মতামত

সাত কলেজ বনাম ঢাবি; প্রশাসনিক ভুল কেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ তৈরি করলো?

সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলবে নাকি চলবে না? – এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আর এটা অনেক বড় ব্যাপার।

সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করছে, সেটার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে। তারা যদি আন্দোলন করে তাদের ন্যায্য পাওনা আদায় করে নিতে পারে, তাহলে তারা সাধুবাদ পাবে।

প্রশ্ন অন্য জায়গায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রানিং শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় এই সাত কলেজ নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে। সেটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অনেকে এটাকে ফান করে উড়িয়ে দেয়, অনেকে গায়ে লাগায়। তবে এই কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাত কলেজ ঢাবির আওতামুক্ত করার আন্দোলনে যেতে পারে না।

লাইভ টিভি অনুষ্ঠানে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন সাত কলেজ ঢাবিমুক্ত চায়। তখন সামাজিক কারণের কথাতো বলা যায় না। বলতে হয়, আমাদের রেজিস্টার বিল্ডিং এর অতিরিক্ত চাপের কথা। বলতে হয় মহান শিক্ষকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের কথা।

সাত কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যদি আন্দোলন করতে হয়, তবে শিক্ষকরা করুক। ছাত্ররা কেন? যদি আন্দোলন করতে হয়, রেজিস্টার বিল্ডিং এর কর্মকর্তা, কর্মচারীরা করুক। ছাত্ররা কেন?

তবে কি রেজিস্টার বিল্ডিং এর কর্মকর্তারা এই সাত কলেককে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন? উত্তর: হ্যাঁ, পাচ্ছেন ই তো! তা না হলে তারা কেন অতিরিক্ত কাজ করে চুপ থাকবেন। সাত কলেজের লাখ লাখ শিক্ষার্থী বলে কথা।

এই আলোচনার ফোকাস পয়েন্টে আসি। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে যখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হতে শুরু করলো, তখন শিক্ষক বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই বোঝাতো । জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল। জগন্নাথ তখন কলেজ। এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল ধরেন। কেউ কেউ অবসর নেয়ার পর। দুই হাজার সালের পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আরো বাড়তে শুরু করলো, ২০১০ এর পর সংখ্যাটা তুঙ্গে উঠে এলো। এখনকার অবস্থা না বলি।

এতো বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খ্যাপ মারা টিচার মানে পার্টটাইম, চুক্তিভিত্তিক, ক্রেডিট ভিত্তিক, সেমিস্টার ভিত্তিক টিচার দিয়ে কার্যক্রম চালাতো। তখন টিচারদের আবদার মেটাতে তাদের অনেক হিমশিম খেতে হতো। তাই এখন আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পার্টটাইম শিক্ষক দরকার হয় না, তাদের স্টুডেন্ট বা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফুল টাইম জয়েন করতেছে হুমড়ি খেয়ে। বেকারত্বের কথা না বলি।

এরই ফলশ্রুতিতে বিপাকে পড়েছে কারা? উত্তর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাপ মারা শিক্ষকরা। সরি টু সে, শিক্ষকতা আর চাকরী এক জিনিস না। যদিও অনেক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অবসর নেয়ার পর ; প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের অনুরোধ করে সেখানে পড়াতে বলেন। আর বাকী যারা পড়াতেন তাঁরা পারিবারিক চাহিদা মেটাতে, একটু বিলাসবহুল জীবন যাপনের জন্য।

আরো মোটা দাগে বলতে গেলে, প্রায় সব শিক্ষকই কোন না কোনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধা পেয়ে থাকেন, যতদূর জানি। ভুলও হতে পারে। তাঁদের ছেলেমেয়েরা নাকি অনেকেই বাংলা বলতে পারে না। শহরের নামী দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। এর পরে পাড়ি জমায় বিদেশে। তাই এতো খরচ মেটাতে গিয়ে শিক্ষকদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি পার্টটাইম জবের দরকার হতো । কিন্তু ঐ যে বললাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এখন পার্টটাইম টিচার নেয় না।

যেই বিশ্ববিদ্যালয় একটা ভাষা, একটা দেশের জন্ম দিয়েছিল। যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য এই স্ট্যাটাসে লিখে শেষ করা সম্ভব না, নব্বইয়ের স্বৈর শাসকের আন্দোলন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের ধারা বহমান ছিল। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় নতুন ধারায় প্রবাহিত হওয়া শুরু করলো।

আশির দশকের অপরাজেয় বাংলা! তখন এর আশেপাশে বন্ধু বান্ধব'দের আড্ডা বসতো , এখনো তা কম যায় নাহ! পুরনো ছবিটি ১৯৮৭ সালে তোলা!

