এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

যেভাবে বুনো হাতির আক্রমণে মারা গেলেন সাইমুন কনক

ডুয়ার্স জায়গাটার নাম শুনলেই মনে আসে সমরেশ মজুমদারের উপন্যাসের কথা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ননা এই লোকটার হাতে কেমন জীবন্ত হয়ে উঠে। চোখের সামনে ভেসে উঠে ডুয়ার্সের চা বাগান, জঙ্গলের দৃশ্য। ডুয়ার্স সম্পর্কে তাই একটা কোমল অনুভূতি আছে মনের মধ্যে এমনিতেই। সেই ডুয়ার্সের জঙ্গলে জীবন্ত মানুষ আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন, এই সংবাদটা শুনে তাই মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক৷ বুনো হাতির আক্রমণে ডুয়ার্সে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশের একজন পর্যটক। ৪৩ বছর বয়সী এই পর্যটকের নাম সৈয়দ সাইমন বিন নূর।

গতকাল শুক্রবার বিকেলের দিকে প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে কয়েকজন পর্যটক ডুয়ার্সের জঙ্গলে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন৷ নাগরাকোটা থানার মূর্তি এলাকা থেকে তারা যাচ্ছিলেন খুনিয়া জঙ্গলের দিকে। এই অঞ্চলে বুনো হাতি সম্পর্কে এমনিতেই বেশ আলোচনা। কারো কারো কাছে, এইদিকটায় চিতা বাঘের চেয়েও ভয়ংকর বুনো হাতির সামনে পড়া। কিন্তু পর্যটকের কৌতুহলী মন কি আর ভয় পায়!

ডুয়ার্স, সাইমন কনক

বুনো হাতিকে সামনে পেয়ে ছবি তোলার শখ নিবারণ করতে পারলেন না তারা। গাড়ি থেকে নেমে তারা বুনো হাতির ছবি তুলতে শুরু করেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠলো। বুনো হাতির সম্পূর্ণ নজর পড়ে গেল পর্যটকদের উপর। মুহুর্তেই ভয়ংকর ঘটনাটি ঘটে গেল। বুনো হাতি আকস্মিকভাবেই আক্রমণ চালালো পর্যটকদের দিকে৷ বাংলাদেশি পর্যটক সাইমন কনককে সামনে পেয়ে তাকে বুনো হাতি শুঁড়ে পেঁচিয়ে বিকটভাবে আঁচড়ে ফেলে। মর্মান্তিকভাবে ঘটনাস্থলে মারা যান সাইমন কনক।

ডুয়ার্স বন অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই দিকে বুনো হাতির আক্রমণে গত কয়েকদিনে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সাইমনের উপর আক্রমণের ঘটনা শুনে পুলিশ, বন অধিদপ্তরের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু, ততক্ষণে সাইমনের প্রাণ নেই আর, নিথর দেহ পড়ে আছে এই পর্যটকের৷

ডুয়ার্স, সাইমন কনক

এখানে পর্যটকদের এমনিতেই সতর্কতা দেয়া হয়, কোনো অবস্থাতেই যেন তারা গাড়ি থেকে না নামেন। জঙ্গলের ভ্রমণ কখনো কখনো প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু, পর্যটকরা অনেক সময়ই সেই সতর্কতা মানতে চান না৷ তারা গাড়ি থেকে নেমে পড়েন৷ ‘যষ্মিনদেশে যদাচরণ’ বলে কথা আছে। যেখানকার যে নিয়ম। ডুয়ার্সের জঙ্গলে গিয়ে কৌতুহল সংবরণ করতে না পারার পরিণাম কি ভয়ানক হতে পারে, সেটারই উদাহরণ বোধহয় এই মর্মান্তিক মৃত্যু। এমন মৃত্যু কারো কাম্য নয়।

ডুয়ার্সের জঙ্গল ভ্রমণ তরিকা নিয়ে পরিবেশপ্রেমী সংগঠন ‘স্পোর’ পর্যটকদের সতর্ক করবার জন্য সারাবছর প্রচারণা চালায়৷ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামাপ্রসাদ পান্ডে বলেন, “এই ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। আমরা সবসময়েই জঙ্গলের মধ্যে পর্যটকদের গাড়ি থেকে নামতে নিষেধ করি। কিন্তু পর্যটকরা অনেক সময়েই আমাদের কথা শোনেন না।”

সাইমন জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির গণমাধ্যম বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার পিতাও একজন জাতীয় পর্যায়ের নেতা ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে ৮ নাম্বার সেক্টরের উপ-অধিনায়ক মরহুম নূর আলম জিকুর সন্তান এই সাইমন কনক। বন্ধুদের সাথে জলপাইগুড়ি ভ্রমণে এসেছিলেন তিনি। জঙ্গল সাফারি করাই ছিল ভ্রমণদলটির মূল উদ্দেশ্য। জঙ্গল সাফারি থেকে ফেরার পথে বনের চন্দ্রচূড় ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন জায়গায় তারা বুনো হাতির দেখা পেয়েছিলেন। কৌতুহলবশত খুব কাছ থেকে ছবি তুলতে গিয়েই ঘটে গেল মর্মান্তিক এই দূর্ঘটনা!

যাওয়ার আগে ফেসবুকে লিখেছিলেন, চললাম..নাগরিক কোলাহল থেকে বহু দূরে৷ ডুয়ার্সের পাহাড় আর জঙ্গলে। জীবন তাকে সত্যিই অনেক দূরে নিয়ে গেল!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button