এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

ট্রাভেলিং থেকে আমি যে ৭টি অসাধারণ শিক্ষা পেয়েছি!

জয় শেঠিকে আপনি হয়ত চিনে থাকবেন, যদি ফেসবুকে কিংবা ইউটিউবে অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও দেখবার অভ্যাস থাকে। বয়সে তরুণ হলেও এই মানুষটির জ্ঞানের গভীরতা দারুণ। এই বয়সেই তিনি ফোর্বসের ত্রিশ বছরের নিচে ত্রিশজন গেম চেঞ্জারের একজন হয়েছিলেন ২০১৭ সালে। হাফিংটন পোষ্টে জয়ের শো লাখ লাখ মানুষ দেখে। তিনি ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট, ন্যাশনাল জিওগ্রাফির মতো মিডিয়ার সাথে কোলাবোরেশান করে কন্টেন্ট তৈরি করেন। তিনি একজন মোটিভেশনাল স্পিকার, নলেজ শেয়ারার। অথচ, ছোটবেলায় যখন লন্ডনের মতো শহরে তার বেড়ে ওঠা তখন তিনি কি ভীষণ লাজুক ছিলেন। তাকে আশেপাশের অনেকে বিদ্রুপ করত।

মুখচোরা ছিলেন, মিশতে পারতেন না কারো সাথে। সেই তিনি তারপর তিনবছর সব জলাঞ্জলি দিয়ে মংক হয়ে ইউরোপ, ভারত ঘুরলেন। নিজেকে চিনলেন নতুন করে। এখন গুগল, মাইক্রোসফটের মতো জায়গা থেকেও তার শিডিউল নেয়া হয় তার বক্তব্য শুনবার জন্য কিনোট স্পিকার হিসেবে। তার দেখার চোখ আমূল বদলে যাওয়ার পেছনে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে ভ্রমণও। তিনি পরামর্শ দেন বছরে অন্তত একবার হলেও মানুষ এমন কোথাও যাক, যেখানে সে আগে যায়নি কখনো। তিনি সম্প্রতি একটি ভিডিওতে বলেছেন ট্রাভেলিং থেকে পাওয়া ৭টি জীবনমুখী শিক্ষার কথা।

১। ট্রাভেলিং আপনাকে আরেকটু ভালভাবে শিখতে সাহায্য করবে, আপনি হবেন অন্যদের তুলনায় বেটার লার্নার। ভ্রমণ মানুষের ভিতরকার আগ্রহকে জাগিয়ে তোলে, আরো বেশি মানুষ কৌতুহলী হতে শিখে৷ জানার আগ্রহ বাড়ে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুরা ভ্রমণের সুযোগ পায়, বাইরের দুনিয়াকে দেখার সুযোগ পায় তারা আরো বেশি বিনয়ী হয়, আরো শান্ত এবং উদার হয়।

২। অফিস, বাড়িঘরের বাক্সের মতো বন্দী খোপে দিনের পর দিন থেকে আপনার অনেক অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায়। ট্রাভেলিং সেই অনুভূতির জটকে খুলতে সাহায্য করে৷ আপনাকে মুক্ত বাতাসের আনন্দ স্মরণ করিয়ে দেয়, আপনার নিভু নিভু হয়ে আসা ভোঁতা অনুভূতিগুলো প্রাণ ফিরে পায় ভ্রমণের কল্যাণে। অসাধারণ কোনো প্রকৃতির ছবি, প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে মাত্র ৪০ সেকেন্ড আপনি তাকিয়ে থাকলেও আপনার মনে একটা পরিবর্তন আসে যা আপনার পরের কাজের দিকে ফোকাস বাড়াতে সাহায্য করে৷ এটা গবেষণার তথ্য। তাহলে বাস্তবে যদি প্রকৃতি দর্শনে বের হন, সেটা আপনাকে কতটা বুষ্ট আপ করবে কল্পনা করুন!

৩। আপনি নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে পড়ে থাকলে, প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্দিষ্ট মুখ দেখতে দেখতে বিরক্তি এসে যাবে। আপনার জগত এইখানটায় সীমিত থেকে যায়, ফলে আপনি খুব জাজমেন্টাল হয়ে যান। আপনার সার্কেলের মধ্যে যা কিছু ঘটে, যে খবরগুলো আসে সেগুলোর কারণে আপনি ভাবতে শুরু করেন দুনিয়া খুব আনফেয়ার। মানুষগুলো খুব খারাপ। ট্রাভেলিং এই ফিক্সড মাইন্ডসেট থেকে আপনাকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। তারচেয়ে বড় কথা, মানুষের প্রতি আপনার চিন্তাধারণাও বদলে যাবে। মানুষের সরলতা, ভালবাসা, সংস্কৃতি, অল্পতেই আনন্দিত হবার ক্ষমতার সাথে আপনার দেখা হবে ভ্রমণে গেলেই৷

