মনের অন্দরমহল

এ জার্নি ফ্রম শাহবাগ টু ডালাস

এক সপ্তাহ আগে ডালাসের এয়ারপোর্টে মিছিল করছিলাম। একটু পরপর বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছি সবাই মিলে; অযাচিত হয়রানি হচ্ছিলো বিভিন্ন বিমানবন্দরে, কমলারাজার এক উটকো আইনের কারণে, ডালাসেই অযথা অনেকেই আটকে ছিলো, তাদের সবাইকে মুক্ত করতে আমাদের এই সমবেত হওয়া।

সেখানে একটি মেয়ে, আমার পাশেই দাঁড়ানো ছিলো;- আমি সোশ্যাল মিডিয়াতে ক্রমাগত আপডেট দিচ্ছিলাম বলে নিজেই আমাকে খুঁজে বের করেছে। আমি পরে জেনেছি, এই কদিনে, যে ও ছোট শহরের মেয়ে, বাইরের পৃথিবী তেমন কিছু ওর দেখা হয়নি; এই অবিবেচক আইনের কারণে ছুটে এসেছে, এখন প্রবল উৎসাহের সাথে স্লোগানে কণ্ঠ তুলছে। সে হঠাৎ স্লোগানের মাঝখানে আমাকে প্রশ্ন করলো, তুমি ঈজিপ্টের খবরাখবর কিছু জানো? আমি ভাবলাম কানে ভুল শুনেছি বোধহয়, এই ডালাসে ঈজিপ্ট আসছে কোন কারণে? যে ৭টি দেশ ব্যান করা হয়েছে, তার মধ্যে তো ঈজিপ্ট পড়ে না!

সে আমাকে তার সরল আনন্দে বলতে থাকলো, ঈজিপ্টের গণমানুষের অভ্যুথানের কথা আমি পেপারে পড়েছিলাম, এখন আমি নিজেও এমন কিছুতে থাকতে পেরে মুগ্ধ! কখনো ভাবিনি আমি নিজেও কখনো এমন কোন গণজাগরণের অংশ হবো!

আমি মনে মনে হাসলাম; একবার ইচ্ছে হলো বলি, কিন্তু তারপর ভাবলাম, এতো আওয়াজে ঠিকমতো কোন আলাপন হবে না, তারচাইতে বাদ’ই থাক। কিন্তু আমি মনে মনে ঠিকই ভাবলাম, আমাদের শাহবাগের কথা। পারলে তাকে বলতাম, আমার কি ঈজিপ্ট লাগে? আমি তো বাংলাদেশের মেয়ে!

#

২০১৩-তেও আমি ডালাসেই থাকি। এখন ফেসবুকের সুবাদে কিছু মানুষ আমাকে চেনে, আমিও কাউকে কাউকে চিনি, কিন্তু তখন পরিচিত গণ্ডির বাইরে কোন জানাশোনা ছিলো না। বরং, এক/দুই বছর আগে, কিছু ব্যক্তিগত মনখারাপের সুবাদে মনে হয়েছিলো, আমি বাংলাদেশের কেউ নই, বাংলাদেশ’ও আমার কেউ নয়, আমি দূরে দূরেই বেশ আছি আর থাকবো। (তার আগ পর্যন্ত মনে হতো, একদিন – কোন একদিন- শেষমেশ বাংলাদেশেই ফিরবো)। তখনো পুরোপুরি আমেরিকান হতে পারিনি, তাই নো ম্যান্স ল্যান্ডের মতো কোন গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে আছি।

অমন সময় জন্ম নিলো ‘শাহবাগ’। আমার মতো কৈশোরে দেশ ছাড়া প্রবাসীর কাছে শাহবাগ কোন ভৌগোলিক স্থান নয়, শাহবাগ কেবলই ২০১৩’র শাহবাগ – গণমানুষের জাগরণেরই নাম। দেশ থেকে দূরে থাকতে পারি, কিছু অভিমানও ধরে রাখতে পারি, কিন্তু দেশ আমার ভেতরে তবুও কোথাও জাপটে বসে থাকে। আমি যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পর্কে পড়ি, বিচারের রায় শুনি, আর হঠাৎ শুনি – কত শত মানুষ সব জমাট হয়েছে শাহবাগে!

২০১৩ সালেই আমি প্রথম টের পেলাম, সব মানুষ রাজাকারের কথা জানে না। কেউ কেউ সত্যিই মনে করে এরা নিষ্পাপ! তার আগ পর্যন্ত আমি ভাবতাম, অপরাধীদের কথা সবাই জানে, কেউ কেউ স্বার্থসিদ্ধির সুবাদে বুঝি মিথ্যে কথা বলে, কিন্তু সবাই জানে ঠিকই! – কিন্তু না, আমি নাহয় বড় হয়েছি জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি”তে, নাহয় আমাদের বাসায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প হতো, – সবাই কি এতটা ভাগ্যবান? আমি দেখতে থাকলাম, কতজনই জানে না! ফেসবুকেই মানুষের কতরকম কথা; – আমি একজনের এমন একটা লেখা পড়লাম, (আমি তাকে চিনিনা, একজনের কমেন্টের সুবাদে নিউজফিডে ভেসে উঠেছিলো তার লেখাটি), যে কাদের মোল্লা একজন নূরানী ভদ্রলোক, যে ধর্মের আহ্বান দিতেন, আর সেই অপরাধেই তার পেছনে সরকার এখন উঠে পড়ে লেগেছে – আহা! আর এই মেয়েটি একদম মন থেকে বলছে কথাগুলো, মন খারাপ করে এই ‘অন্যায়ের’ বিলাপ গাইছে, সে যে নিকৃষ্ট যুদ্ধাপরাধী, সেটি তার মস্তিষ্ক কিছুতেই মানছে না!

