খেলা ও ধুলা

যে মানুষটার কোন ‘হেটার’ ছিল না!

তখন ফুটবল জিনিসটা মোটামুটি বুঝতে শিখেছি, গোল, অফসাইড, ফাউল বা পেনাল্টি নামের টার্মগুলোর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে একটু একটু করে। কোরিয়া-জাপানে বিশ্বকাপ, হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের মফস্বল শহরের বাড়ির ছাদগুলো ঢেকে গেল আকাশী নীল-সাদা আর সবুজ-হলদে পতাকায়। বাংলাদেশের মানুষ তো তখনও ফুটবল বলতে এই দুটো দেশকেই চিনতো। ষোল বছর আগের সেই শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলোতে আপনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা, সেটা টিভি পর্দায়।

উত্তরাধিকারসূত্রে আমার আর্জেন্টিনার সমর্থক হবার কথা ছিল। কেন যেন আমি ব্রাজিলের শিবিরে চলে এলাম। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি সাম্বার দেশ। ওয়েনের গোলে পিছিয়ে থাকা হলুদ জার্সির দলটা সমতা ফেরালো বিরতির ঠিক আগে। সেই গোলে আপনার অবদানের কথা পরে জেনেছি। পঞ্চাশতম মিনিটে সেই গোলটা, যেটা আপনাকে চিনিয়েছিল। ডিবক্সের চল্লিশ গজ দূর থেকে বাঁকানো একটা শট, ডেভিড সিম্যানের তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না আর। টিভি স্ক্রলে আপনার নাম আসে, আমি বানান করে পড়ি, রোনালদিনহো! সেই ম্যাচে কি অদ্ভুত পারফরম্যান্স আপনার, গোল করালেন, নিজে করলেন, তার মিনিট কয়েক বাদে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়ে বেরিয়েও গেলেন! তখন আমি জানতাম না, এই একটা ম্যাচই আপনার পুরো ক্যারিয়ারটার প্রতিচ্ছবি হয়ে রইবে!

ব্রাজিলের শহর পোর্তো অ্যালিগ্রে, মাদক আর জুয়ার ছড়াছড়ি চারপাশে। মাফিয়াদের গোলাগুলি আর দারিদ্র‍্যতার কাঠিণ্য ছাপিয়ে এখানকার মানুষগুলো ভালোবাসা খুঁজে নেয় ফুটবলে। এমন একটা দেশে আপনার জন্ম, যেখানে ফুটবলটা শুধু খেলা নয়, ধর্মের মতোই পালন করা হয়। যেখানে বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়াটাকে ধরা হয় ব্যর্থতা, সেই ফুটবলের পূণ্যভূমিতে আপনার বেড়ে ওঠা। চার বছর বয়সে আপনি যখন কাগজের দলা পাকিয়ে ডান পায়ে কিক বসাচ্ছেন, জিকো-সক্রেটিসদের দলটা তখন স্পেন থেকে ব্রাজিলের ফিরতি বিমানে চড়ে বসেছে। ফুটবল বিশ্বকাপের মাহাত্ন্য বোঝার ক্ষমতা তখনও আপনার হয়নি, কিন্ত ফুটবলার বাবার ইচ্ছেটা শেষমেশ আপনার ভাগ্যকাশে ফুটবলার হওয়াটাকেই নিয়তি বানিয়ে দিয়েছিল!

দারিদ্র‍্যতার সঙ্গে নিত্য বসবাস, নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে এলো বাবার দুর্ঘটনাটা। নিজেও ছিলেন শখের ফুটবলার, কিন্ত নেশাটা ছাড়তে হয়েছিল জীবিকার তাগিদে। একঘেয়ে জীবনে তার কাছে সন্ধ্যার কয়েকটা মিনিট ছিল দারুণ আকর্ষণীয়, যখন আপনি এসে সারাদিন মাঠে কি হলো, রাস্তায় কি হলো- এসব গল্প শোনাতেন। ছোট বাচ্চাদের মতো মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতো তার, যখন আপনি নিজের দেয়া গোলগুলোর কথা বলতেন তাকে!

রোনালদিনহো, বার্সেলোনা

অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে মিশর মাতালেন আপনি, রোনালদিনহো গাউচ্চোর ভেতরে ভবিষ্যত ব্রাজিলের প্রতিচ্ছবি তখন দেখতে পাচ্ছে সবাই। পরের বছর বিশ্বকাপ স্বপ্নের ভঙ্গ হলো ব্রাজিলের, হলুদ জার্সিধারীদের নীল কষ্টে রাঙিয়ে দিলো জিদানের ফ্রান্স। ব্রাজিলে বসে টিভি সেটে সেই দৃশ্য দেখেছেন আপনি, সেদিন ভেবেছিলেন কি, চার বছর এই জার্সিটা গায়ে জড়িয়েই সোনালী ট্রফিটায় চুমু খাওয়ার সৌভাগ্য হবে আপনার!

