ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

সরকার কা মাল, দরিয়া মে ঢাল!

মশা মারতে কামান দাগার কথা শুনেছেন কখনও? না শুনলে এবার শুনবেন। আচ্ছা, একটা বালিশের দাম কত হতে পারে? মাথার নিচে যে বালিশ দিয়ে আমরা শুই, সেই বালিশের কথাই বলছি। বাজারে মানভেদে শিমুল তুলার একটা বালিশের দামও ৫০০-১২০০ টাকার বেশি কোনভাবেই নয়। অথচ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে কর্মচারীদের থাকার কোয়ার্টারে একেকটা বালিশ কেনার পেছনে খরচ করা হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা করে! শুধু তাই নয়, প্রতিটি বালিশ বিশতলা ওই ভবনে ওঠানোর জন্যেও ৭৬০ টাকা করে খিরচ করা হয়েছে! মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এসব বালিশে কি সোনার প্রলেপ দেয়া হয়েছে কিনা!

দেশ রূপান্তর নামের একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন রুবেলের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। প্রায় আট হাজার টাকা করে কেনা প্রতিটি বৈদ্যুতিক চুলা ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিতে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি। প্রতিটি শোবার বালিশ ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় হাজার টাকা করে। আর একেকটি ওয়াশিং মেশিন ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার টাকারও বেশি। এভাবে ওয়াশিং মেশিনসহ অন্তত ৫০টি পণ্য ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ক্রয়মূল্যের প্রায় অর্ধেক, কোনো কোনোটিতে ৭৫ শতাংশ।

একেকটা বিছানার চাদর কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০০০ টাকা করে, আর কাপড় পরিষ্কারের জন্য ১১০টি ওয়াশিং মেশিনের প্রত্যেকটি কেনা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ১১২ টাকা করে। এই ওয়াশিং মেশিনে মানুষ ঢুকে বসে থাকলে গায়ের ময়লাও পরিস্কার হয়ে যাবে কিনা, সেটা অবশ্য জানা যায়নি। প্রতিটা টেলিভিশন কেনা হয়েছে ৮৭০০০ টাকায়, সেগুলো রাখার জন্য টেলিভিশন কেবিনেট কেনা হয়েছে ৫২ হাজার ৩৭৮ টাকা করে।

হুমায়ূন আহমেদের একটা নাটকে অভিনেতা রিয়াজের মুখে একটা সংলাপ ছিল- ‘টাকাপয়সা কোন বিষয় না, টাকা হইলো তেজপাতা!’ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের এই হরিলুট দেখে মনে হচ্ছে, আসলেই টাকাপয়সা তেজপাতার চেয়েও সস্তা জিনিস। একটা ওয়াশিং মেশিন নিচতলা থেকে ভবনের ৫-১০ বা ১৫ তলায় ওঠাতে কি করে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়, এটা দয়া করে কেউ বুঝিয়ে যান আমাদের। এগুলো ওঠানোর জন্যে কি বিদেশ থেকে ক্রেন ভাড়া করে আনা হয়েছিল? নইলে এত খরচ হয় কি করে?

দেশ রূপান্তরের সেই প্রতিবেদনে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় মূল প্রকল্প এলাকার বাইরে হচ্ছে গ্রিনসিটি আবাসন পল্লী। সেখানে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য ২০ তলা ১১টি ও ১৬ তলা মোট আটটি ভবন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০ তলা আটটি ও ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি ২০ তলা ভবনে ১১০টি ও ১৬ তলা ভবনে ৮৬টি ফ্ল্যাট থাকবে। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া নয়টি ভবনের ৯৬৬টি ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র কেনা শেষ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ২০ তলা ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র কেনা ও তা ভবনে ওঠাতে সব মিলে ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ২৯২ টাকা!

প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্যে ৯৪ হাজার টাকা খরচায় কেনা হয়েছে একেকটি ফ্রিজ। সেগুলো আবার ভবনে ওঠাতে ব্যয় হয়েছে ফ্রিজপ্রতি বারো হাজার টাকারও বেশি করে! এই ফ্রিজের ওজন কত? বিশতলা ভবনে ফ্রিজ ওঠাতে কয়জন লোক লাগে? ড্রেসিং টেবিলের বেলায়ও একই কাহিনী, প্রতিটা ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছে ২১ হাজার ২১৫ টাকায়, আর ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে আট হাজার ৯১০ টাকা করে!

সবচেয়ে মজার ব্যাপার কি জানেন? একেকটা ইলেক্ট্রিক কেটলি কেনা হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায়। আর সেগুলো ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেয়ার জন্যে কেটলিপ্রতি খরচ হয়েছে তিন হাজার টাকা করে! খাজনার চেয়ে বাজনা এখানে একশোগুণ বেশি! কেটলি তো কেটলিই, সেটা তো গামলার সাইজ হবে না। তাহলে একেকটা কেটলি ওপরব ওঠানোর জন্যে তিন হাজার টাকা করে কিভাবে খরচ হয়?

ডায়নিং টেবিল, ওয়ারড্রোব, তোষক, বেডসাইড টেবিল থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিসে এভাবে কয়েকগুণ বাড়তি খরচ যোগ করা হয়েছে, আর ভুতুড়ে পরিবহণ খরচ তো আছেই! সরকারের টাকা যেন তাদের বাপ দাদার সম্পত্তি! অথচ প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান চোরের মায়ের মতো গলা বড় করে দাবী করেছেন, ‘এখানে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই। সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই করা হয়েছে।’

বালিশ-তোষকের দাম সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে, টিভি-ফ্রিজের দাম সম্পর্কেও আন্দাজ করতে পারি। তাই হিসেব মিলিয়ে নাহয় ক্যালকুলেটরে বের করা গেল রূপপুরের আবাসন প্রকল্পে নয়ছয় করে কত কোটি টাকা হাঙ্গরের পেটে গেছে। তাহলে একবার ভাবুন তো, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, যেখানে পুরো প্রজেক্টের বাজেট প্রায় সোয়া এক লক্ষ কোটি টাকা, সেখানে পুকুরচুরির পরিমাণটা কত?

বিছানা-বালিশের দাম আমরা জানি বলে ধরতে পারছি যে এখানে চুরি হচ্ছে, কিন্ত একটা টারবাইনের দাম তো আমাদের জানা নেই, প্রকল্পের ভারী ভারী যন্ত্রপাতিগুলোর দাম সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই নেই, সেখানে তাহলে কি ঘটছে? কত হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে সেখান থেকে? এদেশের কৃষকেরা যখন ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষোভে দুঃখে পাকা ধানের ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে, তখন বিদ্যুৎ প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি কি মেনে নেয়ার মতো?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button