সিনেমা হলের গলি

সালেহ আহমেদ- দৃষ্টির অগোচরে থাকা এক গুণী অভিনেতা

‘ইয়াহিয়া খান ছবিত টাঙ্গাই থুইছি, প্রতিদিন একবার করে থু মারি। থু মাইরা কাঁচ টারে সাফ করি’!

হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমায় আবুল হায়াতের সঙ্গে সেই বৃদ্ধ মুদিওয়ালার কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে,যিনি স্বল্প অভিব্যক্তিতেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন উনার দেশপ্রেম। কিংবা বাংলা নাটকের ইতিহাসে সেই যুগান্তকারী ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের সেই দারোয়ান, যার মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছিলেন বাকের ভাই। তাঁর মিথ্যা খুনের দায়ে ফাঁসি হয়েছিল বাকের ভাইয়ের। মুদিওয়ালা, দারোয়ান থেকে স্কুল শিক্ষক, পুলিশ অফিসার সহ নানা চরিত্রে অভিনয় করে যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি আমাদের সবার প্রিয় অভিনেতা ‘সালেহ আহমেদ’।

‘তুমি কি প্রাইভেটে গান করো’, উড়ে যায় বকপক্ষীর ধারাবাহিক নাটকে শাওন কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমায় ছিলেন শাওনের বাবার চরিত্র, কন্যাবৎসল বাবা ছিলেন। মৃত্যুপথযাত্রী শাওন কে যখন নৌকায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন পাড়ে বসে ‘মা কুসুম’ বলে যে আর্তনাদ করেছিলেন তা সবার মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। হাবলঙ্গের বাজারে নাটকে পাগলাটে এজাজুল ইসলামের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তাঁর মুখে ‘বাবা আব্দুল মজিদ’ সংলাপটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।

Image Source: bd-bulletin.com

ছাত্রবস্থা থেকে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হলেও ছিলেন সরকারী চাকুরীজীবী। অবসর গ্রহণের পর হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের পর অভিনয়ে নিয়মিত হন। ‘অয়োময়’ তে স্বল্প ব্যপ্তির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তবে আলোচনায় আসেন ‘কোথাও কেউ নেই’ ও ‘আগুণের পরশমণি’তে অভিনয়ের পর থেকে। হুমায়ূন আহমেদের সাথেই বেশি কাজ করেছেন, ‘সবুজ ছায়া’, ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’, ‘বাদল দিনের কদম ফুল’, ‘পিশাচ মকবুল’, ‘জইতরী’, ‘বনুর গল্প’ সহ আরো অনেক নাটকে। হুমায়ূন আহমেদের বাইরে সালাউদ্দিন লাভলুরও অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন, তার মধ্যে ‘বউ’, ‘বংশে রক্ষে’ অন্যতম। রেদোয়ান রনির ‘বাইসাইকেল’ এও বিশেষ দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন। এছাড়া অভিনয় করেছেন তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’, ‘রুপকথার গল্প’ সিনেমায়।

নাটক ও সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করা এই গুণী অভিনেতা গতকাল চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। বহুদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন, কারো সাথেই সেভাবে যোগাযোগ ছিল না। বছর দুয়েক আগে চ্যানেল আই উনাকে নিয়ে প্রচ্ছদ করলে সবার দৃষ্টিগোচর হয়। এই বছরের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান পেয়েছিলেন। গত কয়েকদিন ধরেই বেশি অসুস্থ থাকায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, গতকাল দুপুর আড়াইটায় জীবনের শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন। অভিনয়ের কৃতিত্ব স্বরুপ কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান পান নি, অথচ প্রাপ্য ছিলেন।

মানুষ সালেহ আহমেদ আজ চলে গেলেন, তবে উনার শিল্পকর্ম দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবেন, তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। ওপারে ভালো থাকবেন, সালেহ আহমেদ।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button