খেলা ও ধুলা

শচীন টেণ্ডুলকার- ব্যাটিং ঈশ্বরের কথকতা!

করাচী, পাকিস্তান, সাল ১৯৮৯।

ভারতের হয়ে বছর ষোলো’র এক কিশোর দুরুদুরু বুকে নামছেন ব্যাট হাতে। কৈশরের কোমল আভাটুকু এখনও গাল থেকে মোছেনি তার। বোম্বেতে জন্ম, ক্রিকেটটাকে ধ্যানজ্ঞান বানিয়েছেন একদম শৈশব থেকেই, ক্রিকেটেই গড়েছেন বসতি। সেটারই পুরস্কার হিসেবে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন এই অল্প বয়সেই।

আরেক অভিষিক্ত বোলার ওয়াকার ইউনিস তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন বাউন্সারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যে ফুলশয্যার বিছানা নয়, সেটা তিনি জেনে গিয়েছিলেন এখানে পা রেখেই। খুব আহামরি কিছু করতে পারেননি, ড্র হওয়া টেস্টটায় একটা ইনিংসে ব্যাট হাতে নেয়ার সুযোগ হয়েছিল, ওয়াকারের ইয়র্কারেই স্ট্যাম্প ভেঙেছিল তার, স্কোরবোর্ডে নামের পাশে তখন পনেরোটা রান মোটে!

কে ভেবেছিল, সেই ছেলেটা ক্যারিয়ার শেষ করবে চৌত্রিশ হাজারের বেশী আন্তর্জাতিক রান আর একশোটা ইন্টারন্যাশনাল সেঞ্চুরী নিয়ে? কোন জ্যোতিষি কি জানতেন, সেই বিস্ময়বালক শচীন রমেশ টেণ্ডুলকারের নামের পাশে ‘ব্যাটিং ঈশ্বর’ উপাধিটা যোগ হবে অনেকগুলো বছর পরে?

বাবা ছিলেন লেখক, গানের ভক্ত ছিলেন খুব, শচীন দেব বর্মণ ছিলেন তার প্রিয় শিল্পী। তাঁর নামের সঙ্গে মিলিয়েই ছেলের নাম রাখলেন। ছোট্ট শচীনকে খেলার স্বাধীনতাটা পুরোপুরিই দিয়েছিলেন বাবা, হয়তো ছেলের চোখের কোণে কোথাও ছাইচাপা আগুনের ফুলকি নজরে পড়েছিল তার। টেনিস খেলায় খুব আগ্রহ ছিল, কিন্ত বড়ভাই অজিতকে দেখতেন টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতে। অজিত খুব উৎসাহ দিতেন ছোট ভাইকে, ক্লান্তিহীন ভাবে সারাদিন বোলিং করতেন ভাইয়ের জন্যে। আর ছোট্ট ব্যাট আঁকড়ে ধরে শটের ফুলঝুরি ছোটাতেন শচীন।

শচীন টেন্ডুলকার, শচীনের বিদায়, ব্যাটিং ঈশ্বর, ভারতীয় ক্রিকেট, শততম সেঞ্চুরী

অজিতই তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন রমাকান্ত আচরেকারের কাছে, শচীনের প্রথম কোচ তিনি। ছেলেটার দুর্দান্ত প্রতিভা চোখ এড়ায়নি পাকা জহুরী রমাকান্তের, জানতেন, ঠিকঠাক ঘষামাজা করা গেলে হীরে হয়ে বেরুবে এই ছেলে। অথচ শচীন কিনা ফাস্ট বোলার হতে চেয়েছিলেন! ডেনিস লিলির ক্যাম্পেও যোগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্ত উচ্চতার কারণে ব্যাটিংটাকেই বেছে নিতে বলা হয়েছিল তাকে। সেটা এমনিতেই ভালো পারতেন তিনি। কতটা ভালো? নেটে ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাটিং প্র‍্যাকটিস করতেন শচীন, নাওয়া-খাওয়া সব ভুলে। প্র‍্যাকটিসে ওকে আউট করাটা বোলারদের জন্যে মহার্ঘ্য বস্তু ছিল তখনও। রমাকান্ত একটা পয়সা রেখে দিতেন স্ট্যাম্পের ওপর, শচীনকে যে আউট করতে পারবে, এটা ছিল তার পুরস্কার!

স্কুল ক্রিকেটে বিনোদ কাম্বলীর সঙ্গে বিশ্বরেকর্ড গড়া জুটিতে শচীন জানান দিলেন, তিনি আসছেন। অভিষেক সিরিজে ওয়াকার-ওয়াসিম-ইমরান খানের তোপের মুখে দাঁড়িয়ে থেকে শচীন জানান দেন, তিনি এসে গেছেন। বলের আঘাতে রক্তাক্ত নাক নিয়ে পাকিস্তানের ভয়ঙ্কর পেস আক্রমণের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়ে শচীন ক্রিকেট বিশ্বকে বার্তা দেন, তিনি জয় করতে এসেছেন, চেহারা দেখাতে নয়!

