মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

এবার যদি সালমানও বই বের করতেন…

মেসির হাতে যে বছর বিশ্বকাপ উঠলো না, মানে ২০১৪ সালের ফাইনালে মেসির দল আর্জেন্টিনা জিততে পারলো না, তখন অনেকেই বলতে শুরু করেছিল, মেসির নয় এটা বিশ্বকাপের দুর্ভাগ্য। বিশ্বকাপ এতটাই হতভাগ্য যে সে মেসির হাতে চড়তে পারলো না। তেমনি বলতে হচ্ছে, এবারের বইমেলারও দুর্ভাগ্য, এই বইমেলায় প্রকাশিত হলো না সালমান মুক্তাদিরের কোনো বই। বাংলাদেশের মোটামুটি প্রায় সব ‘বিখ্যাত’ মানুষের বই এই বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। কিছু বই মোটিভেশনাল, কিছু বই ইমোশনাল। মানুষও পাগলের মতো নিজের জান বাঁচাতে, জ্ঞ্যান বাড়াতে পড়ছেন এই বইগুলো।

কিন্তু, এই বইমেলায় একদম ষোলকলা পূর্ণ হতো যদি আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় ইউটিউব তারকা সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের একটি বই প্রকাশিত হতো। মানুষ সালমান থেকে প্রতিনিয়ত কত কিছু শিখছে। সালমানের কন্টেন্ট এঙ্গেলও মানুষকে চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে। এত ‘ক্রিয়েটিভ’ আইডিয়ার সম্রাট তিনি, তার একটা বই বের হলে মানুষ জানতে পারত, কি চলে এই ছেলেটার মস্তিষ্কে। অনেকে ফেসবুকে পোষ্টের নিচে কমেন্ট করে ‘ক্যামনে পারেন ম্যান’, এরকম আমাদেরও জানতে ইচ্ছে হয় ক্যামনে পারে সালমান?

সালমান মুক্তাদির, তাহসিনেশন

তবে হতাশ করেননি বিশিষ্ট চিন্তাবিদ সুবিখ্যাত, সুবক্তা, সুন্দর মনের মানুষ সোলায়মান সুখন। সালমানের মাথায় কি আছে সেটা জানা না গেলেও জানা গেছে সোলায়মান সুখনের ‘মস্তিষ্কের ক্যানভাস’। যদিও এত কিছু করেও, এত সুবচন দেয়ার পরও অনেকে অকারণে সুখন ভাইকে পচন লাগিয়ে কথা বলে। তার সিক্স ডিজিট স্যালারি নিয়ে মশকরা করে। এগুলো একদমই ঠিক নয়। মানুষের মধ্যে মমতার পারদ কমে গেলে থার্মোমিটারে যেটা উঠে সেটা জ্বর না, ঘৃণার বিষবাষ্প৷ সুখন ভাইকে ধন্যবাদ এই বইমেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে তার মস্তিষ্কের ক্যানভাস তুলে ধরবার জন্য। তবে, আপনার প্রতি অনুরোধ থাকবে সালমান মুক্তাদিরকে একটু মোটিভেশন দিবেন, উনি যেন বিছানা থেকে নেমে আলস্য কাটিয়ে আপনার মতো মস্তিষ্ক খাটিয়ে একটা বই লিখে ফেলে। তাহলে আমরা বাংলা সাহিত্যের ভক্তরা ধন্য হবো, সালমানকে গণ্য করব ‘বেস্টসেলার’ লেখক হিসেবে। সালমানও অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ, ভিডিওগ্রাফ দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠবে। অবিশ্বাস্য হয়ে খেয়াল করবে তার কত ভক্তরা আন্তজার্তিক বই পড়া বাদ দিয়ে তার বই পড়তে পড়তে অশ্রুপাত করছে।

সোলায়মান সুখন

জানি না সালমান কি অশ্রুপাত করাতে রাজি হবেন কিনা। তবে এইদিকে বাংলাদেশের আরেক সুপারস্টোর, যিনি বিনোদনের চলমান একটি পাইকারি স্টোর, এই উপমহাদেশের আলোচিত ব্যক্তিত্ব, সব হিরোর হিরো, সব নায়িকারও হিরো, তরুণ প্রজন্মের আইলাইনার জনাব হিরো আলম কিন্তু এবার ঠিকই বইমেলা কাঁপাতে চলে এসেছেন। শুধু কাঁপাতে নয় তিনি এসেছেন কাঁদাতে। হিরো আলম এই বই মেলায় নিয়ে এসেছেন তার জীবনীমূলক বই ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, আমরা সমাজকে বদলে দিব’। হিরো আলম কথা দিয়েছেন তার মৃত্যুর পর তার বইয়ের লেখা সকলকে কাঁদাবে। তিনি বলেন, “..এখনো সময় আছে আপনারা যদি দৃষ্টিভঙ্গি না বদলান তাহলে আমাদের সমাজ এবং দেশ কখনোই বদলাবে না। আমি হিরো আলম হয়তো মারা যাবো কিন্তু আমার লেখা বইটি থেকে যাবে এবং একদিন না একদিন আমার এই লেখাগুলো আপনাদেরকে কাঁদাবে কথা দিলাম।”

