Uncategorized

সাইফউদ্দিনকে নিয়ে কেন এই নোংরামি?

এবারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলারের নাম সাইফউদ্দিন। প্র‍থমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া এই তরুণ পেসার বাংলাদেশী বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল। সাধারণত পারফরম্যান্স খারাপ থাকলে মিডিয়ায় তুলোধুনো হতে হয় খেলোয়াড়দের। অথচ সাইফউদ্দিন পারফর্ম করেও অজানা কারণে চক্ষুশূল হয়েছেন একটি জাতীয় দৈনিকের। মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করে তার সততা আর দলের প্রতি আনুগত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, তাকে বানানো হয়েছে খলনায়ক!

পিঠের চোটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের ম্যাচটা খেলেননি সাইফউদ্দিন। সেই ম্যাচে হেরেছে বাংলাদেশ, আর পরদিনই কালের কণ্ঠে বিশাল এক প্রতিবেদন ছাপা হলো ‘তার চোট আরও গভীর’ শিরোনামে। সেখানে ইনিয়ে বিনিয়ে দাবী করা হলো, সাইফউদ্দিন নাকি নটিংহ্যামের পাটা উইকেটে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের মুখোমুখি হতে চাননি বলেই চোটের অজুহাতে ম্যাচটা এড়িয়ে গিয়েছেন!কালের কণ্ঠের দাবী, এর আগেও নাকি সাইফউদ্দিন এমন কাণ্ড করেছেন, ত্রিদেশীয় সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডাবলিনে দ্বিতীয় ম্যাচেও নাকি মাঠে নামতে চাননি তিনি!

কালের কণ্ঠের জনৈক সাংবাদিক সাইদুজ্জামান যেটা লিখেছেন, সেটা আপনাদের জন্যে সরাসরিই তুলে ধরা যাক, তাতে আমাদের কষ্টটা কম হয়। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে-

“বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি সাইফউদ্দিনকে মনে করেন অন্তত ১০-১২ বছর দলকে সার্ভিস দেওয়ার উপযুক্ত। বিশ্বকাপেও সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন সাইফ উদ্দিন। কিন্তু আবার ইনজুরি এবং আবারও তাঁর পিঠের ব্যথা নিয়ে গুঞ্জন দলে। ডাবলিনে তো একজন উত্তপ্ত হয়ে চেঁচাচ্ছিলেন, ‘কিসের ব্যথা? ও সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এটা করে!’ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওটায় গড়বড় হলে ফাইনালে ওঠার অঙ্ক কঠিন হতে পারত। সে রকম কিছু হয়নি। এক ম্যাচ বিরতি দিয়ে ফাইনালেও ভালো বোলিং করেছেন।

কিন্তু সাইফ উদ্দিনের পিঠের ব্যথা নিয়ে সংশয় আর যায়নি। উল্টো কার্ডিফে ভারতের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের একটি ঘটনা তিক্ততা ছড়িয়েছে দলের লিডারশিপ গ্রুপের মাঝে। সে ম্যাচে মাশরাফি বিন মর্তুজা একরকম বিশ্রামে। ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা তখন যাঁকে পাচ্ছে, তাঁকেই মারছে। তো, ওরকম একটা অগ্নিগর্ভ অবস্থায় মাঠের নেতা সাকিব আল হাসান বোলিংয়ে ডাকেন সাইফ উদ্দিনকে। কিন্তু তিনি নাকি বল মাটিতে আছড়ে ফেলে অ্যাটিচ্যুড দেখিয়েছিলেন, যা একেবারেই মনঃপূত হয়নি মুশফিকুর রহিমের। সাইফ উদ্দিনের ভাগ্য ভালো দৃশ্যটি চোখে পড়েনি সাকিবের। পরবর্তীতে অবশ্য শুনেছেন সতীর্থদের কাছে। শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি সাকিব।”

প্রতিবেদনের শেষদিকে আরও লেখা হয়েছে- ……হাঁটুতে সাতটা অস্ত্রোপচার করিয়েও খেলে যাচ্ছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা, প্রতিপক্ষ কিংবা কন্ডিশন বিবেচনা করেন না। সাকিব, তামিম ইকবাল কিংবা মুশফিকুর রহিমরা ছোটখাটো ইনজুরি নিয়েও খেলে ফেলেন। সেখানে কিনা সাইফ উদ্দিন… যাঁকে আগামীর অবশ্যম্ভাবী তারকা মনে করছেন মাশরাফি!