আমার মনে আছে সে দিনগুলোর কথা। এই ডালাসেও একটি প্রতীকী শাহবাগ হলো; – আমি আয়োজক ছিলাম না, কিন্তু ধরেবেঁধে আমার বান্ধবীদের বলেছিলাম, চলো, চলো, যাই! এদের অনেকেই এদেশেই অনেক ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া; আমার মতো ‘বাংলাদেশী’ না ওরা, কিন্তু, আমার মনে আছে, ২০১৩’এ বসে আমি ওদেরকে ১৯৭১-এর গল্প শুনিয়েছিলাম। এই অদ্ভুত সৌভাগ্য কতজনার হয়? বিদেশের মাটিতে, দেশি বংশোদ্ভূত বিদেশিদের কাছে? – আমার মনে আছে, আমি কাগজ, মার্কার কিনে কিছু স্লোগান লিখেছিলাম; বান্ধবীর বাসার লিভিং রুমের কার্পেটে হাত পা ছড়িয়ে বসে সমানে লিখে চলেছিলাম। আমার মনে আছে আমার উৎসাহে প্রথমদিকে কারো কারো উৎসাহ ছিলো, কিন্তু শেষ মুহূর্তে দুজন সরে গিয়েছিলো, কারণ – ‘কি হবে গিয়ে’?

আমার মনে আছে সেই একই লিভিং রুমে, ঐ সময়েই কোন একদিন, ‘আড্ডা’ জমেছিলো। আমি একজন, আরেকজন এই দেশে জন্ম, অন্যজন আমার পরে এখানে এসেছে। এদেশে জন্মানো মেয়েটি বেশিক্ষণ অংশ নিতে পারেনি আড্ডায়, অনেক কিছুই তার জানা নেই, কিন্তু সে সমস্তটা শুনতে শুনতে বোঝার চেষ্টা করছে। অন্য ছেলেটি আমাকে বলছিলো, আপু, ফেসবুকে অমুককে চেনেন? তমুক কে ফলো করেন? সে কি! তাদের কথা জানেন না?? কোথায় আছেন আপনি? শাহবাগের দ্রুততম খবরগুলো পেতে চাইলে অমুক অমুকের প্রোফাইলে যান, অমুক অমুক পেইজগুলো ফলো করেন!

মজার ব্যাপার, সেই মানুষগুলোর কেউ কেউ এখন আমাকেও চেনে। কেউ কেউ বন্ধু, কেউ কেউ পরিচিত, কেউ কেউ আবার আমার লেখা পড়েন। – ২০১৩’র শাহবাগ আমাকে শুধু নিকৃষ্টতম পাশবিক হায়নাদের ফাঁসি এনে দেয়নি, আমাকে দেশের প্রতি প্রগাঢ় মমতা বুকে লালন করে রাখা এইসব মানুষগুলোকেও দিয়েছিলো। কিন্তু সেই বছরে আমার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার? আমাকে শাহবাগ আমার বাংলাদেশকে ফিরিয়ে এনে দিয়েছিলো। আমার অভিমানকে মুছে দিয়েছিলো; আর আমি যখন বলতে থাকলাম বান্ধবীদের কাছে, আর আস্তে আস্তে লিখতে শুরু করলাম বন্ধুমহলের বাইরেরও মানুষদের কাছে পৌঁছুবার লক্ষ্যে, আমাকে শাহবাগ তখন মনে করিয়ে দিয়েছিলো, আমি যদি আজীবন দূরেও থাকি, তবুও বাংলাদেশে আমারও স্থান আছে, আমার মতো মানুষগুলোর জন্যে আছে!

#

আজকে যখন আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে যাই, ডালাসের বিমানবন্দরে দাঁড়াই, যখন অলিগলিতে মিছিলের অংশীদার হই, আমার সাথে থাকে শাহবাগ। এদেশেও জানেন, মানুষ জিজ্ঞেস করে, “কত টাকা পাচ্ছো এইসব করে? কোন কি কাজ নেই? কি হবে এইসব করে?” বাকি আমেরিকানরা ক্ষেপে, আর আমি হাসি; – সব দেশেই বোধহয় সমালোচনাকারীরা ঠিক একই ভাষায় কথা বলে!

আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি; ৯০তে এতো বেশি ছোট ছিলাম যে আমার মাথায় কিছু ঢোকেনি; আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে মানুষকে পথে নামতে দেখাটাও বাংলাদেশে বসে দেখিনি – আমি দেখেছি শুধু ফেসবুকে।

কিন্তু আমিও পেয়েছি কিছু, কে বলেছে পাইনি? আমার তাই ডালাসের মিছিলে ঈজিপ্টকে খোঁজা লাগে না; – আমার অনুপ্রেরণার জন্য আছে “শাহবাগ”।

এই সৌভাগ্যটাই বলুন, বিশ্বব্যাপি, ঠিক কতমানুষের হয়?
পরম কৃতজ্ঞ আমি তাই! 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button