সালমান মুক্তাদির এবং হিরো আলম তো প্রায় সমান জনপ্রিয়। তিনি যে কেন একটা জীবনী প্রকাশ করছেন না! ভাবতেই শিহরিত হয়ে যাই, বইমেলায় সালমানের একটা আত্মজীবনী বের হয়েছে। সেই আত্মজীবনী পড়ে সালমানের কঠোর পরিশ্রমী, সংগ্রামী জীবনের কথা পড়ে মানুষ তুমুল বেগে অশ্রুপাত ঝড়াচ্ছে। সালমানের জীবন তো হিরো আলমের জীবনের চেয়ে কম দুর্দশার নয়। কত কষ্ট যে তিনি করেছেন আজকের এই পর্যায়ে আসতে, হিরো আলম আর কতটুকুই পারলেন ওসব। মানুষ তাই কাঁদতো, ঝরঝর করে, কলকল করে কাঁদত। আমরা দেখতাম, সালমান ‘জাস্ট ফ্রেন্ড’ হয়ে তখন মানুষগুলোকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, ‘মাথায়’ হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। নিজের কাঁধ পেতে দিচ্ছেন সবাইকে যেন সকলে আরামসে অশ্রুত্যাগ করতে পারে।

হিরো আলম

সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো, সালমানের বই বের না হওয়ায় জ্ঞ্যানঅর্জনের অনেক বিশাল একটা সুযোগ থেকে পাঠক সমাজ বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে যারা ‘আন্তজার্তিক’ বিভিন্ন লেখকের বই পড়ত, তারা আশা করেছিল সালমান তার ভিডিওর মতো আন্তর্জাতিক মানের একটা বই লিখবে। সালমানের বই বের হলেই অনেক জটিল সমস্যার সহজ সমাধান পাওয়া যেত। রাস্তাঘাটে অনেকসময় ভ্যানগাড়িতে করে কিছু বই বিক্রি করে না মাইক দিয়ে? ওই যে বলে নাহ, এই বইটি পড়লে আপনারা আরো জানতে পারবেন কিভাবে আকাশ দিয়ে পাখি উড়ে, আরো জানতে পারবেন মানুষ কেন নাক ডাকে..

তেমনি সালমানের বইটি পড়লেও জানা যেত কিভাবে কাটা দিয়ে কাটা তুলতে হয়। এই অধ্যায়ের ভেতরে ডিটেইলে থাকত কিভাবে হেটারদেরকে ভিডিও দেখাতে হয়। বইয়ের ভেতর একটি অধ্যায় থাকত, অভদ্র প্রেম। এই অধ্যায়ে দেখানো হতো, কিভাবে আপনি ঘরে বসে আন্তর্জাতিক মানের প্রেম করবেন। বইটিতে আরো থাকত, জাস্টফ্রেন্ড থাকার একানব্বুইটি সুবিধা। সালমান যেহেতু মার্কেটিং ভাল বোঝেন, বইটিতে তাই থাকতেই পারত একটি অধ্যায় যেখানে তিনি নেগেটিভ মার্কেটিং ১০১ কোর্স বয়ান করবেন। তবে সব কিছুর বাইরে সালমান বইটিতে আবেগী হয়ে লিখবেন, কিভাবে নিজেকে ডিফেন্ড করতে হয়। না না, তিনি আসলেই নিজেকেই ডিফেন্ড করে এই অধ্যায়টা লিখবেন। তার ডিফেন্স পড়ে মানুষ ইমোশনালি এগ্রিসিভ হয়ে হাউমাউ করে কাঁদবে, কাঁদতে হবেই।

এবার বই বের হয়নি তো কি হয়েছে। এবার ভিডিও বের হয়েছে। আগামীবার বই বের হবে। এবার মানুষ ভিডিও দেখেই ক্লান্ত হয়েছে, হোক। সমস্যা নেই। সালমান নিশ্চয়ই আগামী বইমেলায় একটি বই আনবেন। হিরো আলমকে টেক্কা দিয়ে তার বই-ই হবে বাজারের সেরা আকর্ষণ। আশা করি, সহৃদয়বান কোনো প্রকাশক সালমানের বই বের করার দায়িত্ব নিয়ে বাংলা সাহিত্যের উপকার করবেন, যেমনটা তারা করেছেন এই বঙ্গজনপদের সকল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের বই এনে। আমাদের জ্ঞ্যানচক্ষু উন্মোচিত হয়েছে। আমাদের মস্তিষ্কের ক্যানভাস বিস্তৃত হয়েছে। আমরা বাথরুমে বসে হাউমাউ করে কেঁদেছি। শুধু আক্ষেপ রয়ে গেল, সালমানের জন্য কিছু করতে পারলাম না। আহ! সালমানের বই পড়ে কাঁদতে পারলে বড্ড ভাল লাগত, কতদিন হি হি হি করে কাঁদিনা….

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button