মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

রেখেছো বাঙালি করে, ‘মানুষ’ করোনি!

আমরা প্রায়ই কথাচ্ছলে বলে ফেলি, দেশটা অমানুষে ভরে গেছে। কথাটা যে তিক্ত হলেও সত্যি, সেটা প্রমাণ করে দিলো গতকাল শাহনাজ আপার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা। সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের পরিবারের জন্যে লড়তে থাকা একজন নারীর আয়ের একমাত্র অবলম্বনটা ছিনিয়ে নিতে আমাদের বুক একটুও কাঁপে না, আমাদের একটুও খারাপ লাগে না। অ্যাপভিত্তিক রাইড উবারে স্কুটি চালিয়ে দুই সন্তান আর মায়ের খরচ যোগাতেন শাহনাজ আক্তার। ‘চালাতেন’ বলতে হচ্ছে এই কারণে, গতকাল একটা অমানুষ বদমাশ তার একমাত্র সম্বল স্কুটিটা চুরি করে নিয়ে গেছে। দুইদিন আগেও যে মানুষটার হাসিমুখের ছবি পত্রিকায় এসেছিল, গতকাল রাতে দেখতে হয়েছে তার অশ্রুসজল চেহারাটা!

হেফাজতের আমির যেদিন মেয়েদের ক্লাস ফোর-ফাইভের বেশি পড়তে না দেয়ার কথা বললেন, সেদিনই সেদিনই শাহনাজ আপার জীবন সংগ্রামের সত্যিকারের এই গল্পটা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। রাফিউজ্জামান নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছিলেন- “উবারে কল দিলাম, ওপাশে রাইডার ফোন ধরে প্রথমেই বললেন, ভাইয়া আমি মহিলা ড্রাইভার, আমার বাইকে চড়তে আপনার আপত্তি নাই তো? আপত্তি নেই শুনে শাহনাজ বলেন, আমি আসছি ভাইয়া…”

শাহনাজের জীবন সংগ্রামের অনেকটুকুই উঠে এসেছিল সেই লেখায়। এরপরে বেশ কয়েকটা পত্র-পত্রিকা তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে, আমরা বিস্তারিত জানতে পেরেছি তার সম্পর্কে। মানুষটা খুব বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি, বাড়িতে বাবা নেই, আছেন মা আর বোনেরা। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন একজনকে, কিন্ত দাম্পত্যজীবনে সুখের দেখা মেলেনি। এটা নিয়ে অবশ্য কথাও বলতে চাননি তিনি।

দুটো কন্যাসন্তানের মা তিনি, বড় মেয়ে পড়ে ক্লাস নাইনে। সংসারের সবটুকু ভার তার কাঁধে, তাই আর কোন উপায় না পেয়ে ব্যাংক লোন দিয়ে কেনা স্কুটিটা নিয়ে নেমে পড়েছিলেন রাস্তায়। এই স্কুটিটা তিনি কিনেছিলেন স্বামীর জন্য, কিন্ত তার স্বামী বাইক চালিয়ে টাকা আয় করতে রাজী হননি। তাই শাহনাজ নিজেই স্কুটি চালানো শিখে নিয়েছেন, নিজের আর দুই সন্তানের পেট তো চালাতে হবে! ঘরভাড়া, দুই মেয়ের পড়াশোনা- সব মিলিয়ে মাসে প্রায় বিশ হাজার টাকার মতো খরচ, সেই টাকাটা মোটামুটি উঠে আসতো উবার আর ওভাই অ্যাপে বাইক চালিয়ে।

সমাজের ভ্রুকুটিকে পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজটা করে যাচ্ছিলেন শাহনাজ, হিয়ে উঠেছিলেন পিছিয়ে থাকা শত-সহস্র নারীর অনুপ্রেরণা। শাহনাজের গল্পটা ফেসবুকে ভাইরাল হবার পরে হাজার হাজার মানুষ তাকে চিনেছে, তার সাহসের প্রশংসা করেছে। আবার একইসঙ্গে তাকে টার্গেটও বানিয়েছে প্রতারক চক্র। গতকাল তো স্বার্থসিদ্ধি করেই ফেললো তারা, মানুষের প্রতি শাহনাজের বিশ্বাসকে ঢাল বানিয়ে তার স্কুটিটা নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল তাদেরই একজন।

