খেলা ও ধুলা

সার্জিও রামোস, ব্যাডবয়, এল ক্যাপিটানো কিংবা একজন মাদ্রিদিস্তা!

এ.এইচ বাদশা

২৫শে মে, ২০১৪; লিসবন,পর্তুগাল-

দলের সেরা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশে সবুজ গালিচায় ইকার ক্যাসিয়াসের ভুলে সেদিন ০-১ গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের ৯০ মিনিটের সময় সাইডলাইনে কার্লো আনচেলত্তি থেকে শুরু করে রিয়ালের সকল খেলোয়াড় এবং ভিআইপি বক্সে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজেরই চিন্তার ছাপমাখা দৃশ্যগুলো তখন বারবার দেখাচ্ছিলেন ক্যামেরাম্যান। অতিরিক্ত ৩ মিনিটের খেলাও তখন শেষের দিকে!

ঘড়ির কাঁটা তার নির্দিষ্ট গতিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, পিনপতন নীরবতা পর্তুগাল থেকে স্পেন হয়ে সূদুর বাংলাদেশের মাদ্রিদিস্তাদের ঘাটিতে। শেষ মুহুর্তের খেলা চলছে। যে কোন সময়েই বেজে উঠবে রেফারির বাঁশি, চ্যাম্পিয়নস লীগের শিরোপাটা আরেকবার ফসকে যাচ্ছে গ্যালাক্টিকোসদের৷

৯২.৪৮ মিনিটে ডু অর ডাই মুহুর্ত, কর্নার পেলো রিয়াল মাদ্রিদ! লুকা মড্রিচ বল নিয়ে যাচ্ছেন, চারদিকে নিস্তব্ধতা, শট মারলেন ক্রোয়েশিয়ান জাদুকর। সবাইকে টেক্কা দিয়ে একধাপ উপরে লাফিয়ে উঠলেন রিয়াল মাদ্রিদের ৪ নাম্বর জার্সি পরিহিত এক ডিফেন্ডার! স্প্যানিশ গ্লাডিয়েটরের মাথা ছুঁয়ে কর্তোয়াকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ালো৷

সার্জিও রামোস, রিয়াল মাদ্রিদ

মুহুর্তেই মাত্র ১২ সেকেন্ড বাকি থাকতে ১-০ থেকে ফাইনালের স্কোরলাইন হয়ে গেল ১-১! নিস্তব্ধতা ভেঙে চারদিকে উল্লাসে ফেটে পড়লো মাদ্রিদিস্তারা। তার দেখানো পথেই যোগ করা ৩০ মিনিটে ৩ টি গোল দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ ঘরে তুললো তাদের বহু আরাধ্য চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা। তবে ৪-১ স্কোরলাইনটি দেখে বোঝার উপায় নেই কিভাবে একটি গোলই বদলে গিয়েছিল সেদিনের পুরো ম্যাচের প্রেক্ষাপট।

সেদিন একজন ডিফেন্ডার হয়ে উঠেছিলেন ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ যিনি রক্ষণ সামলানোর সঙ্গে প্রতিপক্ষের আক্রমণও দুমড়ে মুচড়ে দিতে পারেন। গত দশ বছরেরও বেশি সময়ে ফুটবলে সবচেয়ে ভয়ংকর,সবচেয়ে আগ্রাসী এবং প্রতিপক্ষের দলের স্ট্রাইকারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া এই খেলোয়াড়টির নাম হচ্ছে সার্জিও রামোস গার্সিয়া।

ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়ের স্বাদ গ্রহণ করেন। একমাত্র ডিফেন্ডার; যিনি ক্লাব বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন। ফুটবল ইতিহাসে সবচাইতে বেশি ১০ বার ফিফা ফিপ্রো একাদশে,সবচাইতে বেশি ৭ বার উয়েফা টিম অব দ্যা ইয়ারে জায়গা পেয়েছেন।শুধু তাই নয়,রামোস সবচাইতে বেশি ৫ বার লা লীগা ডিফেন্ডার অব দ্যা ইয়ার,২য় সর্বোচ্চ ২বার উয়েফা ডিফেন্ডার অব দ্যা ইয়ার নির্বাচিত হোন।

বর্তমান ফুটবলারদের মধ্যে একমাত্র রামোসই ফিফা ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের ড্রিম টিমে জায়গা পান।লিওনেল মেসি ও আদুরিজের সাথে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে লা লীগার টানা ১৫ মৌসুমেই গোল করেন।বর্তমানে ডিফেন্ডারদের মধ্যে সবচাইতে বেশি ১০০টিরও গোল রামোসের! শুধুই এখানেই শেষ নয়, স্পেন জাতীয় দলের হয়ে রামোসের গোলসংখ্যা ২১টি, স্পেনের সর্বকালের শীর্ষ ১০ গোলদাতাদের একজন।

