এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডছবি কথা বলে

বাংলাদেশেও যদি এমন ব্যবস্থা থাকত…

মাঝে মধ্যে মনে হয়, আমাদের মুখ থেকে নিঃসৃত সব কথা কি আমরা নিজেরা বিশ্বাস করি না আসলে? এই কথাটি বলছি শারীরিকভাবে যারা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার শিকার তাদের প্রসঙ্গে। আমরা বলি, এই মানুষগুলোরও সমান অধিকার আছে। তারাও আমাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাটা খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় কিন্তু কখনো কখনো কিছু ঘটনায় খুব আক্ষেপ জাগে। তখন নিজেদের বলা কথাগুলোকেই অবিশ্বাস হয়।

যেমন একবার আমরা কয়েকজন বন্ধু কক্সবাজারে গিয়েছি। সেখানে এক দম্পতিকে দেখলাম। পুরুষ মানুষটি তার স্ত্রীকে হুইলচেয়ারে নিয়ে বিচের একদিকে ঘুরে জলের কাছাকাছি গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে আছেন। পরে ঘটনাসূত্রে তাদের সাথে কথা হয়। ভদ্রলোক যা বললেন তার সারমর্ম, কোনো একটা বড় এক্সিডেন্টের পর তার স্ত্রী বাম পা কেটে ফেলতে হয়। তারপর থেকে এই অবস্থা। হুইলচেয়ারের জীবন। অথচ একসময় নাকি সেই নারীটি ঘুরতে ভীষণ পছন্দ করতেন। আগের বার যখন কক্সবাজারে এসেছিলেন, যখন জলে শরীর ভাসিয়েছেন, এবার শুধু দূর থেকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।

এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ আছেন যারা শারিরীক প্রতিবন্ধকতার দরুন কোথাও ঘুরতে যেতে পারেন না। কারণ, যারা শারিরীক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকেন, তাদের হাঁটাচলার সুবিধার জন্য, হুইলচেয়ার উঠানোর জন্য গেটে যে সমতল জায়গা থাকা প্রয়োজন সেই ব্যাপারটা অনেক জায়গাতেই নেই। এছাড়া, শারিরীক প্রতিবন্ধকতার শিকার মানুষদের বিশেষভাবে বিনোদন দিতে পারে, কিংবা ভ্রমণের আনন্দ তারাও নিজেদের মতো করে পূর্ণ করে নিতে পারে এমন সুবিধাও খুব বেশি স্পটে দেখা যায় না বাংলাদেশে। ফলে তখন মনে পড়ে নিজেদের বলা সেই কথা, ওরা আমাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আসলেই কি তাই? কথাটা একটু ভুল হয়ত। শারিরীক প্রতিবন্ধকতাসমেত মানুষদের ইচ্ছাশক্তি কোনো অংশে আমাদের চেয়ে কম নয়। এটা হলো মূল কথা। কিন্তু, আমাদের ইচ্ছাপূরণ নিয়ে অনেকে যেমন কাজ করে, তাদের ইচ্ছাপূরণ নিয়ে কতজন কাজ করে?

মারসিন সি বিচ, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

কিন্তু স্বদিচ্ছা থাকলে খুব সামান্য একটু আয়োজনে অনেক বিশাল পরিবর্তন আনা সম্ভব। ছোট্ট একটা আইডিয়াতেই হয়ত হয়ে যেতে পারে এইসব মানুষদের পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণবিলাসের ইচ্ছাপূরণ। তুর্কি দেশের তুখোড় এবং দারুণ আইডিয়ার কথা বলি। এই দেশটার মারসিন নামক অঞ্চলে একটা সমুদ্র সৈকত আছে। মারসিন মেট্রোপলিটন মিউনিসিপালিটি কতৃপক্ষ সমুদ্র সৈকতের এক জায়গায় যাদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে সেইসকল মানুষদের জন্য দারুণ একটা ব্যবস্থা করেছে।

সৈকতের যে জায়গায় মানুষ গোসল করতে নামে, জলে দাপিয়ে বেড়ায় সেখানে দুইপাশে রেলিংয়ের মতো করে হাটু জল সমান একটা জায়গা তৈরি করে দিয়েছে তারা। ফলে, যেকোনো শারিরীক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ চাইলে সেখানে নেমে সমুদ্রজলে নিজের শরীর এলিয়ে দিতে পারে। এরকম সুন্দর আইডিয়া খুব কমই দেখেছি আমি! এবং আমার মনে হয়েছে চাইলে বাংলাদেশের কক্সবাজারে এরকম একটি ব্যবস্থা আমাদের পর্যটন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষও চালু করতে পারেন। এবং এই কাজটা খুব কঠিন যে তাও না। প্রয়োজন একটু স্বদিচ্ছা। অন্যান্য সি বিচেও করা যেতে পারে এমন কিছু কিন্তু কক্সবাজারে হলে আমাদের ট্যুরিজম ব্র‍্যান্ডিংয়েও এই ব্যাপারটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

মারসিন সি বিচ, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

যেহেতু, কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, এখানে দেশের পর্যটকরা একবার হলেও ভ্রমণ করতে চান জীবনে, বাইরের দেশ থেকেও পর্যটকরা এখানে আসেন। তাই এই জায়গাটিতে এরকম ব্যবস্থা হলে সেটির একটা ইতবাচক প্রভাব পড়বে। যারা ‘ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড’ তারা আসলে অক্ষম নন, ভিন্নভাবে সক্ষম। তাদেরকে সহানুভূতি নয় একটু সহযোগিতা করলে তারাও জীবনটা পুরোদমে উপভোগ করার সুযোগ করে নেবেন।

শুধু মৌলিক চাহিদা মেটানো মূল কথা নয়, মানসিক চাহিদা মেটানোর জন্য একটু ভ্রমণবিলাস সবার জন্যেই জরুরি। এই ভ্রমণবিলাসের স্বপ্ন সবার আছে। নির্দিষ্ট গন্ডি, সীমারেখার বাইরে গিয়ে নিজেকে মেলে ধরবার ইচ্ছে সবার আছে। সবার জন্য হোক পর্যটন, প্রত্যেকের ভ্রমণবিলাসের অধিকার নিশ্চিত হোক। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে, আমাদের পর্যটন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ এই আইডিয়া নিয়ে ভেবে দেখবেন, সেই আশা রাখছি।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button