ফেসবুকে ভাইরাল হবার পরে জনি নামের এক লোকের সঙ্গে পরিচয় হয় শাহনাজের, সেই লোক শাহনাজকে একটা স্থায়ী চাকরীর ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলে ডেকে আনে ফার্মগেটের খামারবাড়িতে। সেখান থেকে অফিসের কাজের কথা বলে শাহনাজের সেই স্কুটির পেছনে চড়ে বিমানবন্দরে যায় জনি, সেখান থেকে আবার খামারবাড়িতেও ফিরে আসে। তারপর কৌশলে স্কুটিটা কিভাবে চালায় দেখার কথা বলে ড্রাইভিং সিটে চড়ে বসে, তারপর হঠাৎই জোরে টান দিয়ে বাইক নিয়ে হাওয়া হয়ে যায় সেই প্রতারক। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ভ হয়ে পড়েছিলেন শাহনাজ, কিন্ত বাইকের পেছনে পাগলের মতো দৌড়েও আর কোন লাভ হয়নি।

হ্যাঁ, শাহনাজ ভুল করেছিলেন, স্বল্পপরিচিত একটা মানুষকে বিশ্বাস করাটা তার উচিত হয়নি। কিন্ত তার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যে প্রতারণাটা তার সঙ্গে করা হলো, সেটার শাস্তি কি হওয়া উচিত? তাকে টার্গেট করে, প্ল্যানমাফিক তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে স্কুটিটা। এটা যে তার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র রাস্তা ছিল, এটা প্রতারকের অজানা ছিল না। একদিন বাইক না চালালে যে দুই মেয়ে আর মা-কে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে শাহনাজের, সেটাও জানতো প্রতারকেরা। তবুও কেন জীবনযুদ্ধের মাঠে লড়াকু এই নারীর প্রতি তাদের এত প্রতিহিংসা?

শাহনাজ আপার কান্নামাখা চেহারাটা ভুলতে পারছি না কোনভাবেই। একমাত্র অবলম্বনটা হারিয়ে সেই মূহুর্তে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। ঢাল-তলোয়ার বলতে ওই একটা স্কুটিই তো ছিল তার সম্বল, সেটাই কেড়ে নিলো প্রতারকেরা! চোখের সামনে অন্ধকার ছাড়া তখন আর কিছুই হয়তো চোখে পড়ছিল না তার। বাইকের লোনের টাকা এখনও শোধ হয়নি, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, সংসারটা ভেসে যাবে, এসব দুর্ভাবনা হয়তো জায়গা করে নিয়েছিল মনের ভেতরে। এদেশের লক্ষ লক্ষ নারী যখন স্বামীর মার খেয়ে সমাজের চাপে মুখ বুজে চুপচাপ নিজেদের স্বকীয়তা আর স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েছেন, তখন তাদের মধ্যে উজ্জ্বল এক ব্যাতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছিলেন শাহনাজ, তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, একজন নারী চাইলেই বিশ্বজয় করতে পারে!

শাহনাজ তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চাইলে তিনি পাঁচ মিনিটেই হাজার টাকা রোজগার করতে পারতেন, কিন্ত সেই রাস্তায় হাঁটার কোন ইচ্ছে তার হয়নি। নিজের পরিশ্রমে টাকা আয় করতে চেয়েছেন তিনি। উবারে বাইক চালানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছিলেন, যাত্রীরা ভদ্র হওয়ায় এখনও পর্যন্ত কোন বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি তাকে। সেই মানুষটাকে এমন একটা দুঃস্বপ্নের মূহুর্ত উপহার দেয়া প্রতারকগুলোর প্রত্যেকের প্রতিটা লোমকূপের ভেতরে একটা করে সুঁই ঢুকিয়ে দিতে ইচ্ছে করে আমার, যাতে সেটা দেখে কেউ আর কখনও একজন নারীর অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়ার দুঃসাহস করতে না পারে।

শাহনাজের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনেকে, তাকে হয়তো নতুন বাইক কিনে দেয়া হবে শীঘ্রই, একটা স্থায়ী চাকুরীর ব্যবস্থাও হয়ে যাবে তার। তবে এসবের ডামাডোলে এই প্রতারকগুলোর কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। এদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যে কোন মূল্যে। এই অমানুষ জানোয়ারগুলো শুধু একটা বাইক ছিনতাই করেনি, তারা একজন স্বাধীনচেতা নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চেয়েছে, একজন মায়ের চোখে জল এনে দিয়েছে। সেই অপরাধের শাস্তি এদের দিতেই হবে…

আপডেট: শাহনাজের বাইকটা নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, ছিনতাইকারীকেও আটক করেছে পুলিশ।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button