উত্থানপর্ব

স্পেনের সেভিল প্রদেশের কালমাস শহরে বাবা জোসে মারিও রামোস ও মা পাকুই রামোসের ঘর আলো করে জন্ম, ফুটবলের প্রতি দূর্বলতা ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। ১৪ বছর বয়সে স্থানীয় সেভিয়া এফসি ক্লাবের নজড়ে পড়লেন। যুবদল থেকে সিনিয়র দলে ডাকও পেলেন দ্রুতই।

২০০২ সালের স্পেনের উয়েফা ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব -১৯ চ্যাম্পিয়ন দলের একজন ছিলেন রামোস। ২০০৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সেভিয়ার প্রথম দলে অভিষেক, প্রথম মৌসুমেই নিজের জাত চেনালেন। ২০০৩-০৪ পুরা মৌসুমে সেভিয়ার হয়ে ৪১ ম্যাচ খেলেন।

রামোসের অসাধারণ পারফরম্যান্সে ভর করেই দুর্বল সেভিয়া সেবার লা লীগার ৬ষ্ঠ স্থানে মৌসুম শেষ করে এবং ইউরোপা লীগ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। রামোস জিতে নেন লা লিগার বর্ষসেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার; নজড়ে পড়েন ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর।

অবশেষে ২০০৫ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের একদম শেষ মুহুর্তে ‘ডেডলাইন ডে’তে রামোসকে তখনকার রেকর্ড ২৭ মিলিয়ন ডলারে সেভিয়া থেকে বার্না ব্যু’তে নিয়ে আসেন ফ্লোরেন্টিনা পেরেজ।

মাদ্রিদ যাত্রা এবং একজন মাদ্রিদিস্তা

২০০৫ সালে লীগ ম্যাচে সেল্টা ভিগোর সাথে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাবটির হয়ে ডেব্যু হয় রামোসের। মাদ্রিদের হয়ে শুরু থেকেই ফার্নান্দো হেরেইরার ৪ নাম্বরের সম্মানিত সাদা জার্সিটি গায়ে দেন।একই বছরের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগে গ্রুপপর্বের ম্যাচে গ্রীক ক্লাব অলম্পিকাসের সাথে প্রথম রিয়ালের হয়ে গোল করেন রামোস।

যদিও ম্যাচটি রিয়াল হেরে যায় ২-১ গোলে।রিয়ালের হয়ে স্ট্রাগলের শুরু থেকেই সেন্টার ব্যাক হিসেবে শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যেই মাইকেল সালগাদোকে হটিয়ে নিজের প্রিয় রাইটব্যাক পজিশনটাই নিলেন। তারপর!

তারপর থেকেই রিয়াল মাদ্রিদের অবিচ্ছেদ্য অংশ রামোস! ২০১৫ সালে রামোস রিয়াল মাদ্রিদের সাথে ৫ বছরের নতুন চুক্তি করেন। এই সময়ে রিয়লালের হয়ে দ্যা গ্রেট ইকার ক্যাসিয়াস বিদায় নিয়ে গেলে ইতিহাস সমৃদ্ধ এই ক্লাবের হয়ে প্রতিনিধিত্বের ভার আসে রামোসের উপর।যদিও হোসে মরিনহোর আমল থেকেই মাঝে মধ্যে রিয়ালের আর্মব্যান্ড পড়েছেন।

১৫ই ডিসেম্বর ২০১৫ সালে রামোসের অধিনায়কত্বে রায়ো ভায়কানোর সাথে ১০-২ গোলে লা লীগার ৫৫ বছরের ইতিহাসে সবচাইতে বড় জয় পায় রিয়াল মাদ্রিদ। রামোসের নেতৃত্বেই রোনালদো-ক্রুস-ক্যাসি­মেরো-মদ্রিচদের নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ গড়ে তুলে নয়া গ্যালাক্টিকো।
রিয়ালের হয়ে এই গ্যালাক্টিকোর হয়ে ৪টি লিগ টাইটেল, হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৪টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপসহ জিতেন সর্বমোট ২০টি শিরোপা।শুধু তা-ই নয়, ৬১৩টি ম্যাচ খেলে রিয়ালের হয়ে এখন পর্যন্ত রামোসের গোল সংখ্যা ৮৪টি এবং সাথে ৩৪টি এসিস্টও। একজন ডিফেন্ডার হয়ে এতসংখ্যক গোল এই শতাব্দীতে আগে কেউ কখনও করেনি।

