রিডিং রুমলেখালেখি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রোমান সানাকে একটা ফোন করবেন প্লিজ?

রোমান সানা’র নামটা তিন-চারদিন আগেও কেউ জানতো না, এখনও যে খুব বেশি লোকে জানে সেই দাবীও করছি না, তবে পত্রপত্রিকায় নাম আসার কারণে লোকে শুনলে মনে করতে পারে, আরে, এর কথা তো পড়েছিলাম! এই ভদ্রলোক কয়েকদিন আগে ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশকে একটা বিরল সম্মান এনে দিয়েছেন। আর্চারির এশিয়া কাপ র‍্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টের ফাইনালে চীনের শি ঝেনকিকে হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতেছেন রোমান, সেইসঙ্গে দলগত ইভেন্টেও রৌপ্য পদিক জিতেছে বাংলাদেশ দল। মিশ্র ইভেন্টে এসেছে ব্রোঞ্জ পদক।

প্রথম সেটে ঝেনকির সঙ্গে ২৮-২৮ পয়েন্টে ড্র করেছিলেন রোমান। কিন্তু ঝামেলার সূত্রপাত দ্বিতীয় সেটে। এই সেটে ২৯-২৬ ব্যবধানে হেরে পিছিয়ে পড়েন রোমান। কিন্তু তৃতীয় সেটে আর গড়বড় হতে দেননি। তৃতীয় সেটে ২৭-২৫ ব্যবধানে জিতে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান এই আর্চার। চতুর্থ সেটেও রুমানই জয় পান, পঞ্চম ও শেষ সেটে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিলেন ঝেনকি কিন্ত শেষ পর্যন্ত এক পয়েন্টের ব্যবধানে জয় তুলে নেন রোমান, আর তাতেই ফিলিপাইনের বুকে ১৩ই সেপ্টেম্বরের দিনটাতে রচিত হয়েছিল ইতিহাস।

১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সিংয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন মোশাররফ হোসেন। যে কোন ধরণের ব্যাক্তিগত ইভেন্টে এশীয় পর্যায়ে এতদিন ধরে এটাই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র পদক জয়, তেত্রিশ বছর পরে সেই খরা দূর হলো রোমান সানার হার ধরে।

আর্চারির আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোমানের কৃতিত্ব কিন্ত এটাই প্রথম নয়। গত জুনে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত নৈপুণ্যে দেখিয়ে ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। ইতিহাস গড়েছিলেন প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে যেকোনো খেলার বিশ্ব আসরে পদক জিতে। আর্চারির বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে সেমিতে উঠেই তিনি গড়েছিলেন আরেক ইতিহাস- প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অলিম্পিকে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা অর্জন করে।

রোমান যেদিন এশিয়াডে স্বর্ণপদক জিতলেন, সেদিন ক্রিকেটে বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ের টি-২০ ম্যাচ ছিল। হাত থেকে প্রায় বেরিয়ে যাওয়া ম্যাচটা দারুণ এক ইনিংস খেলে বাংলাদেশের অনুকূলে এনে দিয়েছেন তরুণ তুর্কী আফিফ হোসাইন, জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ম্যাচের পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে আফিফের, সেই খবরগুলো আমরা পত্রিকায় দেখেছি। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নাকি তাকে জিজ্ঞেস করেছেন, আফিফ এত নিচে কেন ব্যাটিং করতে নেমেছেন?

ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনাম আছে। তিনি ক্রিকেট দেখেন, মাঝেমধ্যে তো মাঠেও হাজির হয়ে যান বিনা নোটিশে। ক্রিকেটারদের সঙ্গেও তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, নানা সময়ই গণভবনে ডাক পড়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের। ভালো পারফর্ম করায় মুস্তাফিজ বা মিরাজদের মতো তরুণ উদীয়মান ক্রিকেটারদের প্রধানমন্ত্রী পুরস্কৃতও করেছেন।

আর্চারি খেলাটা আমাদের দেশে মোটেই জনপ্রিয় নয়, ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যাপারটাকে হাতি আর পিঁপড়ের মতো দেখাবে। রোমান সানা স্বর্ণপদকটা না জিতলে হয়তো আলোচনাতেই আসতো না এই খেলাটা। রোমান যেটা করেছেন, মানের বিচারে সেটা আফিফের ইনিংসটার চেয়ে হাজারগুণ বড়, কিন্ত আফিফ প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেলেও, রোমান সানার ভাগ্যে বড় কোন অভিনন্দনবার্তাও জোটেনি।

নেদারল্যান্ডসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জিতে আসার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে একটা অভিনন্দন-বার্তা পেয়েছিলেন। কিন্তু ৫৫টি দেশের ২০৯ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে পদক জিতেও তার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি, তাকে কেউ বাড়ি বানিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়নি, তার একাউন্টে লাখ টাকার পুরস্কার ঢোকেনি, টিভি কমার্শিয়ালে তাকে নেয়ার জন্যে লাইন পড়ে যায়নি। নিজের ফেডারেশন বা ক্রীড়া মন্ত্রণালয় একটা পুরস্কারও তাকে দেয়নি তখন। তবে জাতীয় আর্চারির পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ‘তীর’ রোমানকে কিছু অর্থ পুরস্কার দিয়েছিল, সেটাই একমাত্র প্রাপ্তি।

রোমান সানা এখন বাংলাদেশ আনসারে সাধারণ একটা চাকরি করেন। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম, পরিবারের ঘানিটা তাই ঘাড়ের ওপর চলেই আসে। নিজের হতাশাটা গোপন করার চেষ্টাও করেননি রোমান, বললেন- ‘আমাদের দেশে ক্রিকেটে একটা সিরিজ জিতলেই ক্রিকেটাররা বাড়ি গাড়ি পেয়ে যান। অথচ ২০৯ জনকে পেছনে ফেলে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জিতেও আমরা কিছু পাই না। দেশকে সাফল্য এনে দিলাম। কিছু পাওয়ার আশা তো থাকে। আমরা গাড়ি-বাড়ি চাই না। লাখ টাকা বেতনও চাই না। আমরা একটা নিশ্চিন্ত জীবনের স্বপ্ন দেখি। সেটা কি খুব বেশি কিছু?’

না, রোমান সানা বলুন, কিংবা ভারোত্তলনে বাংলাদেশকে স্বর্ণপদক জেতানোর পরে জাতীয় সঙ্গীত শুনে কান্নায় ভেঙে পড়া মাবিয়াই বলুন- তারা কেউই বাড়িগাড়ি বা লাখ টাকার পুরস্কার চান না। তারা চান আর্থিক নিশ্চয়তাটুকু, যাতে করে ডাল-ভাতের চিন্তাটা বাদ দিয়ে পুরো মনযোগটা খেলায় দেয়া যায়। মায়ের ঔষধ, বোনের স্কুলের ফিস দেয়ার দুর্ভাবনায় যাতে ভালো পারফর্ম করার জায়গাটা থেকে ফোকাস নড়ে না যায়- এটাই তাদের চাওয়া।

ক্রিকেটারেরা যেমন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের জয়ে যেমন সম্মান মিশে থাকে, তেমনই রোমান বা মাবিয়ারাও দেশের জন্যে সম্মান বয়ে আনেন, ব্যক্তিগত ইভেন্ট হওয়ায় তাদেএ চ্যালেঞ্জটা বরং আরও বেশিই। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ৫২ রানের ম্যাচজয়ী একটা ইনিংস খেলে আফিফ যদি প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেতে পারেন, রোমান সানা তো সেই ফোনকলটা আরও বেশি ডিজার্ভ করেন, তাই না?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button