কার্ডিফে ভারত-বাংলাদেশের প্রস্ততি ম্যাচের সেই ঘটনায় যাওয়া যাক। ম্যাচটা লাইভ টেলিকাস্ট করা হয়েছে, টেলিভিশনের পর্দায় সবাই দেখেছে প্রতিটা মূহুর্ত, অজস্র ক্যামেরা মজুদ ছিল চারপাশে। এসবের ভীড়ে কখন সাইফউদ্দিন বল মাটিতে আছড়ে ফেললেন, যেটা ক্যামেরা ধরতে পারলো না, মাঠে থাকা দর্শকের চোখ ধরতে পারলো না, কমেন্ট্রিবক্সে বসা ধারাভাষ্যকার কিংবা প্রেসবক্সে থাকা সাংবাদিকদের কারো চোখে পড়লো না, শুধু সাইদউজ্জামান সাহেবই এটা দেখে ফেললেন! কিভাবে ঘটলো এউ বিরল ঘটনা? কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের দুই চোখের মাঝখানটায় কি কোন তৃতীয় নয়ন আছে?

প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের মার খাওয়ার ভয়ে জাতীয় দলের একজন বোলার বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে মাঠে নামতে চাইছেন না, এই গাঁজাখুরি গল্পটা কি বিশ্বাস করার মতো? সস্তার ভাং খেয়েই এমন রূপকথার গল্প রচনা করা যায়। গাঁজার নৌকা পাহাড়তলী যায় বলে শুনেছিলাম, বিলেত পর্যন্তও যে সেটা চলে গেছে, জানা ছিল না।

সাইফউদ্দিনের পক্ষ নিয়ে তার এক সতীর্থই বলেছেন, “মার খাওয়ার ভয় ওর মধ্যে যদি এতই কাজ করবে, তাহলে তো ২০১৭ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ডেভিড মিলারের কাছে এক ওভারে ৫ ছক্কা খাওয়ার পরই ও খেলা ছেড়ে দিত! এর পর সে নিজের বোলিং নিয়ে অনেক কাজ করেছে, অনেক উন্নতি করেছে বলেই তো বিশ্বকাপ খেলছে। এখন পর্যন্ত সে দলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি।”

আমাদের কথাও সেটাই। দলে নতুন আসা একটা বোলারকে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন মিলার, সাইফউদ্দিন যদি এতই ভীতু হয়ে থাকবেন, সেই ম্যাচটার পর তো তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলারই কথা নয়। তিনি তো খেলছেন বহাল তবিয়তে, ভালো পারফর্ম করে বিশ্বকাপের বিমানে উঠেছেন, এখানে এসেও এখনও পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী তিনি। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে মাঠে না নামায় তাকে নিয়ে এমন নোংরামি কেন হবে?

প্রথম আলো’র প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, সাইফউদ্দিন পিঠের চোট বয়ে বেড়াচ্ছেন বিশ্বকাপের শুরু থেকেই। ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে খেলা নিয়ে ছিল সংশয়। ম্যাচের আগের দুদিন ঠিকমতো অনুশীলনই করতে পারেননি। সাইফউদ্দিন এ ম্যাচ খেলতে পারবেন না- এটাই ধরে নিয়েছিলেন সবাই। অথচ অবাক করে ম্যাচটা তিনি খেলেছেন। ৫৭ রানে ২ উইকেট পেয়েছেন। পরে জানা গেল, ইনজেকশন নিয়ে ম্যাচটা খেলেছেন সাইফউদ্দিন।

শতভাগ ফিট না হয়েও সাইফউদ্দিন বিশ্বকাপে নিজেদের পরের তিনটি ম্যাচেও খেলেছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে তাকে আবারও ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ইনজেকশন দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলেছেন। সেটির রেশ না কাটতেই আবারও ইনজেকশন দিতে আপত্তি ছিল সাইফউদ্দিনের। তার মনে হয়েছে, ২০ দিনের মধ্যে আবারও ইনজেকশন দিলে একটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবেন ।