আলোচনা দীর্ঘ না করে আবার ফোকাস পয়েন্টে আসি। কথিত আছে যে, আরেফিন স্যার আর হারুন স্যারের মধ্যে ব্যক্তিগত ঝামেলা ছিল। সেই জেদ ধরেই আরেফিন স্যার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উচ্চ শিক্ষার বিস্তারের কথা বুঝিয়ে এই সাত কলেজকে ঢাবির অধীনে আনে। এটা লোকমুখে শোনা কথা।

ঘটনা যাই হোক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য খুবই ভালো। আর এই ঘটনার সাথে সাথে শিক্ষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ হলো। ভর্তি ফরম থেকে প্রশ্ন করা, ভাইভা নেয়া, পরীক্ষায় গার্ড দেয়া, খাতা দেখা সবই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা করছেন।

ফলশ্রুতিতে ঐ সাত কলেজের টিচারদের দাম কমে গেছে, তাদের হাতে কিছুই নেই। সাত কলেজের ছেলেমেয়েরা ক্লাস করছে না নিয়মিত। আর পরীক্ষার প্রশ্ন যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা করে, পরে খাতাও দেখে। তবে তারাতো আগের চেয়ে মার্কস কম পাবে। অনিয়মিতরা ফেল করবে। ফলাফল বিপর্যয় হবে। আবার সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত বন্ধ করবে। আন্দোলন করবে। যানজট হবে। সাধারণ মানুষ কষ্ট হবে। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অতিরিক্ত বেতনের আশায় চুপটি মেরে বসে থাকবেন।

যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হওয়ার কথা ছিল, কথা ছিল গবেষণা হবে। উন্মুক্ত আলোচনা হবে শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীদের। হচ্ছেটা কী? শুনবেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটারে থাকা শিক্ষকের ছেলে এটা জানে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা হচ্ছে দুই টাকার ছেলে। এটাই বাস্তবতা। অথচ সে জানে না, তার বাবা মা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের ডাল খেয়েছিল একদিন।

অতীতে শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের সুসম্পর্ক ছিল। যাঁরা এই গণ্ডির বাইরে, তাদের সাথে এখনো আছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আসার পর থেকে সম্পর্ক কমতে শুরু করেছিল। সাত কলেজ আসার পর আরো কমে গেছে। খেয়াল করে দেখবেন, এখনো ঐ সব সম্মানিত শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের ভালো সখ্যতা আছে। যারা এই সাত কলেজের কার্যক্রমের সাথে জড়িত না। অতীতে তাদের সাথে ছিল, যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম দিত না। যারা গবেষণা করে, তাদের সাথেই শিক্ষকদের সুসম্পর্ক বেশি। একজন শিক্ষকের ক্লাসে বেঞ্চের অভাবে ছেলেমেয়েরা বসতে পারে না, আরেক জনের ক্লাসে ছেলেমেয়েরা উপস্থিতির জন্য অনিচ্ছাকৃতভাবে যায়।

দোষটা কার? ছাত্রের না শিক্ষকের? কিছু শিক্ষক যারা সাত কলেজ কার্যক্রমের সাথে যুক্ত, তারা চাচ্ছেন সাত কলেজ থাকুক। যারা যুক্ত না , তারা কেউ কেউ ফেসবুকে সরব। দেখা যাক, দিনশেষে কারা বিজয়ী হয়।

একমাত্র শিক্ষকরাই পারে বিশ্ববিদ্যালয়কে অতীতের সম্মান, মর্যাদা, ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে। কোন এক গল্পে পড়েছিলাম। স্বাধীনতার আগে কিংবা পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একজন শিক্ষক দেখতে কেমন হবে? তিনি কিভাবে কথা বলেন? এই চিন্তা করে তাঁর সাথে দেখা করতে আসা একজনের আগের রাতে ঘুম হয়নি। আরো শুনেছি, অতীতে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, হোমড়া চোমড়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসায় এসে বসে থাকতো স্রেফ পরামর্শ নিতে। আর এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে দামী চেয়ারে বসে শিক্ষকরা কোন দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির পদ খুঁজেন। লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে।

নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়? মস্তিষ্ক নষ্ট হয়ে গেলে শরীরে তো পচন ধরবেই।

লিখেছেন – মুজিবুর রহমান জয়, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button