫৫৭৭। সাকিবের খেলা ১৯৫ ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে ৮৮টি তে। ক্যারিয়ারের অর্ধেকের বেশি রানই সাকিব করেছেন এই ৮৮ ম্যাচে, বাংলাদেশের জেতা ম্যাচগুলোর মধ্যে ব্যাট হাতে সাকিবের গড়টাও দারুণ ঈর্ষণীয়, ৪৮.৫০! সাত সেঞ্চুরীর ছয়টিতেই জিতেছে দল, ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছেন মোট আঠারোবার। ২৪৭ উইকেট শিকার করেছেন ওয়ানডেতে, এরমধ্যে ১৩৪টি পেয়েছেন দলের জেতা ৮৮ ম্যাচে। পাঁচ উইকেট নিয়েছেন একবার, চার উইকেট চারবার। নিন্দুকেরা বলেন, সাকিব আল হাসান নামের লোকটা স্বার্থপর, দলের জন্যে না খেলে নিজের জন্যে খেলেন। পরিসংখ্যান সাক্ষী দিচ্ছে, পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি উচ্চতার এই ছেলেটা “স্বার্থপর” হলেই বাংলাদেশ বেশী জেতে। সাকিব, প্লিজ আরো স্বার্থপর হয়ে যান আপনি! আমরা স্বার্থপর সাকিবকেই চাই।

রেকর্ড নিয়ে ছিনিমিনি 

বামহাতি এই ছেলেটার জন্মই হয়েছে যেন রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলায় মেতে ওঠার জন্যে। সাদা পোশাকে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাঁর, ওয়েলিংটনে ২০১৭’র জানুয়ারীতে করা ২১৭ রানের ইনিংসটি টেস্টে যেকোন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত সংগ্রহ ছিল, ক’দিন আগেই মুশফিক ভেঙেছেন সেই রেকর্ড। বোলিং এ বাংলাদেশের হয়ে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেট মিলিয়ে সর্বাধিক উইকেটের মালিক পঁচাত্তর নম্বর জার্সিধারীর। শুধু ওয়ানডেতেই উইকেটের অংকে মাশরাফির চেয়ে সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে আছেন তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসেই সবগুলো ফরম্যাট মিলিয়ে কমপক্ষে নয় হাজার রান এবং চারশো উইকেটের মালিক হওয়া ষষ্ঠ খেলোয়াড় সাকিব। টেস্টে বাঁহাতি স্পিনারদের মধ্যে সর্বকালের পঞ্চম সর্বোচ্চ উইকেটের মালিকও তিনি। খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একই টেস্টে সেঞ্চুরীর পাশাপাশি দশ উইকেট নেয়ার কীর্তি গড়েছেন, নাম লিখিয়েছেন ইয়ান বোথাম আর ইমরান খানের পাশে। টেস্ট খেলুড়ে সবগুলো দেশের বিরুদ্ধে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব আছে তার। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের খেতাবটাকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছেন সেই কবে থেকে, মাঝেসাঝে তাতে হানা দিয়েছেন ওয়াটসন, কখনও বা ম্যাথুস-অশ্বিন-ম্যাক্সওয়েল-হাফিজরা; তবে রাজার মতোই আবার সেটা দখল করেছেন। 

সামনে থেকে নেতৃত্ব

২০০৯-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কিংসটাউনে বাইশ গজে হোঁচট খেলেন মাশরাফি, হাঁটুর ইনজুরিতে ছিটকে পড়লেন দল থেকে। ডেপুটি সাকিবের মাথায় আচমকা অধিনায়কত্বের চাপ! সেই চাপকে অবলীলায় জয় করে খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশ, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সিরিজসেরা হলেন বাংলাদেশী অলরাউন্ডার। অধিনায়ক সাকিব আসলে কতটা কার্যকর? উনপঞ্চাশটি ওয়ানডে ম্যাচে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দল জয়ের হাসি হেসেছে তেইশবার। শতকরার হিসেবে সাকিবের চেয়ে সফল শুধু মাশরাফি, সংখ্যার বিচারে এরচেয়ে বেশী জয় পেয়েছেন মাশরাফি আর হাবিবুল বাশার।

