মতামত

মনের পাপ কোরবান দিয়ে শুদ্ধতা আসুক মানব হৃদয়ে…

“তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি কর”।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যখন স্বপ্নে এই নির্দেশ পেলেন, তিনি তখন প্রথমদিনে ১০টি উট কোরবানি করলেন। পুনরায় একই স্বপ্ন দেখে ১০০টি উট কোরবানি করেন। এরপরেও একই স্বপ্ন দেখে বুঝলেন, প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) ছাড়া আর কোনো প্রিয় বস্তু নেই। এরপর অারাফাত ময়দানে গিয়ে পুত্রকে কোরবানি দেয়ার জন্য গলদেশে ছুরি চালালেন। অাল্লাহ তার ওপর খুশি হলেন। ছেলের বদলে পশু কোরবানি হয়ে যায়। ‌সেই থেকে শুরু হলো কোরবানি প্রথা।

আমরা সবাই কম বেশি এই ইতিহাস জানি। তারপরেও লিখলাম। আপনারা হয়তো জানেন, কোরবানি’ শব্দটি আরবি ‘কোরবান’ শব্দ থেকে আগত। যার অর্থ উৎসর্গ করা। আত্মত্যাগ করা। কোরবানি মানে হলো, আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বিনম্র প্রকাশ। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়,অাত্মত্যাগের বদলে আমাদের কোরবানি শুধুমাত্র পশু জবাইতে এসে ঠেকেছে।

নয়তো একদিনে লাখ লাখ গরু ছাগল জবাইয়ের পরেও আমরা কেন আমাদের লোভ, পাপ, হিংসা, ক্রোধ, ঘুষ দুর্নীতি, কোরবানি দিতে পারি না? কেন কোরবানির আগে পরে ঘুষ দুর্নীতি সব একই থাকে? তার মানে হলো আমরা আমাদের মনের ভেতরের পাপগুলোকে কোরবানি দিতে পারছি না।

আপনরা আমার সাথে ভিন্নতা পোষণ করতে পারেন, কিন্তু আমার বারবার মনে হয়, আমাদের কুরবানী আজ লোক দেখানো উৎসব হয়ে গেছে। কে কত বেশি দামের গরু কুরবানী দিলাম, কোন পশুর দাম কতো, এসবে আমাদের যতো আগ্রহ, যতো আগ্রহ মাংস খাওয়ায়, ততো আগ্রহ কিন্তু হালাল রোজগারে নয়। আত্মত্যাগে নয় আল্লার সন্তুষ্টি অর্জনে নয়। ফলে মোটাতাজা জন্তু জবাইয়ের মহড়া আর মাংস দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করার এক উৎসব হয়ে গেছে কোরবানি।

আচ্ছা আপনারা বলেন তো গরুর দামে যতো আগ্রহ, কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় মাংস রাখবো সেই ব্যাপারে যতো আগ্রহ আলোচনা, তার কিয়দাংশ আলোচনাও কী আছে হালাল আয় নিয়ে? আমি খুব বিস্ময় নিয়ে ভাবি, লাখ লাখ গরু ছাগল কোরবানি হয়। কিন্তু কতোজন আছি আমরা যারা আসলেই মনের ভেতরের সব পাপকে কোরবানি দেই। ঘুষ দুর্নীতির শীর্ষে থাকা এই দেশের লোকজনের গরু ছাগল কেনা অার কোরবানিতে যতো আগ্রহ, হারাম পন্থায় উপার্জন বন্ধে ততোটাই কম আগ্রহ।

অথচ সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারি বা অন্য কোনো হারাম পন্থায় উপার্জিত সম্পদ অায় করলে যে কুরবানি হয় না।

আমি কোন এক আলেমের লেখায় পড়েছি, যদি কেউ এক লাখ টাকা দিয়ে একটি পশু কুরবানী দেয়, আর তাতে যদি ১টি টাকাও হারাম থাকে তাহলে পুরো কুরবানীই বাতিল হয়ে যাবে। অনুরূপ ৭ জনে মিলে কুরবানী দিলো তার মধ্যে ১ জনের টাকা যদি হারাম হয় তাহলে ৭ জনের কুরবানীই বাতিল হয়ে যাবে।

এর মানে কী? এর মানে হলো কোরবানির চেয়েও হালাল আয় বেশি জরুরী। আপনারা যারা ঘুষ খান, অবৈধ টাকা আয় করেন তারা তারা কী জানেন হারাম অর্থ দিয়ে ইবাদত শুদ্ধ নয়। এমনকি হারাম অর্থের দ্বারা সওয়াবের আশা করাও গুনাহর কাজ। যারা বড় বড় লাখ টাকার গরু কোরবানি দেন তারা নিশ্চয়ই সূরা আল-হজ্জ এর ৩৭ নম্বর অায়াতটা জানেন যার অর্থ, ‘এই পশুগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছে না। তাঁর কাছে পৌঁছে মনের তাকওয়া।’

না আমি ইসলামি পণ্ডিত নই। তারা নিশ্চয়ই ভালো বলতে পারবেন। আমি আমার সাধারণ জ্ঞানের কথাগুলো বললাম। আমি নিজে কখনো মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করি না। ঘুষ দুর্নীতিতে নেই। হালাল টাকায় কোরবানি দেই। আমি চাই আমার মতো, করে সবাই সততার কথা বলবে।দেশ থেকে ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ হবে। অামাদের ভেতরের যে লোভ, ক্রোধ সেগুলো শেষ হবে। সবাই মিলে আমরা সুন্দরভাকে বাঁচবো। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথায় বলি, মনের পশুরে কর জবাই/পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই’। সবাইকে ঈদ মোবারক।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button