সিনেমা হলের গলি

হৃদয়পুরে কোনো এক নীলপাখি সঞ্জীবের নাম নিয়ে গান গেয়ে যায় এখনো!

যখন সঞ্জীব লিখেন ‘তোমার ভাঁজ খোল আনন্দ দেখাও, করি প্রেমের তরজমা’, তখন আমিও প্রেমিক হই। যখন লিখেন ‘এক পলকেই চলে গেল আহ্ কি যে তার মুখ খানা, রিকশা কেন আস্তে চলে না’, তখন আমিও আফসোস নিয়ে কোন এক রূপসীর চলে যাওয়া দেখি। যখন লিখেন, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’, তখন কোন রূপসীর মাঝে চাঁদকে দেখি। কোন রূপসীর অদ্ভুত চাহনি দেখে আমিও প্রশ্ন করে উঠি, ‘ওমন মেয়ে কি করে বানালে ঈশ্বর’!

সঞ্জীব যখন লিখেন, ‘বলেছ বারণ বলেছ বিদায়, স্বপ্ন বাড়ায় তবু হাত ডাকে আয়’, তখন বিরহী সঞ্জীবকে চোখের সামনে খুঁজে পাই। যে সঞ্জীব কান্নারও রঙ দেখেছিলেন, দেখেছিলেন জোছনার মাঝে ছায়া। যখন সঞ্জীব লিখেন, ‘সমুদ্র কি তোমার ছেলে, আদর দিয়ে চোখে মাখাও’, তখন মানুষটার চিন্তার গভীরতা সত্যিই আমাকে ভাবায়। যে মানুষটা বিশাল সমুদ্রকে টুপ করে চোখের মাঝে ঢেলে দিতে পারে, চোখের জলকে আদরের ছেলের সাথে তুলনা করতে পারে, কেবল সে মানুষটাই শঙ্খচিলের শরীর চেরা কান্না অনুভব করতে পারেন। যখন লিখেন, ‘আমাকে ভালোবাসবে ঠিকই কিন্তু আমার হবে না, হাতের ওপর হাতের পরশ র’বে না’, তখন ভায়োলিনে বেজে ওঠে বিচ্ছেদের সুর। মনের মাঝে নীল পাখিটি গাইতে থাকে বিরহ সঙ্গীত।

যখন লিখেন, ‘আগুনে পুড়েছি দু’হাত বাড়িয়ে, পুড়ে যাবার কিছু বাকি নেই। আমি ভাল নেই, ভাল থাকার কিছু নেই’, তখন অসহায় নিঃসঙ্গ সঞ্জীবের মাঝে নিজেকে কিভাবে যেন খুঁজে পাই। সঞ্জীব লিখেছিলেন, ‘আমার মনেতে নাই সুখ, তাই চোখের মাঝে বসত করে অন্য লোকের চোখ’! তখন বুঝতে পারি কিভাবে প্রতিটি কথায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। কিভাবে প্রতিটি কথার মাঝে নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখি।
সঞ্জীব যখন লিখেন, ‘দোল ভাটিয়ালী এ নদী রুপালী ঢেউ এর তালেই নৌকা বাজাও’, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে জীবন নৌকার মাঝির ভাটিয়ালি গাইতে গাইতে নৌকা বেয়ে যাওয়ার চিত্র। অবাক হই, বিস্মিত হই যখন দেখি সঞ্জীব দেহতত্ত্ব নিয়ে লিখেছেন,

সাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে আউলা বাতাস খেলে,
আর কাদায় ভরা মনের মধ্যে জলের সন্তরণ।

প্রেম বিরহের বাইরেও সঞ্জীব জীবন নিয়ে ভেবেছেন। ভেবেছেন মানুষের মুক্তি নিয়ে। তিনি যখন লিখেন, ‘আসতিছে পরিবর্তনের হাওয়া। এদিকে তহবিল জমে, ওইদিকে চোখের পানি’, তখন দেশের বাস্তব চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যখন লিখেন, ‘রেডিওতে খবর দিছে দেশে কোন অভাব নাই, নাইলার ঘরে, কাইলার ঘরে আনন্দের আর সীমা নাই, চেয়ারম্যান সাবে বগল বাজায়, আমরা কিচ্ছু দেখছি না’, তখন শোষকের শোষণ নির্যাতনের পরেও মুখোশ লাগিয়ে বিশ্বকে রঙ্গিন বাংলাদেশ দেখানোর দৃশ্য দেখি।

মানুষের কান্না, দহন, মরে মরে বেঁচে থাকা সঞ্জীবকে ভাবায়, কাঁদায়। তিনি যখন লিখেন, ‘সবুজ দ্বীপে মরণ ঘাঁটি ভাল লাগে না’, তখন চোখ মেলে চারদিকে সবুজের উপর সত্যি সত্যি লাশের মিছিল দেখি। যখন লিখেন, ‘একজন কর্নেল তাহের-পৃথিবীর সমান বয়সি স্বপ্ন নিয়ে আলিঙ্গন করেন ফাঁসির রজ্জু, পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক, আকাশে শান্তি বাতাসে শান্তি, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে ধরীয়ে দিন’, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বৈরাচারী সরকারের কুৎসিত চেহারা। তবুও থেমে থাকেন না সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখা, গরিব দুঃখী মেহনতি মানুষের জন্য সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখা সঞ্জীব। তিনি লিখেন, ‘আমার স্বপ্নের-ই কথা বলতে চাই, আমার অন্তরের কথা বলতে চাই’।

এতোকিছুর মাঝেও একজন অভিমানী সঞ্জীব ছিলেন, যাঁকে আমরা কেউই চিনতে পারিনি কোনকালে। তাঁর অভিমানের কথা বুঝতে পারনি কোনোদিন-

‘পাগল রাগ করে চলে যাবে, ফিরেও আসবে না
পাগল কষ্ট চেপে চলে যাবে, ফিরেও আসবে না’

তখন ভাবি, কাকে বলছেন তিনি এসব? কার কাছে ফিরবেন না আর সঞ্জীব? কিসের এত অভিমান ছিল তাঁর। কাকে তিনি ফেরানোর অনুরোধ করছেন?

জানি না, কিচ্ছু জানি না। আমাদের স্বপ্নের বাঁশিওয়ালা এখন আর আমাদের জন্য স্বপ্ন বাজিয়ে শোনান না। পাগল স্বপ্নপুরুষটা রাগ করে চলে গেছে। গান গাইতে গাইতে চলে গেছে। বাঁশি বাজিয়ে আমাদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে চলে গেছেন স্বপ্নবাজি রেখে। আমাদের সামনে রেখে গেছেন নষ্ট সময়ে পঁচে যাওয়া কিছু মানুষ আর ঘুণে ধরা একটা সমাজ।

আমরা তবুও গান গাই, তবুও স্বপ্ন দেখি। তবুও হৃদয়পুরে কোন এক নীলপাখি সঞ্জীবের নাম নিয়ে গান গেয়ে যায়, আর আমরাও তা গুনগুন করে মানুষকে শোনাই। কারণ সঞ্জীব যে আজো আমাদের বুকের ভিতরে গান গেয়ে যান, স্বপ্ন দেখান। সঞ্জীব আছেন আমাদের অন্তরে। আমরাও গেয়ে যাই,

‘কষ্ট নিষিদ্ধ, কষ্ট নাই
দুঃখ নিষিদ্ধ, দুঃখ নাই।
আমাদের কষ্ট থাকতে নাই,
দুঃখ পাওয়ার আদেশ নাই।’

লিখেছেন- দেবজ্যোতি দেবু

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button