এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

এটাই কি নরেন্দ্র মোদির ‘সেক্যুলার ইন্ডিয়া’?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশটার ক্ষমতাসীন দলের ভোটে জেতার মূলমন্ত্র যদি হয় ধর্মীয় আগ্রাসন এবং সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়া, এরচেয়ে জঘন্য আর কিছুই হতে পারে না। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে গত পাঁচ বছরে ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেইসঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপরে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে প্রচুর, যেগুলোর বেশিরভাগের সঙ্গেই বিজেপি বা সমমনা কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর কর্মীরা জড়িত ছিলেন। উত্তরপ্রদেশ থেকে কাশ্মির, কিংবা আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গ- কোন এলাকাই রেহাই পায়নি এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগুন থেকে। মজার বিষয় কি জানেন? এতকিছুর পরেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতকে ‘সেক্যুলার’ বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দাবী করেন!

মোদির সেই তথাকথিত ‘সেক্যুলার ভারত’ কে গতকাল আরও একবার কৌতুক বানিয়ে ছেড়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। পশ্চিমবঙ্গে এক নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বলেছেন, অভিবাসী মুসলমান যারা আছে ভারতে, তাদের সবাইকে ঝেঁটিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলা হবে! বিজেপি প্রধান বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীরা বাংলার মাটিতে উঁইপোকার মতো। বিজেপি সরকার তাদের এক এক করে তুলে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলবে।

অমিত শাহ

এমনিতেই মুসলমানদের ওপরে খানিকটা বিতৃষ্ণা আছে বিজেপির, শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় এবং বিভিন্ন প্রাদেশীক নেতারা নানাসময়ই সেটা বুঝিয়েও দিয়েছেন। বিজেপির রাজনীতির মূল হাতিয়ারই তো পাকিস্তান বিরোধীতা এবং সাম্প্রদায়িকতা। আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের এর আগেও ‘বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিজেপির পক্ষ থেকে। আসামে তো নাগরিকদের নামের তালিকাও করা হচ্ছে রাজ্যসরকারের তরফ থেকে। সেখানে পঞ্চাশ-ষাট বছর বা তিন পুরুষ ধরে বাস করছেন, এরকম লোকজনও বাদ পড়েছেন তালিকা থেকে! সেই বাদ পড়াদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান, আবার হিন্দুও আছেন অনেকে।

উত্তরপ্রদেশে বিজেপির প্রার্থী যোগী আদিত্যনাথ যখন মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হলেন, তখনই অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, খারাপ সময় আসছে। কথাটা একেবারে মিথ্যে বলে প্রমাণ হয়নি। যোগী মূখ্যমন্ত্রীর আসনে বসার পর থেকেই রাজ্যে গো-হত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন, মুসলমান হলেও কেউ গরুর মাংস খেতে পারবে না! ভারতে গত দুই/তিন বছরে যতো মুসলমানের ওপরে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই এই গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে। এইতো, সপ্তাহখানেক আগেই আসামে শওকত নামের এক মুসলিম কসাইকে মেরেধরে জোর করে শূকরের কাঁচা মাংস খাইয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদী একটা সংগঠনের কর্মীরা!

মুসলিম এই মাংস ব্যবসায়ীর ওপরে নির্যাতন চালানো হয়েছিল আসামে

এর আগেও বিহারে, উত্তরপ্রদেশে, এমনকি কেরালাতেও মাংস ব্যবসায়ীদের এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। গরু এবং মহিষের মাংস বিক্রির লাইসেন্স থাকার পরেও তাদের দোকানে কিংবা মাংসবাহী ভ্যানে হামলা চালানো হয়েছে, নির্যাতনে বেশ কয়েকজন নিহতও হয়েছেন! কিছুদিন আগে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ফোর্সের ওপরে জঙ্গী হামলা হলো, প্রায় পঞ্চাশজন সেনা নিহত হলেন, সেটার জের ধরে ভারতের নানা জায়গায় কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপরে হামলা করেছে বজরং দল সহ বেশকিছু কট্টরপন্থী সংগঠন। হামলার সঙ্গে যে নিরীহ কাশ্মীরিদের কোন সংযোগ নেই, সেটা বোঝার চেষ্টাই করেনি এই মাথামোটা লোকগুলো।

উত্তরপ্রদেশের মিরাটে হোলির দিন মুসলিম এক পরিবারের ওপরে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে, তাদের বলা হয়েছে পাকিস্তানে চলে যেতে, ভারতে থাকার অধিকার নাকি তাদের নেই! কাশ্মীরের ঘটনার পরে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির স্থানীয় কিছু কর্মী মুসলিম হঠাও শ্লোগান দিয়ে কাশ্মীরি এক ফল বিক্রেতার ওপরে হামলা চালিয়েছিল, তাকে মেরে আহত করেছিল।

ধর্ষণ ও হত্যার শিকার কাশ্মীরি বালিকা আসিফা বানু

আট বছরের কাশ্মীরি বালিকা আসিফা বানুকে নৃশংসভাবে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছিল শুধু সেখানকার মুসলিম আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার জন্যে। সেই ধর্ষককে বাঁচানোর জন্যে আবার কট্টরপন্থী দলগুলো মিছিল-মিটিং করেছে, বিজেপির এক নেতা মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করেছেন সেই খুনী গ্রেফতার হওয়ায়! অবশ্য, আমাদের দেশেও তো মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ধর্ষক সিরাজ উদ দৌলার মুক্তির জন্যে মিছিল বের হয়, নিজেদের আর ভালো দাবী করি কি করে?

মুষ্টিমেয় মানুষ ছাড়া সাম্প্রদায়িকতা ব্যাপারটা সবার জন্যেই অভিশাপ। অল্প কিছু ব্যক্তি, বা নির্দিষ্ট একটা গোষ্ঠীই কেবল সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থেকে ফায়দা লুটতে পারে। সেই গোষ্ঠীটাই যখন একটা দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সেটা সংখ্যালঘুদের জন্যে হুমকিস্বরূপ। বিজেপির নেতারা এখনই যেভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষাগার করছেন, টানা দ্বিতীয়বার ভোটে জিতে ক্ষমতায় এলে যে এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কতদূর গড়াবে, সেটা নিয়ে আশঙ্কায় পড়তে হয় এখনই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button