খেলা ও ধুলা

রজার ফেদেরার; দ্য ফেড এক্সপ্রেস

এ.এইচ বাদশা:

সাধারণত প্রত্যেক খেলারই সর্বকালের সেরা কে তা নিয়ে ভক্তকুলের মধ্যে একটা তুমুল বিতর্ক চলতে থাকে। ফুটবলে পেলে -ম্যারাডোনা, ক্রিকেটে শচীন- লারা, গলফে টাইগার উডস-ফিল মাইকেলসন, বাস্কেটবলে জনসন-লেরি বার্ড থাকলেও বেশিরভাগ টেনিস বিশ্লেষকদের মতে এখন পর্যন্ত নিঃসন্দেহে টেনিসের সর্বকালের সেরা রজার ফেদেরার।

দ্যা গ্রেট জিনি কনরস একবার বলেছিলেন, “হয় তুমি একজন হার্ডকোর্ট স্পেশালিস্ট, না হয় একজন ক্লে কোর্ট স্পেশালিস্ট, না হয় একজন গ্রাসকোর্ট স্পেশালিস্ট অথবা তুমি রজার ফেদেরার!’

নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী রাফায়েল নাদাল ফেদেরারের মূল্যায়ন করেন ঠিক এইভাবে, “কেউ যদি আমাকে ফেদেরার থেকে সেরা বলে তাহলে সে টেনিসের কিছুই জানে না”। রজার ফেদেরার নিজস্ব কায়দায় ফোরহ্যান্ড, ব্যাকহ্যান্ডের ছোঁয়ায় টেনিস বলের হাওয়ায় বাঁক খেয়ে ছুটে যাওয়া, কিংবা বুলেট গতির সার্ভিস, প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়া ক্ষিপ্রতা- নান্দনিক টেনিস খেলে সাফল্যের যে চূড়ায় তিনি উঠেছেন, সেটাই তাকে সর্বকালের সেরা টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে গণ্য করার জন্য যথেষ্ঠ।

প্রারম্ভিক জীবন কথা

সুইজারল্যান্ডের বাসেলের ‘বাসেল ক্যান্টনাল হাসপাতালে’ ১৯৮১ সালের ৮ আগস্ট সুইস বাবা রবার্ট ফেদেরার এবং দক্ষিণ আফ্রিকান মা লাইনেট ফেদেরারের কোলজুড়ে আসেন রজার ফেদেরার। কে জানত সবুজ গালিচার দেশের ছোট্ট রজার হয়ে যাবে সর্বকালের সেরা! প্রত্যেক সুইস পুরুষের মত সামরিক বাহিনীতে ট্রেনিং নিয়ে পিঠে সমস্যার কারনে ঐ দিকে আর বেশিদূর যেতে হয়নি, তাই মনোযোগী হন প্রিয় টেনিসে। জুনিয়র টেনিসে দাপট দেখানোর পর ২০০৩ সালের উইম্বলডন জিতে শুরু হয়েছিলো এক ইতিহাসের, পরে নিজেকে নিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়! হয়েছেন টেনিসের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা।

ফেদেরার ক্যারিয়ার

ব্যাক্তিগত জীবনে চিরশান্ত রজার কতটা কমল দাপট দেখিয়েছেন টেনিস কোর্টে তা বুঝা যায় এই পরিসংখ্যানে। তিনি ২০০৪ সাল থেকে ২০০৮ সালের শেষভাগ পর্যন্ত টানা ২৩৭ সপ্তাহ বিশ্বের ১ নাম্বার প্লেয়ার ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি একমাত্র প্লেয়ার হিসেবে পর পর ৫ বছর উইম্বলডন (২০০৩-২০০৭) এবং ইউ এস ওপেন (২০০৪-২০০৮) এর শিরোপা আর ২০০৪,০৬,০৭ এই তিন বছর তিনটি করে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়!