বর্নিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২৬ শে মার্চ ২০০৫ সালে চীনের সাথে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মাত্র ১৮ বছর ৩৬১ দিন বয়সে ৫৫ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে স্পেনের ডেব্যু হয় রামোসের। স্পেন জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের আগে অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়েও বেশ কিছু ম্যাচ খেলেছেন রামোস।

photo source: getty images/www.sportsjoe.ie

রামোস স্পেন জাতীয় দলের গোল্ডেন জেনারেশনের সবচেয়ে ভাইটাল প্লেয়ারদের একজন। বিশ্বকাপ ছাড়াও রামোস ২০০৮ ও ২০১২ ইউরোর কাপে জিতেছেন। ২০১৪ ফিফা কনফাডেরশন্স কাপের ফাইনালও খেলেছেন।আর মাত্র একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারলেই ইকার ক্যাসিয়াসকে হটিয়ে স্পেন জাতীয় দলের হয়ে সবচাইতে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়বেন; স্পেনের হয়ে জিতেছেন সবচাইতে বেশি ১২৩টি ম্যাচ। ইতিমধ্যে স্পেনের হয়ে ক্যাসিয়াসের সমান ১৬৭টি ম্যাচে ২১টি গোল এবং ৭টি এসিস্টও করে ফেলেছেন।রামোস একবিংশ শতাব্দীতে একমাত্র ডিফেন্ডার হিসেবে ১০০ গোলের মাইলোস্টনে পৌছেন।

ব্যাডবয় রামোস

আচ্ছা ফুটবলে ব্যাডবয় বললে আপনার কার কথা সবচাইতে বেশি মনে পড়ে? মারিও বালোতেল্লি নাকি জ্বালাতন ইব্রামোভিচের কথা?দিয়াগো কস্তা,লুইস সুয়ারেজ, কার্লোস তেভেজ বা জেমি ভার্ডির নামও মনে আসতে পারে।তবে পরিসংখ্যানে কিন্তু ফুটবলের সব ব্যাডবয়কে ছাড়িয়ে গেছেন সার্জিও রামোস।

লা লীগায় গেল ১২ বছরে সবচাইতে বেশি ১২৫টি কার্ডের দেখা পেয়েছেন রামোস যার ৭৯টিই প্রতিপক্ষের মাঠে।২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এসপানিয়েলের সাথে প্রথম লাল কার্ডের দেখা পান রামোস। সেই থেকে পুরো ক্যারিয়ারে এই পর্যন্ত ২৪টি লাল কার্ডের দেখা পান রামোস যা ফুটবল ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

গোটা ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৪৬ টি লালকার্ডের মালিক কলম্বিয়ান ফুটবলার জেরার্ডো বেদোয়া। চ্যাম্পিয়নস লীগে সবচাইতে বেশি ৩৬টি হলুদ কার্ড রামোসের দখলে। টোটাল ক্যারিয়ারে রামোস ২৩৮ হলুড কার্ডের মালিক, এটা এসময়ের যেকোনো ফুটবলারের চেয়েও বেশি। রিয়ালের হয়ে রামোসের হলুদ কার্ডের সংখ্যা ২০৯ টি, সেভিয়ার হয়ে সাতটি এবং বাকি ২১ টি স্পেনের হয়ে। মজার বিষয় হল,টোটাল ক্যারিয়ারে ২৪টি লাল কার্ডের মালিক রামোস এখনও স্পেন জাতীয় দলের হয়ে একটইরও লাল কার্ডের দেখা পায়নি।

তবুও রামোস এক বর্নিল চরিত্র। লিডারশীপ, প্যাশন ও এগ্রিসিভনেসের কারণে প্রতিটি মাদ্রিদিস্তার কাছে বর্তমানে রামোস এক আবেগের নাম,অনুভূতির নাম।রামোস মানেই শেষ মুহূর্তের গোলে ডুবো তরী ঘাটে ফেরানোর মত।রামোস না থাকলে হয়তো আজ মাদ্রিদিস্তারা এত উদযাপন করতে পারত না,এত শিরোপাও নিজেদের নামে করতে পারত না।

তাইতো রামোসের প্রশংশায় একবার সাবেক আর্জেন্টাইন মাদ্রিদিস্তা জর্জে ভালদানো বলেন, “সার্জিও রামোস ড্রেসিং রুমে এমন ভাবে প্রবেশ করে যেন রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবটা তারই এবং মাঠে সে এমন ভাবে প্রবেশ করে যেন ফুটবল খেলাটা সেই আবিষ্কার করেছে।তার লিডারশীপ সত্যিই অসাধারণ।”

তবে রামোস সম্পর্কে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উক্তিটি করেন রিয়াল বস দ্যা গ্রেট জিনেদিন জিদান- “সম্ভবত রামোসই স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীক”।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button