ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ফেসবুক লাইভ ও একজন সায়েদুল হকের গল্প

সময়টা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের। সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, ফেসবুক আইডিও আছে সবার। তবে ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতার এই সুযোগটার অপব্যবহার অনেকেই করেন, মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্যে ফেসবুকের চেয়ে ভালো জায়গা বোধহয় বাংলাদেশে নেই। গুজব ছড়ানো, তারকাদের ফেসবুক পেইজ বা একাউন্টে গিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা- সবকিছুই আমরা করে থাকি অহরহ। তবে চাইলেই যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দারুণভাবে কাজে লাগানো যায়, দেশ ও দশের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, কিংবা ফেসবুকের মাধ্যমেই যে সামাজিক সমস্যার সমাধান করা যায়, সেরকম অনেক উদাহরণও আছে। গণজাগরণ মঞ্চ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের রূপ ধারণ করেছিল ফেসবুকের কারণে, সেটা তো আমরা ভুলে যাইনি।

ফেসবুকে গালাগালি করে কিংবা মানুষজনকে পর্দা করার উপদেশ না দিয়ে যে আরও হাজারটা ভালো কাজও করা যায়, সেটারই দারুণ এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো দুইদিন আগে। সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন নামের এক আইনজীবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, আমরা নিজেরা যদি অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকি, তাহলে সিস্টেম বদলাতে খুব বেশি সময় লাগে না।

ঘটনাটা দুইদিন আগের। ঢাকা-নরসিংদি হাইওয়ে দিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন সায়েদুল হক। পথেই শিবপুর থানার কালারচর নামক একটা জায়গায় অল্পের জন্যে তার গাড়িটা একটা বিদ্যুতের পিলারকে ধাক্কা দিতে দিতে অল্পের জন্যে বেঁচে গেলো। গাড়ি থামিয়ে তিনি সেই পিলারের সামনে এসে চমকে গেলেন, পল্লীবিদ্যুতের খুঁটিটা যে জায়গাটায় লাগানো, সেটা রাস্তারই অংশ!

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারলেন, এই খুঁটিটার কারণে এই জায়গায় বেশ কয়েকটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, প্রাণহানিও হয়েছে। এলাকার লোকজন বেশ কয়েকবার পল্লীবিদ্যুৎ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগও দিয়েছে এই খুঁটিটা রাস্তা থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্যে। কিন্ত অজানা কোন কারণে কেউ গা করেনি, পাত্তাও দেয়নি, আর তাই রাস্তার অংশ থেকে খুঁটিও সরেনি, এই হাইওয়ে দিয়ে চলাচলকারী জনগণের ভোগান্তিও কমেনি।

সৈয়দ সায়েদুল হক এরা আগে জনবান্ধব নানা ইস্যু নিয়ে ফেসবুক লাইভে এসেছেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। কাঁটাবনে রাস্তা দখল করে বালু ফেলে রাখা হয়েছে, সেখান থেকে তিনি লাইভে এসেছেন, আবার মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারের অব্যস্থাপবার কথাও তিনি বলেছেন ফেসবুক লাইভে এসে। সেদিনও এর ব্যতিক্রম ঘটলো না, নরসিংদির শিবপুর থেকে ফেসবুক লাইভে এসে সমস্যাটার বিস্তারিত জানালেন তিনি, খুঁটিটি সরানোর দাবীও তুললেন।

সেই লাইভ ভিডিওটা ভাইরাল হলো ফেসবুকে, অনেকেই সেটা শেয়ার করলেন। শুরু হলো আলোচনা। প্রায় বিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ সেই ভিডিওটি দেখেছেন। রাত পোহানোর আগেই নড়েচড়ে বসলো কর্তৃপক্ষ, বেশ কয়েকজন সরকারী কর্মকর্তার নজরেও তখন পড়েছে ভিডিওটি। শিবপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে, নরসিংদি জেলা প্রশাসনে নিয়োজিত আরেক কর্মকর্তা আরাফাত নোমানও তার উপরস্থ অফিসারদের দৃষ্টিগোচরে আনেন বিষয়টি।

ফলাফল পাওয়া গেল তাৎক্ষণিকভাবে। পরদিন দুপুরের মধ্যেই রাস্তার একটা অংশজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বৈদ্যুতিক পিলারটি সরিয়ে ফেলা হলো। মহাসড়ক থেকে প্রায় পাঁচ ফুট দূরে সেটাকে পুনরায় স্থাপন করে নরসিংদি পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি জানার পরে সায়েদুল হক আবারও সেই জায়গায় যান, তারপর সেখান থেকে আবার ফেসবুক লাইভে এসে সবাইকে জানান যে, তার প্রতিবাদ কাজে এসেছে, রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে খুঁটিটি।

সৈয়দ সায়েদুল হকের ফেসবুক লাইভ ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সমাজের নানা সমস্যা খুঁজে বের করে প্রতিনিয়তই তিনি জানাচ্ছেন সবাইকে, আবার একইসাথে বিভিন্ন সময় স্কুল-কলেজে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে বক্তব্য রাখছেন, তাদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলছেন, সচেতন একজন নাগরিক এবং একজন ভালো মানুষ হিসেবে জীবন গড়ার উপদেশ দিচ্ছেন। কিছুদিন আগেও এক স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে দেয়া তার একটা বক্তব্য ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল।