বিশ্বকাপে এসে সাইফউদ্দিন পিঠে চোট পেলেও আগে থেকেই তিনি টেনিস এলবোর সমস্যায় ভুগছিলেন। নিউজিল্যান্ড সফর থেকে ফেরার পর ফিজিওর পরামর্শে আরও কয়েকজন ক্রিকেটারের মতো তাকেও দুই সপ্তাহের ছুটি দিয়েছিলেন কোচ স্টিভ রোডস। ছুটি কাটাতে সাইফউদ্দিন চলে গিয়েছিলেন ফেনীর নিজ বাড়িতে। কিন্তু সেখানে দুই দিন না থাকতেই ঢাকা থেকে জরুরি তলব। আবাহনীর হয়ে প্রিমিয়ার টি-টোয়েন্টি খেলতে ফিরে আসতে হয় ঢাকায়। প্রায় বিরতিহীনভাবে খেলতে হয়েছে প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগেও।

বিশ্বকাপ মিশনে রওনা দেওয়ার আগে জানা গিয়েছিল, বোলিং-ব্যাটিংয়ে সমস্যা না হলেও দূর থেকে থ্রো করতে পারছেন না। সাইফউদ্দিন। সেকারণে লিগের খেলায় নিয়মিত ৩০ গজের ভেতরে ফিল্ডিং করে গেছেন। এখন সাইফউদ্দিনের চোট নিয়ে এত কথা হচ্ছে, কালের কণ্ঠের মতো পত্রিকা মনের মাধুরী মিশয়ে গাঁজাখুরি প্রতিবেদন বানাচ্ছে, তাহলে আবাহনীর হয়ে খেলার সময় কেন তাঁকে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়নি? যে দলের হয়ে চোট নিয়ে লিগ খেলে গেছেন, সেই দলের কোচ কিন্ত খালেদ মাহমুদ সুজন, যিনি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার। বাংলাদেশ দলনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ছিলেন আবাহনীতে সাইফউদ্দিনের সতীর্থ। তারা কেউই কি এই ব্যাপারটা খেয়াল করেননি? নাকি সবার কাছেই ক্লাবের স্বার্থই বড়?

কোড অফ কন্ডাক্টের বিধিনিষেধ থাকায় সাইফউদ্দিন কিছু বলতে পারছেন না, কিন্ত তার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নিতে কষ্ট হয় না যে তিনি ভালো নেই। আজ বাংলাদেশের কোচ স্টিভ রোডসও মুখ খুলেছেন সাইফউদ্দিনকে এভাবে টার্গেট বানানো হচ্ছে দেখে। রোডস বলেছেন, ‘কোনো ক্রিকেটারের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া উচিত। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে সে বল করতে পারছিল না। বল করতে পারছে না এমন বোলারকে নিশ্চয় আপনি খেলাতে পারবেন না।’

বাংলাদেশ দলে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিস্কার করার ব্যাপারে কালের কণ্ঠের ভূমিকা কিন্ত এই প্রথম নয়। ২০১১ বিশ্বকাপে মাশিরাফিকে যখন দলে রাখা হলো না, তখন সেটাকে তারা তৎকালীন অধিনায়ক সাকিবের ইচ্ছে হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিল। মাশরাফি বনাম সাকিবের দ্বন্দ্ব টাইপের একটা অদ্ভুত থিওরির উদ্ভাবন করেছিল এই পত্রিকাটাই। সেই তারাই আবার সাইফউদ্দিনের পেছনে লেগেছে, কোন স্বার্থে তারাই ভালো বলতে পারবে। সাইফউদ্দিন কবে কালের কণ্ঠের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিলেন, কে জানে!

সাংবাদিকেরা চাইলেই তিলকে তাল বানাতে পারেন, চিনিকে লবন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। কিন্ত একজন সৎ সাংবাদিকের কাজ সেটা নয়। তিনি তথ্যপ্রমাণ সহকারে বস্তুনিষ্ঠ খবরটাই জাতির সামনে তুলে ধরবেন, যদি-তবে-কিন্ত-নাকি টাইপের ফালতু শব্দ ব্যবহার করে একটা গাঁজাখুরি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করাটা সাংবাদিকের কাজ নয়। যারা এরকমটা করে, এদেরকে সাংবাদিক বলে না, বলে সাংঘাতিক।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button