২০০২-এ সেমিফাইনাল খেলতে পারলেন না নিষেধাজ্ঞার খাঁড়ায়। ফাইনালে ফিরলেন, রোনালদো’র জাদুতে জয় হলো পেন্টা। গ্রেমিও ছেড়ে ইউরোপে আসাটা তখন আপনার জন্যে সময়ের ব্যপার। আগের বছরই আর্সেনাল চেষ্টা করেছিল আপনাকে দলে ভেড়ানোর, ব্যাটে বলে মেলেনি। বিশ্বকাপের পরের বছর নাম লেখালেন প্যারিসে। সেখান থেকে আরেক ব্রাজিলিয়ান রিভালদো’র রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে বার্সেলোনায়। আপনাকে রিভালদো’র উত্তরসূরী ভাবা হয়েছিল, বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ কি ভেবেছিল, কয়লার দামে কি অমূল্য এক হীরকখণ্ড কিনে এনেছে তারা! শূন্যতা পূরণের জন্যে যাকে কিনে আনা হয়েছিল, সেই রোনালদিনহো যে বার্সেলোনার ইতিহাসটাই নতুন করে লিখবেন, সেটা তো ভাগ্যবিধাতাই ঠিক করে দিয়েছিলেন!

স্পেনের ক্লাবটার হয়ে পাঁচ মৌসুম মাঠে ছিলেন আপনি। তিনটে লা লীগা, একটা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা। তবে ট্রফি দিয়ে স্পেনে আপনার পারফরম্যান্সকে মাপার বোকামীটা করতে যাবে না কেউ। মাঠে আক্ষরিক অর্থেই জাদু দেখাতেন আপনি, বলটাকে নিয়ে ছেলেখেলা করতেন আপনি। আর ওই চর্মগোলকটাও বাধ্য ছেলের মতো আপনার কথা শুনতো। বাহারী ড্রিবলিঙে কতবার বোকা বানিয়েছেন প্রতিপক্ষকে, গোল করেছেন, করিয়েছেন। ধ্রুপদী ফুটবল কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি, সেই প্রশ্নের জবাবটা লেখা হতো আপনার ডান পায়ে।

রোনালদিনহো, বার্সেলোনা

পায়ের মোহনীয় কারুকাজের মতোই আরেকটা বিশেষত্ব ছিল আপনার, মুখের ওই ট্রেডমার্ক হাসিটা। দল হারছে, আপনার মুখে হাসি, দল জিতছে, আপনার মুখে হাসি। গোল খেলেও আপনি হাসেন, গোল দিলেও হাসেন, গোল মিস করলেও আপনার মুখ থেকে হাসিটা মুছে ফেলা যায়না। এমন একটা মানুষকে ভালো না বেসে পারা যায় বলুন? রিয়াল মাদ্রিদের মাঠে গিয়ে বার্সেলোনার জার্সি গায়ে ওদের গুঁড়িয়ে দিয়েছেন, অথচ গ্যালারীভর্তি রাইভাল সমর্থকেরা তালি দিচ্ছেন, দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছেন আপনাকে! ইয়োহান ক্রুইফের পরে বার্সেলোনার আর কারো তো এমন সম্মান কপালে জোটেনি!

যে আপনি বিশ্বকে একদিন মোহিত করেছিলেন পায়ের কারুকাজে, সেই রোনালদিনহো গাউচ্চো হুট করেই একদিন হারিয়ে গেলেন মদ আর জুয়ার আসরে। ফুটবল মাঠের চেয়ে ক্যাসিনোটাই বেশী টানতে শুরু করলো আপনাকে। একজন কিংবদন্তীর শেষের শুরুটা হয়ে গেল, খেলা ভাঙার খেলায় তখন ব্যাস্ত আপনি। স্পেন ছাড়লেন, মিলানের হয়ে ইতালিতেও থিতু হতে পারলেন না। আবার ফিরলেন ব্রাজিলে। ফ্ল্যামেঙ্গো, মিনেইরো, কুয়ার্তারো কিংবা ফ্লুমিনেন্স- সফলতা এলো না সেভাবে। বিদায় নেয়াটা সময়ের ব্যপার ছিল শুধু। তবুও আপনাকে একবার ব্রাজিলের জার্সিতে দেখার জন্যে ভক্তদের কি আকুতি! আপনি মদ খেয়েছেন নাকি নারীসঙ্গে ডুবেছেন সেটা দেখার ফুরসত আমাদের হয়নি, আমরা তো শুধু আপনার পায়ের জাদুতেই আবিষ্ট হয়ে থেকেছি সবসময়। ২০০৬ কিংবা ২০১০, আপনি শুধু নিজের ছায়া হয়েই থেকেছেন। ফর্মের তুঙ্গে থেকে আফ্রিকায় গিয়েছিলেন ২০০৬-এ, কিন্ত জেতা হয়নি বিশ্বকাপ।

একটা লিগ্যাসি তিনি নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছেন। নিজেকে নিজেই গুটিয়ে নিয়েছেন শীর্ষ পর্যায় থেকে। মেসি- রোনালদোরা একে অন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন, অথচ তার প্রতিপক্ষ তিনি নিজেই ছিলেন। নিজের সাথে সেই যুদ্ধে তিনি জিততে পারেননি, হেরে গেছেন, ধরে রাখতে পারেননি নিজেকে। রোনালদিনহো গাউচ্চো ফুটবলকে হয়তো নিজের সামর্থ্যের অর্ধেকটুকুও দিতে পারেননি, তার পুরোটা পাওয়া গেল হয়তো পেলে-ম্যারাডোনা দ্বন্দ্বটাও থেমে যেতো, সেখানে রোনালদিনহো শুধু একাই বিচরণ করতেন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button