সৈয়দ সায়েদুল হকের সমাজসেবা বা সচেতনতা প্রচারের কাজটা নতুন কিছু নয়, অনেক আগে থেকেই এটা করে আসছেন তিনি। ব্যক্তিগত অর্থায়নে তার নিজের এলাকা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি রাস্তা সংস্কার, ১টি নির্মাণ এবং ১৯টি কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করেছেন তিনি, তার সঙ্গী হয়েছে সাধারণ মানুষ, তারাও যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন তাকে, টাকা না দিতে পারলে শ্রম দিয়েছেন। এসব কাজের বদৌলতে ফেসবুকে আলোচনায় এসেছেন তিনি, অনেকে তার প্রশংসা করেছেন, কেউ কেউ আবার বলেছেন এসব তার ভাঁওতাবাজী। এসব কথাবার্তায় অবশ্য সায়েদুল হক দমে যাননি, তার কথা হচ্ছে-

‘আমি যখন প্রথম কাজগুলো করতে গিয়েছি, তখন সরাসরি আমার এ কাজে যারা সুবিধা পেয়েছে তারা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে কিন্তু যারা সুবিধা পায়নি, তারা হাসাহাসি করেছে। বলেছে, এটা একটা নাটক শুরু হয়েছে, ব্যারিস্টার হয়ে সে নাটক করছে নেতা হবার জন্য। যখন আমি এ পর্যায়ে অনেকগুলো কাজ করে ফেলেছি, তখন মানুষ ভাবছে, নাটক করেও তো এত কাজ করা যায় না। এখন আমার এলাকার প্রতিটা জায়গায় আমার মত কাজ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটাই আমার সফলতা।’

‘আমি যে পরিবার থেকে ব্যারিস্টার হয়েছি, প্রসিকিউটর হয়েছি, আমার মনে হয় এটাই আমার জন্য অনেক বেশি। আমি অনেক পেয়েছি। এখন সমাজকে কিছু দিতে হবে। এই চিন্তা থেকেই আমি কাজে নেমে গেছি। মানুষ পানির কারণে চলাচল করতে পারছে না, ব্রিজ লাগবে। এখানে অমুককে ডাকতে হবে, তমুককে ডাকতে হবে। এটা কেন? আমার দরকার ব্রিজ বানানো, ব্রিজ বানাতে যা লাগে তা দিয়েই শুরু করতে হবে।’

সায়েদুল হকের আরেকটা পরিচয় আছে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। যে দেশটাকে জন্ম দিতে গিয়ে তার বাবা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, সেই দেশটাকে সুন্দর আর বসবাসের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্যে আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনিও। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি, যুদ্ধাপরাধ মামলার প্রসিকিউটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

এত ভালো ভালো কাজ করার পরেও তার শত্রু বাড়ছে। কারণ অনেকের হালুয়া-রুটি ভাগাভাগিতে বাগড়া দিয়েছেন সায়েদুল হক। হয়তো ১০০ মিটারের একটা রাস্তা করার জন্যে কোন ঠিকাদার বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এক লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন, তার পাশেই সায়েদুক হক এক কিলোমিটারের একটা রাস্তা বানিয়েছেন মাত্র তিন লক্ষ টাকা খরচে। তখন তো সরকারী কাজে দুর্নীতির ব্যাপারগুলো মানুষের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আর এই ব্যাপারটাই কেউ কেউ মেনে নিতে পারছে না, যারা দলের প্রভাব খাটিয়ে অন্যায়ভাবে সরকারী টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে, তাদের চক্ষুশূল সায়েদুল হক হবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। তার ভীষণ ইচ্ছা, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যদি কখনও তার দেখা হয়, তাকে তিনি বলবেন- ‘আমি এমপি-মন্ত্রী কিছু হতে চাই না, আমাকে শুধু বাধাহীনভাবে কাজ করতে দিন!’

সায়েদুল হকের মতো মানুষগুলোকে আমাদের সমাজে, আমাদের দেশে খুব বেশি দরকার। যারা প্রতিনিয়ত সিস্টেমকে ধাক্কা দেবেন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার অসঙ্গতিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন, নাগরিকদের নিজ নিজ অধিকায় আদায়ের দাবীতে সচেষ্ট করবেন। জাফর ইকবাল স্যার একবার বলেছিলেন, ‘একজন ভালো মানুষ দিয়ে কি হয়? কিছুই হয় না। কিন্ত একশোজন ভালো মানুষ একটা দেশকে বদলে দিতে পারে!’ তেমনই একজন সায়েদুল হক হয়তো খুব বেশি কিছু করতে পারবেন না। কিন্ত তাকে দেখে, তার কর্মকাণ্ড দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি আরও একশোজন সায়েদুল হক তৈরি হয়ে যায়, আমাদের দেশটা বদলে যেতে সময় লাগবে না খুব বেশি…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button