ক্যারিয়ারের স্বর্ণালী সময়ে নাদালের জন্য রোলা গারোতে কোনোমতেই সুবিধা করতে না পারা রজারের জন্য কতই না আফসোস ছিলো মানুষের। লাল মাঠিতে নাদাল আসলেই অনন্য ছিল, টেনিস বোদ্ধারা ধরেই নিয়েছিলো নাদালকে হঠিয়ে ফ্রেঞ্চ ওপেন হয়তো আর জিতাই হবেনা সুইস সম্রাটের। কিন্তু বিধাতা অপূর্ণ রাখলেন না এটাও ,টানা তিন তিনটা ফাইনালে নাদালের কাছে হেরে অবশেষে ফ্রেঞ্চ ওপেনও জিতে নিলেন ২০০৯ সালে।

২০০১ সালেও পিট সাম্প্রাসের উন্মুক্ত যুগে রেকর্ড ১৪ গ্রান্ডস্লাম স্পর্শ করা যেখানে ছিল স্বপ্নের মত,ফেদেররার সেই রেকর্ড ভেঙ্গেছেন ২০০৯ সালে উইম্বলডন জিতেই। আর এখনতো পুরুষদের মধ্যে সবচাইতে বেশি ২০ টি গ্রান্ডস্লামের মালিক! শুধু তাই নয়; ৩৬ বছর ৩২০ দিনে হয়েছেন এটিপি র্যাংকিং-এ বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক নাম্বার ওয়ান।জিতেছেন সবচেয়ে বেশি বয়সে উইম্বলডন গ্রান্ডস্ল্যাম।

এসব কেবল ফেদেরার বলেই সম্ভব হয়েছে।

নাদাল বনাম ফেদেরার

আপনি যদি ফেদেররারের পুরো ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করেন, তাহলে অবশ্যই বুঝতে পারবেন খুব সহজেই ফেদেরার শ্রেষ্ঠ হয় নি। তাবত দুনিয়ার সেরা সেরা টেনিস তারকাদের হারিয়ে ট্রফি উঁচু করছেন। ফেদেরারের চির প্রতিদ্বন্দ্বী রাফায়েল নাদাল ইতিহাসে ২য় সর্বোচ্চ ১৭টি গ্রান্ডস্লাম জয়ী টেনিস তারকা। বলা হয়ে থাকে,ফেদেরারের পর টেনিসের সবচাইতে বড় সুপারস্টার এই রাফায়েল নাদাল। ৩য় সর্বোচ্চ ১৬টি গ্রান্ডস্লাম জয়ী নাম্বার ওয়ান মেশিনম্যান জোকোভিচ ইতিহাসের অন্যতম সেরা টেনিস তারকাদের একজন। শুধু একবার কল্পনা করুন, নাদাল আর জোকোভিচ যদি ফেদেরারের সোনালী সময়ে না থাকতেন তাহলে ফেদেরারে গ্রান্ডস্ল্যাম সংখ্যা আজ কোথায় গিয়ে থামত?

ফেদেরার বনাম নাদাল

শুধু কি নাদাল,জোকোভিচ;নিজের পিক টাইম লড়েছেন এন্ডি রডিক,এন্ডি আগাসি ও অ্যান্ডি মারেদের মত স্টারদের সাথে। সত্যি বলতে ফেদারারের জন্য এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা টেনিস কোর্টে তাঁর সাফল্যের একটি চাবিকাটি ছিল।

এই সম্পর্কে দ্যা টেলিগ্রাফে সাক্ষাৎকারে ফেদেরার বলেন,”Eventually, Nadal came and he made life harde for me,and i had a hard time accepting that he’s going to be my rival now for while.and the same thing happened with djokovic,the same thing happened with murry,and so forth..! I think you always need somebody you can have a great rivalry with, and for me, thank God i had them.”

