খেলা ও ধুলা

সাকিব আল হাসান দ্য সেভিয়র!

এরকমটা সাকিব আল হাসান তার ক্যারিয়ারজুড়ে অনেকবার করেছেন। দল ব্যাকফুটে, কিন্তু আছেন একজন সাকিব। দলকে জিততে হলে জাদুকরি কিছু করতে হবে, সেখানেও আপনি সাকিবের কন্ট্রিবিউশান দেখবেন। একটা ব্রেকথ্রু দরকার, অগণিত ম্যাচ এমন হয়েছে যেখানে সাকিবের বলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে দলকে। সাকিব এমন একজন খেলোয়াড় যিনি দলে থাকা মানে আপনি কিছু না কিছু তার থেকে পাবেনই।

তবুও সাকিব তো মানুষ, তারও খারাপ সময় যায়। ফর্ম খারাপ হয়, সব দিন তার হয় না। সব দিন তার পারফর্মেন্স হয়ত ম্যাচও জেতায় না। সাকিব তবুও বোধহয় দলের একমাত্র খেলোয়াড় যিনি অভিষেকের কাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজের একটা স্ট্যান্ডার্ড রেখে পারফর্ম করে গেছেন। তারপরেও দলের যে খেলোয়াড়দের নিয়ে বাইরে তুমুল সমালোচনা হয়, তীক্ষ্ণ আক্রমণ হয়, ঘৃণার চাষ হয় তাদের মধ্যে একজন বোধহয় সাকিব। এই লোকটা আমাদের ক্রিকেটের ভীষণরকম এক বৈচিত্র্যময় চরিত্র। যিনি কারো কাছে বেয়াদব, কারো কাছে একরোখা। যিনি নিজের মতো চলেন, নিজের মতো করে ভাবতে পছন্দ করেন। তাই ক্রিকেটীয় বিষয়ের বাইরেও তাকে নিয়ে সমালোচনা হয়।

কিন্তু, দিনশেষে ক্রিকেটীয় বিচারে সাকিব এখনো বাংলাদেশের সেরা পারফর্মার। কিন্তু বিশ্বকাপে সাকিবের বলার মতো পারফর্মেন্স নেই বলে বিশ্ব ক্রিকেট এখনো তাকে প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে চায় না এমন একটা কথা শোনা যায়। গত বিশ্বকাপে মাহমুদউল্লাহ যেমন জোড়া সেঞ্চুরি করে বিশ্ব ক্রিকেটে বেশ সমীহ আদায় করে নিয়েছিলেন, এরকম পারফর্মেন্স সাকিব আল হাসান থেকেও আশা করে অনেকে। আর এই বিশ্বকাপে সাকিব যেন নিজেকে বিশ্বের কাছে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার মিশনে নেমেছেন। তার যেন অনেক কথা বলার আছে। কথাটা বলবেন তিনি মাঠে, শরীরী ভাষায়, ব্যাটে বলে।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো দিনটার কথা মনে করে দেখুন। এমন সাকিবকে নিয়ে খোদ তার সমালোচকরাও হয়ত শব্দহীনতায় ভুগেছেন, বলার কিছু রেখেছেন নাকি! ব্যাট হাতে ৭৫ রানের সলিড ইনিংস, বল হাতে মার্করামের উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্যা ম্যাচটা নিজের করে নিয়েছেন। তার চেয়ে বেশি চোখে পড়েছে মাঠে তার এটিচিউড, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। তিনি যেন প্রতিটা মুহুর্ত চুটিয়ে উপভোগ করছেন, খেলাটাকে আত্মীকরণ করেছেন। কথা বলছেন বোলারদের সাথে, ফিল্ডিং সেটেও পরামর্শ দিচ্ছেন। ড্রিংক্স ব্রেকে নিজের মতামত দিচ্ছেন। বোঝা যাচ্ছিলো এই বিশ্বকাপে তিনি বিশেষ কিছু করতেই এসেছেন, এসেছেন বড় লক্ষ্য নিয়ে।

