অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

একজন তিথির জন্যে ভালবাসা!

“মানুষ হতে মানুষ আসে,
বিরুদ্ধতার ভিড় বাড়ায়
তুমিও মানুষ, আমিও মানুষ,
তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়।”

কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন লাইনগুলো। পরিস্থিতি মানুষ চেনায়৷ মানুষরুপী সকলের চেহারা হলেও কত সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য একজন থেকে আরেকজনকে যোজন যোজন আলাদা করে দেয়। কেউ শিরদাঁড়া গুড়ো করে দিতে চায়, আর কেউ তখন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যায়। বলছি এক অগ্নিকন্যার কথা, যিনি বুয়েট ছাত্র আন্দোলনে শিরদাঁড়া উঁচু করে চোখে চোখ রেখে ন্যায্যতার প্রশ্নে ছিলেন অটল, অবনত। তার সাহসী অবস্থান, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর প্রশংসিত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েট ফুঁসে উঠেছিল। খুনীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আমরা দেখেছি সমুদ্রের মতো উত্তাল, অন্য এক বুয়েটকে। সেখানে এই একজন নারী যেন এই আন্দোলনকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছেন। তার সোচ্চার আপোষহীন বজ্রকণ্ঠ আন্দোলনকে শক্তি যুগিয়েছে। শিরদাঁড়া উঁচু করে কিভাবে জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে হয়, কিভাবে আপোষহীন আলোর মশাল হয়ে জ্বলে উঠতে হয় – তা দেখালেন এই সাহসী কন্যা।

 

তার নাম অন্তরা তিথি। বুয়েটে আবরার নিহত হবার পর বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক যখন অবশেষে গড়িমসির পর ছাত্রদের মুখোমুখি হলেন, তখন তাকে প্রশ্নের বানে জর্জরিত করেন তিথি। ছাত্র কল্যাণ পরিচালককে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, স্যার আপনি কি আপনার বিবেকের কাছে পরিষ্কার, হ্যা বা না বলুন। আপনি কি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন? কিসের দায়িত্ব পালন করেছেন আপনি? আপনার ছাত্রকে ধরে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, আপনি কিসের ছাত্র কল্যাণ দেখেন?

ছাত্র কল্যাণ পরিচালককে এসময় আমরা থতমত হয়ে যেতে দেখলাম। তিনি আমতা আমতা করে কি বললেন, তা শুনে তার নৈতিকতার জোর যে কতটুকু তা ছাত্ররা ঠিকই বুঝে নিয়েছে।

আবরারকে পিটিয়ে মারার ত্রিশ ঘন্টারও বেশি সময় পরে ক্যাম্পাসে হাজির হয়েছেন উপাচার্য্য

এদিকে বুয়েটের ভিসির খবর তো পাওয়াই যাচ্ছিলো না। তিনি ক্যাম্পাসের পথ ভুলে গিয়েছিলেন কিনা কে জানে, এক প্রকার নিরুদ্দেশই ছিলেন তিনি। অবশেষে ছাত্রদের আল্টিমেটামের মুখে যখন তিনি আসলেন, তাকেও চোখে চোখ রেখে তিথি স্তব্ধ করে দেয়া কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। বললেন, আপনার ছাত্রকে মেরে ফেললো, আর আপনি ঘরে বসে আছেন। কেমন ভিসি আপনি? ক্যাম্পাসে আপনার ছাত্রের জানাজা হচ্ছে সেখানে আপনি উপস্থিত থাকেন না?

কি অদ্ভুত দ্রীপ্ত কন্ঠে তিথি জবাবদিহিতা চাইলেন। এর আগে পুলিশকেও তিনি প্রশ্ন করেছেন। পুলিশ আঙ্গুল তুলে কথা বলছিল দেখে, তিথি পালটা বলে উঠেন, আঙ্গুল তুলে কেন কথা বলতেছেন আমাদের সাথে?

পুলিশ হলের ভেতরে ঢুকে পড়লে, তিথি তাদের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, কার অনুমতি নিয়ে আপনারা আমাদের হলে ঢুকেছেন?

এই একজন তিথি বুয়েট ছাত্র আন্দোলনকে অন্য মাত্রায় উন্নীত করেছেন। তার সাহস প্রেরণা হয়ে ছড়িয়ে গেছে আন্দোলনে। এমন অদম্য সাহসী একজন তিথি থেকে শেখার আছে আমাদেরও। কিভাবে ন্যায্যতার দাবিতে অটল থাকতে হয়, কিভাবে এই ঘুনে ধরা সিস্টেমের উর্ধ্বতন কর্তাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েই নার্ভাস করে দেয়া যায়, তা এই মেয়েটিকে দেখে শিখুক লোকে। ভিসি দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন দিতে বাধ্য হন, ছাত্র কল্যাণ পরিচালক বলতে বাধ্য হন বুয়েটে ছাত্র রাজনীতির নামে এই অপরাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত, তিনিও মনে করেন।

এটাই নৈতিকতার শক্তি৷ এটাই প্রশ্নের শক্তি। তিথি দেখিয়েছে কিভাবে প্রশ্ন করতে হয়। ওদের উত্তর দিয়ে অভ্যাস নেই৷ ওরা শুধু চাপিয়ে দিতে জানে। কিন্তু তিথিদের মতো কেউ যখন শিরদাঁড়া উঁচু করে দাঁড়ায়, তখন ওরা ঘাবড়ে যায়। একজন তিথির প্রতি মুগ্ধতা যতটুকু, শ্রদ্ধাও ততটুকু। তিথি আপনি ভালো থাকুন, আপনারা এভাবে আলো জ্বেলে দিলে অন্ধকার ফিকে হবেই…

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button