ঐতিহাসিক ম্যাচে ফেদেরার

শুধু রেকর্ড,পরিসংখ্যান আর ডমিনেশন নিয়ে ফেদেরারকে বিবেচনা করলে ভুল হবে। বরং টেনিসে ফেদেরারের অনেক লিজেন্ডারি ম্যাচ আছে যেগুলা টেনিস পিপাসুরা আজন্মকাল মনে রাখবে।টেনিস ওয়ার্ল্ডের জরিপে ইতিহাসের সেরা পাচটি টেনিস ম্যাচের ৪টিই জয়ী ফেদেরার।
২০০৮, উইম্বলডন ফাইনাল,রাফায়েল নাদালের সাথে ৫ ঘন্টার ৫ সেটের ঐতিহাসিক সেই ধ্রুপদী লড়াই টেনিস পিপাসুরা এত সহজে ভুলবে?টেনিস পন্ডিতদের মতে,এটিই টেনিস ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ম্যাচ।

পরের বছর ২০০৯ উইম্বলডনের ফাইনালে এন্ডি রডিকের সাথে সাড়ে চার ঘন্টার লড়াই করে পিটার সাম্প্রাসের ১২ গ্রান্ডস্ল্যামের রেকর্ড তছনছ করে দিয়ে টেনিসের একচ্ছত্র সম্রাট বনে যাওয়া ম্যাচটি চিরকাল মানুষের হৃদয়ে গেথে থাকবে!

২০১৭, মেলবোর্ন পার্কের ১০৫তম অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের কথা মনে আছে? ২০১২ সালের পর টানা ৬ বছর কোন গ্রান্ডস্ল্যাম না জিতার পর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে মুখোমুখি হোন নিজের সবচাইতে বড় রাইভাল রাফায়েল নাদালের বিপক্ষে! পিছিয়ে পড়েও ৩৫ বছরের বুড়োর ৬-১,৩-৬,৬-১,৩-৬,৬-৩ অবিস্মরণীয় কামব্যাকে উল্লাসে মেতে উঠে টেনিস বিশ্ব।
সেইদিন সিএনএন শিরোনাম করেন-“Never Give up!”

খেলা শেষে ম্যাচ কনফারেন্সে পরাজিত নাদাল বলেন,”Today was a great match,Roger
probably deserved it a little bit more than me. I’m just going to keep trying. I feel like I am back at a high level, so I’m going to keep fighting to have a great season.Million congratulation for Roger!”

বুড়ো বয়সে যত ভেলকি

রজার ফেদেরারের শ্রেষ্ঠত্বের অন্য আরও একটি বড় দিক হল ৩৫ বছরের বেশি বয়সে টেনিসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়া; যেখানে ৩০ বছর বয়সেই তারকা খেলোয়াড়েরা অবসরে গিয়ে ঘরে টেনিসের ব্যাট, প্যাড,ক্যাপ সাজিয়ে রাখে।সেখানে টানা প্রায় ৫ বছর পর ফেদেরার ২০১৮ সালে নিজের ৩৫তম জন্মদিনে এটিপি র্যাংকিং-এ শীর্ষস্থান পুনরদ্ধার করেন। একই বছর ৬ষ্ঠ বারের মত অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে নিজের গ্রান্ডস্লাম সংখ্যা নিয়ে যান রেকর্ড ২০ এ।

বয়সকে স্রেফ সংখ্যা ভেবে তুচ্ছ করে দিয়ে ফেদেরারের এগিয়ে যাওয়া নিয়ে চায়না টেলিভিশন নেটওয়ার্কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক আমেরিকান লিজেন্ডারি টেনিস তারকা জন ম্যাকনোরে বলেন, “Its still beyond belief.It is one of the craziest things I’ve seen in the 25 years I’ve been doing commentary and 35 years Roger played superb.It’s truely amazing to watch.”