নিরানব্বই বিশ্বকাপ, ক্রিকেট তার সবটুকু রোমাঞ্চ নিয়ে ফিরেছে জন্মভূমিতে। সেই মিলনমেলায় যোগ দিয়েছেন শচীনও, সেরাদের কাতারেই তার নাম। হঠাৎ করেই তাকে চড়তে হলো দেশের বিমানে, বাবা মারা গেছেন, শেষকৃত্যে যেতে হবে! সেই বাবা, যার কারণে ক্রিকেট শচীনকে পেয়েছে, শচীন ক্রিকেটকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। যিনি শচীনের স্বপ্নটা ধরতে পেরেছিলেন। যে বাবা মাত্র এগারো বছর বয়েসী শচীনকে বলেছিলেন, নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে!

সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানকে ছাড়া বিশ্বকাপ জমবে? না, শচীন ফিরে আসেন। কেনিয়ার বিপক্ষে গ্রুপপর্বের ম্যাচ, তিনি মাঠে নামেন বাবাকে হারানোর শোক বুকে চেপে, ভগ্ন হৃদয়ের আর্তনাদ তার ব্যাটে ফুটে ওঠে না, সেখানে শুধুই নিষ্ঠুর নিষ্পেষণ! শচীন পৌঁছে যান তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে। ব্যাটটা তুলে ধরে আকাশের পানে তাকান তিনি, খুঁজে ফেরেন কাউকে, না বলা অনেক কথা, অনেক অভিযোগ জমে আছে বুকে, বাবার সঙ্গে সেসব ভাগাভাগি করতে খুব ইচ্ছে হয় তার। মানুষ মারা গেলে নাকি তারা হয়ে যায়, বাবা কি লুকিয়ে আছেন ওই আকাশের অযুত-নিযুত তারাদের ভীড়ে?

শচীন টেন্ডুলকার, শচীনের বিদায়, ব্যাটিং ঈশ্বর, ভারতীয় ক্রিকেট, শততম সেঞ্চুরী

বাবা রমেশ টেণ্ডুলকারকে শচীন খুঁজে ফেরেন আরও অনেকবার। গ্যালারীর দর্শক, টিভি পর্দার সামনে বসে থাকা কোটি মানুষ সাক্ষী হয়ে থাকেন সেসব দৃশ্যের। শচীন তাঁর বাবাকে খোঁজেন প্রতিটা সেঞ্চুরীর পরে, ঢাকা, কলকাতা, শারজা, জোহানেসবার্গ কিংবা ওল্ড-ট্রাফোর্ড, ক্রাইস্টচার্চ, পোর্ট অব স্পেন অথবা সিডনি- বাদ যায় না ক্রিকেটের পূণ্যভূমিগুলোর কোনটি। মিরপুরে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরী করে শচীন তাঁর শতকের সংখ্যাকেই নিয়ে যান তিন অঙ্কে! স্কয়ার লেগ দিয়ে বলকে সীমানাছাড়া করার পর সেই চিরপরিচিত দৃশ্যের অবতারনা- বাবার উদ্দেশ্যে ব্যাট তুলছেন ‘গড অব ক্রিকেট’!

এর মাঝে গঙ্গা-পদ্মায় বয়ে গেছে কত জল, পেরিয়ে গেছে কত সময়! শচীন শুধু ক্যালেন্ডারের দিনবদলের সঙ্গে রেকর্ডবুকে নিজের অধ্যায়টা সমৃদ্ধই করেছেন, অর্জন করে নিয়েছেন প্রতিপক্ষের সমীহ আর শ্রদ্ধা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওদের বিপক্ষে রানের পসরা সাজান শচীন, স্বাগতিক দর্শকেরা দাঁড়িয়ে তালি দেয় তাঁকে মাঠে নামতে দেখে! দেশের মাটিতে ‘শচীন…শচীন’ চিৎকার তো অন্যরকম একটা আবহই তৈরী করেছিল ক্রিকেট দুনিয়ায়! বিদায়বেলায় যেটা তিনি সবচেয়ে বেশী মিস করবেন!

২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের অধরা স্বাদ পেয়েছেন, ভারতের নীল জার্সি গায়ে জড়িয়ে সোনালী ট্রফিটা হাতে তুলেছেন তিনি। বিরাট কোহলিরা তাঁকে কাঁধে তুলে চক্কর দিয়েছে পুরো ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম। কোহলি পরে বলেছেন, পুরো ভারতকে যিনি দুইযুগ ধরে নিজের কাঁধে চড়িয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তাকে কয়েকটা মিনিটের জন্যে নিজেদের কাঁধে বইতে পারা তো সৌভাগ্যের ব্যপার!

