ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

সুবোধরা একেবারে পালিয়ে যায়নি, বেঁচে আছে ‘সারোয়ার’দের মাঝে!

এই সময়ে সবচেয়ে আলোচিত সমস্যা কি আমাদের দেশে? আমি জানি এই একটা জায়গায় আপনিও আমার সাথে একমত হবেন।বাংলাদেশে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় খতরনাক সমস্যা হলো দুর্নীতি। ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির এই হাল দেখে হাইকোর্ট পর্যন্ত বিরক্ত, মর্মাহত। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রত্যেকটা স্তরে একটু গভীরে প্রবেশ করলেই যে কালো অধ্যায়গুলো সামনে চলে আসে, তার নাম দুর্নীতি, অনিয়ম, অসততা।

সৎ মানুষ কাকে বলবেন এই জমানায়? কাকে বিশ্বাস করবেন আপনি? সৎ মানুষের অভাব আছে তো বটেই আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাও ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে। ফলে, এখন আপাতদৃষ্টিতে কাউকে সৎ মনে হলেও আমরা বলি, “সে আবার কিসের সৎ, মনে হয় সুযোগ টুযোগ পায় না, সুযোগের অভাবে সৎ। সুযোগ পাইলে সেও বেলাইনে চলে যেত।” আবার কেউ সৎ কাজ করে প্রচার করলেও আমরা কথা শুনাই, বলি প্রচার পাওয়ার জন্য এসব করে, শো-অফ করার জন্য এসব করে। কিন্তু, আসলেই কি গোটা সমাজের একই অবস্থা? সব কি নষ্ট হয়ে গেছে? সবাই কি নষ্টের দলে?

নাহ, এখনো পুরো সমাজটা একদম পঁচে যায়নি। সুবোধ এখনো পুরোপুরি পালিয়ে যায়নি। সুবোধের বসবাস এখনো বিরাজমান কিছু মানুষের মধ্যে। নাহ, সবাই যে সুযোগের অভাবে সৎ এমন না, এই বাংলাদেশেই কেউ কেউ আছেন যারা ‘সুযোগ’ পেয়েও সৎ! তেমনি একজন মানুষ সারোয়ার। তিনি গতকাল ঢাকায় এসেছিলেন অফিসের কাজে। কাজ শেষে নারায়ণগঞ্জ ফেরার পথে তার সাথে অদ্ভুত একটি ঘটনা ঘটলো। নারায়ণগঞ্জ- পাগলা সড়কে ঘটে এই ঘটনা।

তিনি উঠেছিলেন অটোরিকশায়। হঠাৎ তার চোখ পড়লো, একটি ব্যাগ। তিনি ভেবেছেন অটোরিকশা চালকের হবে হয়ত। জিজ্ঞেস করলে অটোরিকশা চালকও হয়ত অবাক, জানালো ব্যাগটা তার নয়। পরে কার ব্যাগ, কোনো পরিচয় মেলে কিনা খুঁজতে ব্যাগ খুলতেই সারোয়ার জাহান হতভম্ব হয়ে গেলেন। দেখতে পেলেন, ব্যাগভর্তি টাকা। এই টাকার পরিমাণ অবশ্য পরে জানা যায়। টাকার অংক নেহাতই কম নয়, পাঁচ লক্ষ টাকা।

এরকম হুট করে পাওয়া টাকা পেয়ে গেলে এই অস্থির সময়ে বিবেকহীনতার সময়ে কারো কি মাথা ঠিক থাকত? অনেকের হয়ত থাকত, কিংবা অনেকেরই থাকত না। লোভী মন ফুঁসলে উঠলো, চোখ দুটো চকচক করে উঠতো। সারোয়ার জাহানের মননে মগজে কি ঘটে গেছে ওইসময়ে কে জানে। তিনি ঠিক করলেন, এই টাকাগুলো এবং কাগজপত্রগুলো আসল মালিকের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। কার টাকা কে জানে, এমনও হতে পারে এটা কোনো মায়ের অপারেশনের টাকা, এটা কোনো সদ্য ব্যবসা শুরু করা মানুষের সবটুকু জমানো পুঁজি, হতেই পারে এটা কোনো বাবার জমি বিক্রি করা অর্থ, হতে পারে এটা কোনো বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণের টাকা..

সারোয়ার টাকার ব্যাগটি নিয়ে সেই অটোরিকশা চালক সহই গেলেন পুলিশের কাছে। তিনি ডেইলিস্টারের প্রতিনিধির কাছে জানান পুরো ঘটনাটি। বলেন, “ঢাকায় অফিসের কাজ শেষ করে শ্যামপুরের ঢাকা ম্যাচ এলাকার সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে সিএনজি অটোরিকশায় রওনা দেই। অটোরিকশায় উঠতেই সিটের পাশে দেখি একটি ব্যাগ রাখা আছে। ব্যাগটি কার জিজ্ঞাসা করতেই চালক জানায় যে তার নয়। বলেন, হয়তো কোন যাত্রী ফেলে রেখে গেছে। পরে ব্যাগটি খুলে দেখতে পাই অনেকগুলো টাকা ও ছবিসহ পাসপোর্টের একটি ফটোকপি রয়েছে। যেহেতু ব্যাগটি আমার না এবং সিএনজি চালকও জানে না কার তাই ফতুল্লা থানার ওসি মঞ্জুর কাদের এর কাছে হস্তান্তর করি। যাতে এর প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।”

পুলিশ অফিসারও বিমুগ্ধ হয়ে গেলেন। ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের বলেন, “এখানে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ও একটি পাসপোর্টের ফটোকপি আছে। ধারণা করা যাচ্ছে এ টাকার মালিক বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকা জমা দিতে কিংবা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভুল করে ব্যাগটি ফেলে রেখে চলে যায়। সারোয়ার জাহান মহৎ মানুষ। যে এতোগুলো টাকা পেয়েও কোন লোভ না করে প্রকৃত মালিককে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুলিশের কাছে নিয়ে এসেছেন।”

এমন সারোয়াররা বেঁচে থাকলেই টিকে যাবে সুবোধ, এমন সারোয়াররা বেশি বেশি সমাজে থাকলেই যে জিতে যাবে বাংলাদেশ। আমরা সারোয়ারদের কেন ভাইরাল করি না, সারোয়ারদের খবর শুনে যদি আরো একজন মানুষেরও সুবোধ ফিরে আসে, সেটাই বা কম কি!

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button