দ্য কামব্যাক কিড

জোকোভিচ নামক এক মেশিনম্যানের আগমণে
প্রায় দুই দশকের সাম্রাজ্যের পতনের পর অনেকে ভেবেই নিয়েছিল ফেদেরারের দিনশেষ, ব্যাট-ক্যাপ তুলে নেওয়ার সময় হয়েছে, ফেদেরার বোধহয় আর গ্রান্ডস্লাম জিতবে না, হি মাইট পার্মান্যান্টলি লস হিস প্লেস এমং দ্যা স্পোর্টস এলিট! ২০১১ সালে ফেদেরার উইম্বলডন হাতছাড়া করেন জোকোভিচের কাছে। ২০০২ সালের পর সেবছর প্রথম কোন বছর ছিল যেবছরে গ্রান্ডস্লাম জিততে পারেননি ফেদেরার।

তবে পরেরবছর রেকর্ড সর্বোচ্চ ম্যাচ জিতেন, সর্বোচ্চ ৬টি ক্যালেন্ডার টাইটেল জিতেন,উইম্বলডনের ফাইনালে অ্যান্ডি মারেকে হারিয়ে জিতেন বছরের একমাত্র জিএস,বছর শেষ করেন এটিপি র্যাংকিং-এর-২ নাম্বরে থেকে।তখন সবাই ভেবেছিল ফেদেরার বোধহয় ফিরল আবার!

২০১৩ সালে ফেদেরার আবার মারাত্মক ইঞ্জুরিতে পড়েন এবং বছরের ৪টি জিএস মিস করেন।অনেক টেনিস পন্ডিত তখন বলেই দিয়েছিলেন,ফেদেরারের ক্যারিয়ার শেষ!
কিন্তু ফেডেক্স তাদের আবারও হতাশ করলেন।
নিন্দুকদের জবাব দিয়ে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে জিতে নেন ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও উইম্বলডন এবং হয়ে যান ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সে গ্রান্ডস্ল্যাম জয়ী খেলোয়াড়।২০১৮ সাল ৪টি ক্যালেন্ডার টাইটালসহ জিতেন ৫ম বারের মত অস্ট্রেলিয়ান ওপেন গ্রান্ডস্লাম।

২০১৯ সালে ৩টি ক্যালেন্ডার টাইটেল জিতেন এবং ট্রাইবেকারে উইম্বলডনের ফাইনালে হেরে যান জোকোভিচের কাছে।বর্তমানে এটিপি র্যাংকিং-এ আছেন ২-এ। সাবেক লিজেন্ড ও দীর্ঘসময়ের কোচ ব্রড গিলবার্ট ফেদেরারের ইঞ্জুরি থেকে এইভাবে ফিরে আসা সম্পর্কে ইএসপিএন সাক্ষাৎকারে বলেন,”That’s the greatness of Roger,his game comes so easy!I think on the six month break(in 2006),he actually came back about five years younger.There’s a lot to learn in how he’s overplayed. ”

গ্রেটনেস অফ ফেদেরার

ফেদেরার শুধু জগদ্বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড়ই নয় উদার মনের মানুষও বটে।মানবতার কল্যাণে কাজ করার জন্য ২০০৩ সালে ফেদেরার প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্যা রজার ফেদেরার ফাউন্ডেশন’ যেখানে তিনি দান করেন ২৮.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।দ্যা রজার ফাউন্ডেশনের কল্যাণে আফ্রিকার প্রায় ১ লক্ষের বেশি মানুষ দারিদ্রমুক্ত হয়েছেন।

ফেদেরার ফোর্বস ম্যাগাজিনের মতে, ২০০৯-১১ টানা তিন বছর বিশ্বের সেরা দানশীল অ্যাথলেট নির্বাচিত হোন। ফেদেরার ২ বার Aurther Ashe Humanitarian Award ও ৮ বার Stefan Edverg Sportsmanship Award পান। ২০১২ সালে ফেদেরার ও নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় সম্মানিত,প্রশংসিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হোন।

কোর্টের বাইরে এই জীবন সম্পর্কে ফেদেরারকে জিজ্ঞেস করা হলে,তিনি বলেন- “I’m not sure you can show greatness all round your life.It’s not easy to achieve, and i’m still trying hard to get there.”

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button