রকমারিরিডিং রুম

বিস্মৃত নবাব সলিমুল্লাহ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!

ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান নবাব সলিমুল্লাহ, জীবনের দৈর্ঘ্য ছিল যার মাত্র ৪৪ বছর। অন্যান্য নবাবদের তুলনায় সলিমুল্লাহ বেশ ব্যাতিক্রমই ছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের একশ বছর আগে জন্মেছিলেন তিনি। ১৮৭১ সালে। নবাব আহসানউল্লাহর এই পুত্র কিছুটা অন্যরকম ছিলেন। ঘর ত্যাগ করেছিলেন পারিবারিক কলহে। নিজের বিবাহ নিয়ে মতবিরোধের জের ধরে ১৮৯৩ সালে চলে যান ময়মনসিংহে। সেখানে গিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি নেন।

গৃহত্যাগী নবাব আবার ফিরে আসেন, পিতার আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুনে। ১৯০১ সালে পিতার মৃত্যুর পর জীবিত জ্যোষ্ঠ সন্তান হিসেবে তিনিই নওয়াব উপাধিতে ভূষিত হন। এখানে উল্লেখ্য যে, নবাব উপাধিটি ব্রিটিশদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন সলিমুল্লাহ’র দাদা আবদুল গনি। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব বিপন্ন হলেও ঢাকায় ব্রিটিশরা আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছিল আবদুল গনির কারণেই। আবদুল গনিকে বলা হতো, পূর্ববঙ্গের শ্রেষ্ঠ জমিদার। যাই হোক, ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশরা আবদুল গনির আনুগত্যের পুরষ্কার হিসেবে তাকে নবাব উপাধিটি দেয় এবং তার দুই বছর বাদে ঘোষণা করা হয় আবদুল গনির পরিবার এই উপাধিটি বংশানুক্রমিকভাবে ব্যবহার করতে পারবে।

নবাব পরিবারের লিগ্যাসি এভাবে বংশ পরম্পরায় আসে নবাব সলিমুল্লাহর হাতে। কিন্তু, লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবাব পরিবারের ব্রিটিশ তাবেদারির টিপিক্যাল মনোভাব থেকে কিছুটা আলাদা ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ৷ তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজ আর রাজনীতিই নিয়ে মেতে উঠেন৷ এসব কাজে অকাতরে অর্থ খরচ হতে থাকে তার। আর এইদিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে নবাব এস্টেট পরিচালনায় খুব বেশি মনযোগী হতে পারেননি। ফলে, নবাব পরিবারের সম্পত্তিতে ভাটার টান লাগে। রাজনীতি এবং সমাজসেবার কাজে তিনি ৩৭ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেন। এমনকি খরচ সংকুলান করতে স্ত্রীদের গহনা পর্যন্ত বিক্রি, বন্ধক রাখতে হয় তাকে।

অবস্থা এমনই দাঁড়ালো যে, ১৯০৭ সালে তিনি অর্থাভাবে পড়ে মারোয়ারি এবং হিন্দু মহাজনদের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করেন ১৪ লাখ টাকা। নবাবের এসব খামখেয়ালি অনেকেই পছন্দ করে না। তারা কথা তোলে, নবাব এস্টেটের সহায় সম্পদ ভাগ ভাটোয়ারা হোক। সলিমুল্লাহর ছোট ভাই খাজা আতিকুল্লাহও এই দাবির সাথে ঐক্যমত প্রকাশ করেন। খরচ কমাতে নবাব পরিবারের হাতি ঘোড়াও বিক্রি করে দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়না।

নবাব সলিমুল্লাহ গভীর চিন্তায় পড়েন। সেই বছরই অর্থাৎ ১৯০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি নবাব এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের পরিচালনায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, পরের বছর তিনি সহায়-সম্পত্তি বন্ধক রেখে ব্রিটিশ সরকারের নিকট থেকে ১৬ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করেন। আর সরকারকে নবাব এস্টেটের পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েও খুব বেশি লাভ হয় না। সরকারের ঋণ তাই নবাব পরিবার পুরোপুরি শোধ করতে পারে না। এমনকি এখনো ঋণমুক্ত নন, নবাব সলিমুল্লাহ। ঋণে জর্জরিত নবাব রহস্যময় মৃত্যুবরণ করেন ১৯১৫ সালে। আর তারও ছয় বছর পূর্ববঙ্গে যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের! যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নবাব সলিমুল্লাহরও ভূমিকা ছিল৷ বস্তুত, তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন পূর্ববঙ্গে শিক্ষা বিস্তারে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হোক।

যার প্রমাণ মেলে ১৯১১ সালে। সেবছর ১৯ আগস্ট কার্জন হলের এক অনু্ষ্ঠানে নওয়াব সলিমুল্লাহ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। সেইসময় মুসলিমরা উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে ছিল, বিশেষত পূর্ববঙ্গে। এর মধ্যে বাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় জলঘোলা হয়। কেউ কেউ বিরোধীতা করে। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ৩-৪ মার্চ, কলকাতায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভায় সভাপতির ভাষণে নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতাকারীদের যুক্তিখন্ডনে স্মরণীয় বক্তৃতা দেন। শুধু তাই নয়, ওই সভায় তিনি মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন এবং সরকারি চাকুরিতে তাঁদের সংখ্যানুপাতে কোটা ধার্যের দাবি জানান।