২০১৩ সাল, আরও একবার মঞ্চ প্রস্তত মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। তবে এবার বিদায়ের রাগিনী। শচীন তার ক্যারিয়ারের দুইশোতম টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামছেন, ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টও এটাই। বিদায় বলছেন শচীন, ব্যাট-প্যাড গুছিয়ে রাখছেন ক্রিকেটের সঙ্গে চব্বিশ বছরের মিষ্টি-মধুর সংসার শেষে। ঘরের ছেলের বিদায়ের ক্ষণে সাক্ষী হতে টিকেটের কাড়াকাড়ি মুম্বাইজুড়ে, বাঘা বাঘা সেলিব্রেটিরা ক্রিকেটবোর্ডে পরিচিতজনদের ফোন দিয়ে বেড়াচ্ছেন, যে করেই হোক, ওয়াংখেড়ের এন্ট্রি পাস চাই তাদের!

সেঞ্চুরী থেকে শচীনের দূরত্ব তখন ছাব্বিশ রানের। দেওনারাইনের বলটা তার ব্যাটের কানায় লেগে গন্তব্য খুঁজে নিলো স্লিপে। সেখানে দাঁড়ানো ড্যারেন স্যামি ভুল করলেন না সেটাকে তালুবন্দী করতে। এতক্ষণ গর্জন করতে থাকা পুরো ওয়াংখেড়ে এখন শ্মশ্মানের মতোই নীরব! যেন কোনদিন পৃথিবীর বুকে শব্দ বলে কিছু ছিল না! শচীন আকাশের দিকে তাকান না, আজ আর তিনি তারা হয়ে যাওয়া বাবাকে খোঁজার চেষ্টা করেন না। প্যাভিলিয়নে মা বসে আছেন। অঞ্জলী আছে, আছে ছেলে-মেয়েরাও। শচীন ওদের কাছে ফিরে আসেন। ক্রিকেটকে ভালোবাসতে গিয়ে চব্বিশটা বছর ওদেরকে সময় দেয়া হয়নি একদম, আজ থেকে শচীনের সবকিছু, প্রতিটা ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড ওদের জন্যে বরাদ্দ! মাঠ থেকে ড্রেসিংরুমের পথটা কি সেদিন বড্ড দীর্ঘ মনে হয়েছিল তাঁর কাছে? শচীনই ভালো জানেন!

শচীন টেন্ডুলকার, শচীনের বিদায়, ব্যাটিং ঈশ্বর, ভারতীয় ক্রিকেট, শততম সেঞ্চুরী

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভঙ্গুর দশার কারণে শচীনের আরেকবার ব্যাট হাতে নামা হয় না সেই টেস্টে, মহেন্দ্র সিং ধোনি দর্শকদের মনের কথা পড়তে পারেন, তিনি বল তুলে দেন শচীনের হাতে। তাতেও শেষরক্ষা হয় না, ম্যাচ শেষ তিনদিনেই। মোহাম্মদ শামি’র বলে শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের স্ট্যাম্প ভাঙতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অতীত হয়ে গেলেন শচীন টেণ্ডুলকার! ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে বড় বড় হরফে লেখা ভেসে উঠলো- ‘লিজেন্ডস নেভার রিটায়ার’। গার্ড অব অনার দিয়ে তাঁকে মাঠ থেকে বের করে আনলেন সতীর্থরা। আরও একবার তাদের কাঁধে চড়লেন ব্যাটিং ঈশ্বর।

শচীনের চোখে তখন জল। জল ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেই মানুষগুলোর চোখেও, যারা খেলাটাকে ভালোবেসেছিলেন। গ্যালারীতে সেই পুরনো সুর, হাজার হাজার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই নাম- ‘শচীন…শচীন!’ খানিক পরে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ফেয়ারওয়েল স্পিচ দেবেন তিনি, কাগজে করে লিখে এনেছেন সবার নামধাম। ক্যারিয়ারজুড়ে যাদের অবদানে আজকের শচীন হয়ে উঠেছেন, তাদের কাউকে বাদ দিতে চাননা তিনি। তাঁর বক্তব্যে বাবা আছেন, অঞ্জলী আছে, রমকান্ত আচারেকার আছেন, আছেন দর্শকেরাও, যারা এতগুলো বছর নিঃস্বার্থভাবে সমর্থন দিয়ে এসেছেন তাঁকে।

আটাশ বছর আগের নভেম্বরের এক কুয়াশাভেজা সকালে বিশ্বজয়ের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল, থেমেছে বছর পাঁচেক আগে, সেটাও ষোলোই নভেম্বরেই। শচীন টেণ্ডুলকার- ক্রিকেটের রেকর্ডবুকের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অধ্যায়টার নাম, শতকোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে যিনি ব্যাট হাতে ছিলেন আস্থা আর ভরসার এক অবিচল প্রতিমূর্তি। ভারতে ক্রিকেট একটা ধর্ম, আর তিনি ছিলেন সেই ধর্মের দেবতা। বাকীদের জন্যে সফলতার অন্যরকম একটা মাত্রা বেঁধে দিয়েছিলেন এই ভদ্রলোক, নিজের কীর্তিগুলোকে তুলে রেখেছেন এভারেস্টের চূড়ায়, যেখানে পৌঁছানোটা যে কারো জন্যেই ‘প্রায় অসম্ভব’ একটা ব্যপার!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button