ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

এক টুকরো জমি কি এই দুই সূর্যসন্তানের সম্মানের চেয়ে বেশি দামী?

তারা দুজনেই ছিলেন অমিত প্রতিভাবান। একজন ছিলেন লেখক-সাংবাদিক, অন্যজন তো সব্যসাচী- একাধারে সাংবাদিক, লেখক, পরিচালক, সবকিছুই। সম্পর্কে তারা দুজন ছিলেন আপন ভাই। মৃত্যুতেও একসঙ্গে জড়িয়ে আছেন দুজন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে পাকিস্তানীরা যখন বেছে বেছে জাতির সূর্যসন্তানদের হত্যা করছিল, তাদের কোপটা পড়েছিল শহীদুল্লাহ কায়সারের ওপরও। আর স্বাধীন বাংলাদেশে জহির রায়হান নিখোঁজ হয়েছিলেন বড়ভাইকে খুঁজতে গিয়ে, পরে জানা গিয়েছিল, মিরপুরের বিহারী পল্লিতে শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধানে গিয়ে স্থানীয় বিহারী এবং আটকে পড়া পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান।

সাতচল্লিশ বছর পর শহীদুল্লাহ কায়সার এবং জহির রায়হান আবারও আলোচনায়, কিন্ত খবরের শিরোনাম হবার কারণটা জানলে মন তিক্ততায় ভরে উঠতে বাধ্য। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, মেয়ে অভিনেত্রী শমী কায়সার ও ছেলে অমিতাভ কায়সারের বিরুদ্ধে তার ছোট ভাই জহির রায়হানের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে, আর এই অভিযোগটা এসেছে শহীদ জহির রায়হানের পরিবারের পক্ষ থেকেই।

জহির রায়হানের নাতনী ভাষা রায়হান ফেইসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে অভিযোগ করেছেন, গুলশানের বারিধারার এক বিঘা জমি এবং গুলশান আড়ংয়ের পেছনের তিন বিঘা জমি তার দাদার টাকায় কেনা হলেও সেই সম্পত্তিগুলো পান্না কায়সার, শমী কায়সার ও অমিতাভ কায়সার দখল করে রেখেছেন। ভাষা রায়হান লিখেছেন- “আমার দাদার (জহির রায়হান) ভাইয়েরা এবং বোনেরা তাদের অনেকবার বলেছেন আমাদের সম্পত্তি আমাদেরকে বুঝিয়ে দিতে। কিন্তু তারা সব সময় বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।” ভাষার বাবা বিপুল রায়হানও নিজের ফেসবুক একাউন্ট থেকে দেয়া আরেক স্ট্যাটাসে একই দাবী করেছেন।

শহীদুল্লাহ কায়সারকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বরে। ভাইকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হান মিরপুরে নিখোঁজ হয়েছিলেন বাহাত্তরের ৩০শে জানুয়ারী। এতদিন পর কেন এই অভিযোগ এলো, এমন প্রশ্নের জবাবে ভাষা বলেছেন- “দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়টি আমরা পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা এড়িয়ে গেছেন। ফলে বাধ্য হয়ে আমরা অভিযোগ তুলেছি।”

শমি কায়সার এবং তার মা পান্না কায়সার

এই অভিযোগ বিডিনিউজ ২৪ ডটকমে প্রকাশিত হবার পর বোন শমি কায়সার এবং মা পান্না কায়সারের পক্ষে শমির ভাই অমিতাভ কায়সার একটা বিবৃতি দিয়েছেন, তিনি দাবী করেছেন, জহির রায়হানের পরিবার এখন সম্পত্তি দখলের অভিযোগ করছেন শহীদুল্লাহ কায়সারের পরিবারকে ‘ছোটো করার জন্য’। অমিতাভের বক্তব্য হচ্ছে, বারিধারার এক বিঘা এবং গুলশানের তিন বিঘার যে জমি নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেই সম্পত্তির মালিক ছিলেন তার বাবা।

তবে অমিতাভের এই দাবী হালে পানি পাচ্ছে না। বিপুল রায়হান জহির রায়হানের প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর ছেলে। জহির রায়হানের দ্বিতীয় স্ত্রী অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দার তরফ থেকেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি দাবী করেছেন, জহির রায়হানের টাকায় গুলশানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বাসার পাশের এক বিঘা এবং গুলশানের আড়ংয়ের পেছনের জমি কেনা হয়।

“আমি নিজের চোখে দেখেছি, জহির রায়হানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গুলশানের অ্যাম্বাসেডরের বাড়ির পাশের জমিটা শহীদুল্লাহ কায়সারের নামে কেনা হয়েছে। আর আড়ংয়ের পেছনের জমিটা নিলামে কেনা হয়েছিল সাংবাদিক আব্দুল বাতেনের নামে। জমিটা পরে জহির রায়হানের নামে ট্রান্সফার করার কথা থাকলেও তিনি মারা যাওয়ার পর শহীদুল্লাহ কায়সারের পরিবারের সদস্যরা জমিটা বিক্রি করে দেন।”

শহীদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের চাচাত ভাই ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের লেখা এক কলামেও বড়ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নামে গুলশানে জহির রায়হানের টাকায় জমি কেনার তথ্য উঠে এসেছিল। আট ভাই-বোনের একান্নবর্তী পরিবারের দায়িত্বে ছিলেন জহির রায়হান; তার টাকায় সংসার চলেছিল বলে জানান শহীদুল্লাহ কায়সার এবং জহির রায়হানের ছোটবোন শাহেনশাহ বেগম। তিনি বলছিলেন-

“জহির রায়হানের হাতের অবস্থাও শুরুতে ভালো ছিল না। পরে সঙ্গম ও বাহানা চলচ্চিত্র থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে নিজের টাকায় ঢাকায় বেশ কিছু জমি কিনেছিলেন। আট ভাই-বোনকে বাদ দিয়ে জমিগুলো একাই পান্না ভাবি (শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী) নিলেন।

শহীদুল্লাহ কায়সার এবং পান্না কায়সার

ব্যাপারটা খুব নোংরা। আমরা অনেক বোঝানোর পরও উনি কেন বুঝলেন না, সেটা বলতে পারছি না। পান্না ভাবি ইচ্ছা করলে বিষয়টির সমাধান করতে পারতেন। শান্তি পাওয়ার জন্য এত অর্থ দরকার পড়ে না। বিষয়গুলো নিয়ে ছলচাতুরি না করলেও পারতেন। জহির রায়হান থাকলে এই রকম কোনোভাবেই হত না।”

এদিকে, জহির রায়হানের ছোটভাই মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ জানান, জহির রায়হানের নামে কেনা জমিগুলো মুক্তিযুদ্ধের পর শহীদুল্লাহ কায়সারে দুই সন্তান শমী কায়সার ও অমিতাভ কায়সারের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। তিনি বলেন, “জহির রায়হানের টাকায় কেনা জমিগুলো চার ভাইয়ের নামে রেজিস্ট্রি করানোর জন্য আমি দৌড়াদৌড়ি করেছি। শমীর মায়ের কাছ থেকে টাকা খেয়ে আব্দুল বাতেন জমিগুলো শমী-অমির নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে।”

আবার আসা যাক শহীদুল্লাহ কায়সারের পরিবারে, শমী কায়সার এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তিনি বলেছেন- “এটা একেবারেই মিথ্যা অভিযোগ। এটা বাবা-চাচাদের বিষয়। উনারা বলছেন, বলুক। আমাকে এটি নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। এটা নিয়ে আমরা কথা বলতে চাচ্ছি না।” আর অমিতাভ কায়সার দাবী করেছেন, একাত্তরের জুন মাসে এই জমি নাকি শহীদুল্লাহ কায়সার নিজের টাকায় কিনেছিলেন।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠবেই, উত্তাল একাত্তরে শহীদুল্লাহ কায়সারের মতো মানুষ, যিনি বাঙালীর জন্যে কলম ধরে পাকিস্তানীদের জন্যে হুমকি হয়ে উঠেছিলেন, তিনি কেন জমি কেনাবেচার মতো ব্যাপারে জড়াবেন? এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? আর কেনই বা শহীদুল্লাহ কায়সার এবং জহির রায়হানের ভাইবোনেরা সবাই একই সুরে কথা বলছেন? সবাই কেন শমি কায়সার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যে অভিযোগ’ তুলবেন? ১৯৭১ সালে ঢাকা শহরে যেসব জমি ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে, মালিকের নামসহ সেসবের তালিকা নিশ্চয়ই ভূমি রেসিস্ট্রি অফিসে পাওয়া যাবে। সেটা দেখলেই তো প্রমাণ হয়ে যাবে, কে সত্যি বলছেন আর কে মিথ্যা বলছেন।

শহীদুল্লাহ কায়সার এবং জহির রায়হান, দুজনেই আমাদের সূর্যসন্তান। এখনও আমরা আফসোস করি, জহির রায়হান বেঁচে থাকলে আমাদের চলচ্চিত্র কতটা এগিয়ে যেতে পারতো সেটা ভেবে। শহীদুল্লাহ কায়সারকে মেরে ফেলা না হলে সংশপ্তকের মতো আরও দারুণ উপন্যাস আমরা পেতে পারতাম। এই মানুষগুলোকে আমরা সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে জায়গা দিয়েছি, আপনারা দয়া করে তাদের নামগুলো এসব বিতর্কে জড়াবেন না। ঢাকা শহরের একটুকরো জমির চেয়ে একজন শহীদুল্লাহ কায়সার বা জহির রায়হানের নামের ওজন, তাদের সম্মানটা অনেক বেশি জরুরী, এটা নিশ্চয়ই তাদের পরিবারের সদস্যেরা বুঝবেন…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button