শিক্ষা বিস্তারে নবাব সলিমুল্লাহ তার পূর্বসূরীদের ন্যায় বিশেষ অবদান অক্ষুণ্ণ রাখেন। নবাব হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্তির শুরুতেই ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় এই নবাব নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেন, নবাব এস্টেটের খরচে। এছাড়া পিতার নামে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা দান করেন। ফলে যাত্রা শুরু হয়, আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ( পরবর্তীতে যা বুয়েট)। মুসলিমদের শিক্ষায় আগ্রহী করার জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালে ১৪ ও ১৫ এপ্রিল শাহবাগ বাগানবাড়িতে সম্মেলন করে “পূর্ববঙ্গ ও আসাম মুসলিম শিক্ষা সমিতি” গঠন করেন।

আলীগড় কলেজ হোস্টেলের ন্যায় ঢাকা কলেজের পাশে একটি মোহামেডান হল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়। সলিমুল্লাহ প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতির ১৯০৬ সালের সম্মেলনে হল নির্মাণে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। হলের কাজের জন্য ১,৮৬,৯০০ টাকা দানের কথা ঘোষণা করেন। ১৯১২ সালের ২১ মার্চ ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে লে. গভর্নর লর্ড বেইলী মোহামেডান হলের ভিত্তি স্থাপন করেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর হলটি এর অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯২৭ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল নির্মাণের মাধ্যমে নওয়াবের স্বপ্ন বাস্তবতা পায়।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন নবাব সলিমুল্লাহ। ১৯০৮ সালের পূর্ববঙ্গের আইন সভায় এই দাবি রাখেন তিনি। তার এই দাবি পূরণ হয় তার মৃত্যুর পর। খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকা পৌরসভার চেয়ারম্যান (১৯২২-১৯২৯) থাকাকালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতেও নবাবের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। ১৯১২ সালের ২৯ জানুয়ারী বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন। দুইদিন পর ৩১ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ১৯ জন শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নেতা নবাবের শাহবাগ বাগানবাড়ীতে বড়লাটের সাথে পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে পূর্ববঙ্গের অমর্যাদার কথা তুলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। দাবি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। নবাবের নেতৃত্বে এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বড়লাট ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিমদের জন্য বিশেষ শিক্ষা অফিসার নিয়োগের কথা ঘোষণা করেন। যদিও নবাব জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেননি তার স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তবে বহুল প্রচলিত একটি কথা যে, নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জমি দান করেছেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে শক্তিশালী কোনো প্রমাণ আমরা এখনো দেখিনি। বরং, বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় ১৯০৭ সালের পর নবাবের নিজের অবস্থাই তথৈবচ ছিল। তিনি ছিলেন ঋণে জর্জরিত একজন মানুষ। তার সম্পদ বন্ধক ছিল সরকারের কাছে। কিন্তু, পরোক্ষভাবে সরকার যে জায়গা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সেটি কি আদতে নবাবদেরই আদি সম্পত্তি নয়? বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিন এটিও ছিল নবাবদের বাগানবাড়ির অংশ। ফলে সাধারণ কমনসেন্স থেকে বোঝাই যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জায়গাগুলো একসময় নবাবদেরই আওতায় ছিল। বর্তমান বুয়েট প্রতিষ্ঠার পেছনে নবাবের সরাসরি অনুদান ছিল এটাও প্রমাণিত।

যাইহোক, গতবছর অনলাইনে বিতর্ক ওঠে। নবাব সলিমুল্লাহ যিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম একজন স্বপ্নদ্রষ্টা তাকে বিস্মরণ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তার জন্ম কিংবা মৃত্যু দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আয়োজন হয় না তার স্মরণে। এতে ক্ষুব্ধ অনেকে। আবার এর বিপরীতে একটি পক্ষ বিতর্ক ওঠানোর চেষ্টা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা আদৌ নবাব দিয়ে গিয়েছিলেন কিনা এই প্রশ্ন তুলে।

তবে, নবাব সলিমুল্লাহ শিক্ষা বিস্তারে যে ভূমিকা রেখে গেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার যতটুকু ভূমিকা শুধু এতটুকুর জন্যে হলেও তো তাকে স্মরণ করা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের সাধারণ কর্তব্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। অনেক বাঁধা পেরিয়ে পূর্ববঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। আর তারপর বাকিটা ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁকবদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কে অস্বীকার করবে? ভাষা আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতার সংগ্রাম সব কিছুতে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রত্যক্ষ অবদান। আর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে যে মানুষটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তাকে কি করে বিস্মৃত হই আমরা? নবাব সলিমুল্লাহ নিজে ঋণী, জনহিতকর কাজে অকাতরে ব্যয় করে নিজেই অর্থাভাবে ভুগেছেন। আর আমরাও কি কম ঋণী নই? সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ যারা করতে পারি না, তাদের চেয়ে বড় অকৃতজ্ঞ কে আছে? তাদের চেয়ে বড় ঋণী কে আছে?

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Back to top button