৪। ট্রাভেলিং মানুষের অভিজ্ঞতার ভান্ডার এত বড় করে যে, মানুষের কল্পনাশক্তি বেড়ে যায় বেশ অনেকখানি। ফলে, যারা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন, একটু ভবঘুরে মনোভাব যাদের, ঘুরার নেশা একটু বেশিই যাদের তারা তুলনামূলক বেশি ক্রিয়েটিভ হয়ে থাকেন। কারণ, অন্য সবার চেয়ে একটা জিনিসের ভিন্নতা ভ্রমণকারী মানুষের চোখে পড়ে বেশি। তাদের মাথায় আইডিয়া কিলবিল করতে থাকে৷ তারা মানুষের সম্পর্কে বেশি জানে বলে, তাদের সিদ্ধান্তগ্রহণ বেশি ইফেক্টিভ হয়।

৫। দৃষ্টিভঙ্গির বিশালতা তাদের বেশি, যারা ট্রাভেলিং করেন নিয়মিত। ধরুন, আপনি জন্মের পর থেকে একটা শহরে থাকেন। হাতের সামনে আপনি সব পেয়ে যান। ঘর থেকে এককদম পা ফেললেই আপনি সুপারস্টোরে সবকিছু পান, যা দরকার। ফলে একসময় আপনি সবকিছু ‘ট্যাকেন ফর গ্রান্টেড’ ধরে নেন। কিন্তু, যখন আপনি ঘুরতে যাবেন আপনি দেখবেন মানুষ কত ছোট ছোট প্রাপ্তির জন্য লড়াই করে৷ সমুদ্রের ধারে জেলে জীবন কিংবা দুর্গম কোনো পাহাড়ি এলাকার জীবন দেখে আপনি বুঝবেন তারা কত অল্পতেই তুষ্ট। আপনার গোটা জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই পালটে যাবে ভ্রমণের মাধ্যমে।

৬। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বৃহত্তর লক্ষ্য কি? জীবন থেকে আমরা কি চাই? সুখী হতেই তো চাই সবাই, তাই না! এটাই যদি লক্ষ্য হয় তাহলে ভ্রমণের চেয়ে আনন্দ, সুখের অনুভূতি আর কিসে আছে? নতুন একটা অভিজ্ঞতা পাওয়া, একদিন ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে বাঞ্জি ঝাপ দেয়া, সাহস করে সমুদ্রের তলদেশে ডাইভ দেয়া কিংবা স্কাই ডাইভ – যখনই আপনি এমন কোনো এক্টিভিটি কিংবা এক্সপিরিয়েন্স নিজেকে উপহার দিবেন সেটা আপনাকে অদ্ভুতভাবে সুখী করবে। আপনি শিখবেন, প্রতিটা মুহুর্তে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়, কিভাবে আসলে সুখ তৈরি করে নিতে হয়।

৭। যখন আপনি ভ্রমণে যাবেন প্রথমে অপার মুগ্ধতায় আপনি বাক্যহারা হবেন তারপর এই অভিজ্ঞতাগুলো আপনার গল্প হয়ে উঠবে। ভ্রমণ আসলে মানুষকে ধর্য্যশীল করে, নিজেকে চিনতে শেখায়, ভাবতে শেখায় জীবনকে। জন্ম-লোকে কি বলবে- মৃত্যু এই চক্রে আটকে গিয়ে অনেকেই গতানুগতিক একঘেয়ে একটা জীবন পার করে যাই। আমাদের বলার মতো গল্প থাকে না, একটা ভিজিটিং কার্ড ছাড়া। আমাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। আমরা সবকিছুর উপর বিরক্ত হয়ে থাকি। অথচ, এগুলো কিন্তু নিজেদের তৈরি সীমাবদ্ধতাই! নিজেকে ভেতরে কষ্ট দিয়ে, ক্ষোভ অভিমান, অভিলাষ, অপ্রাপ্তি দীর্ঘায়িত না করে আমরাও পারি দুচোখ ভরে দুনিয়াটাকে দেখতে। নরওয়ের অরোরা দেখতে দেখতে অথবা চীনের মহাপ্রাচীরের দেয়াল ছুঁয়ে কিংবা রৌদ্রজ্বল দিনে হেলিকপ্টার দিয়ে স্কাইডাইভের জন্য ঝাঁপ দিয়ে ভয়ে চিৎকার করতে করতে আমরাও বলতে পারি, জীবন সুন্দর! তবুও অসুন্দরের চক্রেই কেন থমকে থাকতেই হবে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button