দ্বিতীয় ম্যাচ, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ব্যাটিং দুর্দশার এই দিনে সাকিব ছিলেন উজ্জ্বল। করেছিলেন ৬৪ রান। ২৪৪ রানের পুঁজি নিয়ে বাংলাদেশ যে লড়াই করেছিল, তা সম্ভব হয়েছে সাকিবের আর্লি ব্রেক থ্রু পাওয়াতে। তিনি এই ম্যাচে জোড়া উইকেট নিয়েছিলেন, গাপটিল, মুনরোর মতো খেলোয়াড়কে হটিয়ে নিউজিল্যান্ডকে রয়ে সয়ে খেলতে বাধ্য করেছেন। কেন উইলিয়ামসন মুশফিকের ভুলে রান আউট থেকে বেঁচে না গেলে হয়ত ম্যাচের মোড় ঘুরে যেত, দিনটা হতো পুরোপুরি বাংলাদেশের। কিন্তু, ওই রানআউট মিসের পরেও দল মনোবল হারায়নি। সাকিবকে দেখে মনে হয়েছিল হাল ছাড়বেন না তিনি।

Image source – Telegraph Cricket

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বোলিং ইউনিটের দূর্বলতা বড় হয়ে ধরা দিলো। বিশাল স্কোর গড়ে ফেললো ইংল্যান্ড। সাকিব এদিন উইকেট পাননি। কিন্তু শুরুতে একটা উইকেটের আশায় সাকিবকে দিয়ে ৭ ওভার বল করিয়েছেন অধিনায়ক। সাকিব কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু, ইংল্যান্ড একটু বেশিই ভাল সামলেছে সাকিবকে। ৩৮৭ রানের পাহাড়সম লক্ষের সামনে বাংলাদেশ কি করতে পারে? প্রাথমিক যুক্তিযুক্ত লক্ষ্য হয়ত ইংল্যান্ডের যতটুকু কাছে যাওয়া যায়, ব্যবধান যত কমানো যায়। সৌম্য তামিম যেখানে আউট হয়ে ফিরে গেলেন, সেখানে আবারো সাকিবই ত্রাতা। তিনি ডিফেন্সিভ হলেন না, অতিরিক্ত আক্রমণাত্মকও নয়। তার স্বভাবসুলভ ক্রিকেট খেলেছেন। মুশফিকের সাথে তাই আবারো শতরানের একটা জুটি গড়লেন সাকিব।

আর এরই সাথে টানা তিন ফিফটি এই বিশ্বকাপে সাকিবের, একই সাথে সর্বোচ্চ রান স্কোরারের তালিকায় সাকিব সবাইকে ছাড়িয়ে সবার উপরে। মুশফিক ফিরে গেলেন, তার পিছনে পথ ধরলেন মিথুনও। কিন্তু সাকিব ওই যে এক মানসিকতা নিয়ে খেলতে এসেছেন বিশ্বকাপে, হার না সেই মানসিকতার জোর দেখিয়ে তিনি ব্যাটিং করে যাচ্ছেন। মারার বলগুলো মারছেন, বাউন্ডারি আসছে, দেখে মনে হচ্ছে কি সহজই না ব্যাটিং করা। কিন্তু, অন্যরা যেখানে ধুঁকছে সেখানে সাকিব সাবলীল। কারণটা বোধহয় মানসিকতায়।

image source – ICC Cricket World Cup Twitter

এই লেখা লিখতে লিখতেই চিৎকার করে উঠতে হলো। তালি না দিয়ে উপায় নেই। সাকিব এই ম্যাচে আমাদের চিয়ার করার জন্য উপলক্ষ তৈরি করলেন। ফিফটিটাকে টেনে সেঞ্চুরি করলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের মঞ্চে শতরান, এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের ব্যাট থেকে! টেক আ বো ম্যান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গণ এবার হয়ত সাকিব বন্দনা করবে, প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানাবে না। সাকিবের মানসিকতাটা কপি করলে দল হিসেবেও বিশ্বমঞ্চে আমাদের অবস্থান নিশ্চয়ই আমরা প্রমাণ করতে পারব। সেজন্যে কি করা উচিত তা হাতে কলমে শিখিয়েই দিয়ে যাচ্ছেন সাকিব আল হাসান, দ্য সেভিয়র।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button