অধিনায়ক সাকিব দারুণ আক্রমণাত্মক, ফিল্ড প্লেসিং বলুন কিংবা বোলার সাজানো- সবকিছুতেই দারুণ সিদ্ধহস্ত। তাঁর কাছে খেলাটা আক্রমনের আরেক নাম। সাকিবের নেতৃত্বেই নিউজিল্যান্ডকে বাংলাওয়াশ করেছিলো টাইগারেরা, বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ও তাঁর অধিনায়কত্বে। ২০১১ বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের জার্সি গায়ে টস করতে গিয়েছিলেন সাকিবই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রামে এসেছিলো রূপকথার জয়। এখনও বাংলাদেশের টেস্ট এবং টি-২০ দলের নেতৃত্বের ভার তার কাঁধে, ওয়ানডেতে মাশরাফির ডেপুটিও তিনি। অধিনায়ক সাকিব কতটা আক্রমণাত্নক হতে পারেন, সেটা সবাই দেখেছে কলম্বোতে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে দলকে নিয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। অধিনায়ক সাকিবের কাছে দলের স্বার্থের চেয়ে বড় আর কোনকিছুই নেই। 

মিরপুরের কান্না 

এক বলে চার রান দরকার ছিলো জয়ের জন্যে, আইজাজ চিমার শেষ বলটিতে শাহাদাত হোসেন নিতে পারলেন এক রান। প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠেও দুই রানের আক্ষেপ সঙ্গী টাইগারদের। গ্যালারীতে তখন পিনপতন নীরবতা, সাগরের ফেনীল ঢেউ আছড়ে পড়ছে সমর্থকদের চোখেমুখে। কাদছেন বিজয়, মুশফিক, নাসির। ড্রেসিং রুম থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন পঁচাত্তর নম্বর জার্সিধারী। মুশফিকের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাংলাদেশ অধিনায়কের চোখে তখন বান ডেকেছে, তাঁর আশ্রয় হলো সাকিবের বুকে। ষোলকোটি মানুষের বত্রিশ কোটি চোখ অবাক বিস্ময়ে দেখলো, আবেগহীন বলে সবাই যে ছেলেটাকে জানে, সেই সাকিব আল হাসানের চোখ চিকচিক করছে! অশ্রুজলে হারের ক্ষত ধুয়ে দেয়ার খানিকটা চেষ্টা হয়তো। সেই অশ্রুর বিন্দুগুলোর মূল্য জানে কেউ? কোটি টাকার হীরের বিনিময়েও তো পাওয়া যায় না মুক্তোর মুতো চিকচিক করা সে চোখের জল! মিডিয়া থেকে শুরু করে কোচ কিংবা বোর্ড প্রেসিডেন্ট- সাকিবকে কটু কথা শুনতে হয়নি কার মুখ থেকে? নিশ্চুপ থেকেছেন “বেয়াদব” খেতাব পাওয়া ছেলেটা; রাগ, ক্ষোভ যা ছিল, মাঠে ঢেলে দিয়েছেন; পুড়েছে প্রতিপক্ষ। সাকিব তো এমনই।

বিশ্বসেরা এবং সর্বকালের সেরা 

সাকিব আল হাসান সময়ের অলরাউন্ডার। কিন্ত সর্বকালের সেরা হবার সুযোগ কি তাঁর আছে? সাকিবের প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ ছিল না কোনকালেই, এখনও নেই। খানিকটা খামখেয়ালি না হলে টেস্টে ক্যারিয়ার গড়টা পঞ্চাশের আশেপাশে থাকতো, সেঞ্চুরীর সংখ্যাও দুই অঙ্কে পৌঁছে যেতো- এটা চোখ বন্ধ করেও বলা যায়। ওয়ানডেতে বরং সাকিব বেশী উজ্জ্বল, তারপরেও তাঁর সামর্থ্যের সবটা যেন বলছে না তাঁর রান কিংবা উইকেটসংখ্যা। ওয়ানডে গড়টা চল্লিশ হলেই মানানসই হতো। ব্যাট হাতে সাকিব অনেকটাই অননুমেয়, দলকে বিপদের মুখে ফেলে এসেছেন বেশ ক’বার, চাপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া যে সাকিবের স্বভাব, তিনিই হঠাৎ হার মেনে বসেন দলের চাহিদার কাছে!

সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের ছোট্ট তালিকাটাতেও হয়তো ক্যারিয়ার শেষে তাঁর নামটা জ্বলজ্বল করবে, কিন্ত সর্বকালের সেরা বললেই যে দুটো নাম সবার আগে আসে, সেই জ্যাক ক্যালিস বা স্যার গারফিল্ড সোবার্সকে ছাপিয়ে যাওয়া কি সাকিবের পক্ষে সম্ভব? প্রায় পঁচিশ হাজার রান আর ছয়শোর কাছাকাছি উইকেটের মালিক জ্যাক ক্যালিস, রানের বিচারে তাঁকে ছোঁয়া হয়তো সম্ভব না’ও হতে পারে। কিন্ত উইকেটে তো ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব। আরও বছর সাত-আটেক বড় কোন ইনজুরি ছাড়া খেলে যাওয়া সাকিবের পক্ষে খুবই সম্ভব; তাহলে সর্বকালের সেরা হওয়া অসম্ভব হবে কেন? তবে এখনকার সাকিব অনেক বেশী আত্মপ্রত্যয়ী, ব্যাট হাতে অসম্ভব দায়িত্বশীল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই হেরে যাওয়া ম্যাচটার কথাই ধরুন না, বিশ রানে চার উইকেট যাওয়ার পরে কে ভেবেছিল রিয়াদকে সঙ্গে নিয়ে ম্যাচটা বের করে আনবেন সাকিব? 

এই বসন্তে অনেক বছর আগে 

ঠিক বত্রিশ বছর আগে, মাগুরায় বসন্তের বাতাস গায়ে মেখে পৃথিবীর আলোয় এসেছিলেন ফয়সাল নামের ছেলেটা; আজ যিনি আমাদের সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের জান, বাংলাদেশের প্রাণ, কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ের স্পন্দন। একটা জাতি ক্রিকেট নামের খেলাটায় আশায় বুক বাঁধে তাঁর নামে, জয়ের স্বপ্ন দেখে তাঁর চোখে। মেঘে মেঘে বেলা কম হয়নি, খেলাটায় পার করে দিয়েছেন জীবনের অনেকটা সময়, অর্ধেক আয়ুকাল তো দেশের প্রতিনিধিত্বই করছেন। অলরাউন্ডার সম্ভবত তিন রকমের হয়, গড়পড়তা, খুব ভালো, আর সাকিব আল হাসান; নিজের সীমাটা তিনি নিজেই তৈরী করছেন।

সাকিবকে নিয়ে লিখতে যাওয়াটা বালখিল্যতা, ফেরদৌসীর শাহনামার চেয়েও বেশী দীর্ঘ হয়ে যাবে “সাকিবনামা”। টি-২০’র ফেরিওয়ালা হয়ে খেলে বেড়াচ্ছেন পৃথিবীজুড়ে, প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে নাম লিখিয়েছেন কাউন্টি ক্রিকেটে, বিগ ব্যাশে। তাঁকে ছাড়া তো আইপিএলের কলকাতা নাইট রাইডার্স দলটাই পঙ্গু। যদিও এবার নাম লিখিয়েছেন সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদে। মারদাঙ্গা ক্রিকেটের এই জোয়ারেও আশ্চর্য্য মিতব্যায়ী বোলিং ফিগার তাঁর। ধারাবাহিকতার প্রতিশব্দ জানতে চান? পড়ুন- সাকিব আল হাসান। এই সাকিবের ব্যাটে অজস্রবার হেসেছে দল, বল হাতে আনন্দে ভাসিয়েছেন দেশকে। চোখের কোণে জমতে থাকা আনন্দ অশ্রুর কারণ হয়েছেন কতবার, গুনে শেষ করা যাবে না! জন্মদিনের শুভকামনা বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। এভাবেই খেলতে থাকুন, আমাদের চোখে আবার জল জমুক আপনার কারণে, আনন্দে আবার কাঁদতে চাই আমরা, বারবার কাঁদতে চাই!

অসাধারণ ছবিগুলোর জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা- ফারহান আনজুম ধ্রুব

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button