মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

যে দেশের সবাই খারাপ, সেই দেশের জন্য বিধান কী?

বরগুনায় রিফাত নামে যে ছেলেটি খুন হয়েছে সে সম্পর্কে আমার আত্মীয় হয়। কাছের আত্মীয় নয়, একটু দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তাকে আমি সামনাসামনি দেখেছি মোটে তিন/চার বার। ছোট বেলায় আমাদের বাসায় এসেছিলো আত্মীয়তার সূত্রে। ছেলেটি আমার সমবয়সী। বিয়ে করেছিলো সম্ভবত মাস দুই আগে।

খুন হবার কিছু সময় পরে বিকেলের দিকে এক আত্মীয় ফোন করে আমাকে ঘটনা জানায়। প্রথমে ভেবেছিলাম রাজনৈতিক কারণে হত্যাকাণ্ড। ঐ এলাকার আশেপাশে কিছুদিন আগেও আওয়ামীলীগের দু পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় এরকম কোপাকুপির ঘটনা ঘটেছে। ভেবেছিলাম, সেরকমই কোন ঘটনা।

আমার আত্মীয়টি জানালো রাজনৈতিক কারণে নয়, যে মেয়েটির সাথে বিয়ে হয়েছে তার পূর্ব প্রেমিকের সাথে বিরোধের জের ধরে এই ঘটনা ঘটেছে। সংবাদদাতা আফসোস করে বলছিলেন, “আহারে রেবার (রিফাতের মা) একমাত্র ছেলে। কীভাবে সহ্য করবে? তুমি সাবধানে চলা ফেরা কইরো।”

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন রেখে দিলাম। ‘সাবধানে’ তো সেই কবে থেকেই থাকছি, সেই যখন থেকে মোল্লারা পিছু নিয়েছে। যারা খুন হয়েছিল মোল্লাদের হাতে সবাই সাবধানেই চলতো। তাদের একজন তো নিজের বাসার ভিতরে খুন হলো! সেই সময়ের ট্রমার ভিতর থেকে এখনো বের হতে পারিনি। পথেঘাটে হাটলে কেমন যেন আতংক কাজ করে এখনো। এদেশে সাবধানে থাকার মত হাস্যকর ব্যাপার যে আর কিছু নেই!

রিফাতের জন্য আমার খারাপ লাগছিলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিইবা করতে পারি আমি? এরকম কত ঘটনা ঘটছে দেশে। যে বাবা মা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারালো তারা বিচারটুকু পাবে কিনা তারও তো নিশ্চয়তা নেই। কোথায় বরগুনার সাধারণ একটা ছেলে ব্যক্তিগত কারণে খুন হয়েছে- কে এগুলো গুরুত্ব দেবে?

কিন্তু বাসায় ফিরে ফেসবুক খুলে দেখি সেখানে রীতিমত বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে! ফেসবুকবাসীরা বুঝতে পারছেন যে ‘এই দেশ নিরাপদ নয়’, ‘এই দেশে জীবনের নিশ্চয়তা নেই’। এছাড়াও নানা রকম বিচার বিশ্লেষণ, এর সাথে সমাজতন্ত্র গণতন্ত্র ধনতন্ত্র মিশিয়ে নানা রকম ককটেল বানানো ইত্যাদি তো আছেই।

ভাবলাম, ঘটনা কী! প্রথমে বুঝলাম আশেপাশে বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ নেই, এটা একটা কারণ হতে পারে। কিছু একটা নিয়ে তো আলোচনা কর‍তে হবে। পরে বুঝলাম যে ঘটনা আরো আছে। এই পুরো হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে চলে এসেছে। আর ভিডিও না দেখলে তো আমরা ঘটনার সঠিক মর্ম বুঝতে পারিনা। ভিডিও আছে এবং বাংলাদেশের খেলা নেই- এই দুটি বিষয় এই হত্যাকাণ্ডকে আদর্শ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত করেছে।

নিহত রিফাত

এখন থেকে ফোনের ক্যামেরাটা অন করে চলাফেরা করতে হবে। কেউ কোপাতে আসলে আশেপাশে মজা দেখতে আসা পাবলিককে ফোনটা ছুড়ে দিয়ে বলতে হবে, “অন্তত ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েন ভাই। এবং এমন সময় ভিডিও পোস্ট করবেন যেন অন্য কোন ইস্যুর সাথে ক্ল্যাশ না করে।” এতে জীবন না বাচলেও পাবলিকের আহাউহু পাওয়া যাবে এবং হয়তো, বলছি ‘হয়তো’, বিচার পাবার কিছুটা সম্ভাবনা থাকবে।

দেখলাম কারা যেন আজকে মানববন্ধন করবে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে! তারা সকালে করবে না বিকালে, এই নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছিলো ওখানে গিয়ে গোটা দশেক ‘হাহা রিয়াক্ট’ দিয়ে আসি। এই দেশের মানুষ, এই আমরা, এত বড় হারামি কেন?

পার্ল এস.বাক সম্ভবত বলেছিলেন, “কোন দেশের ভালো মানুষরা চুপ করে থাকে বলেই খারাপরা রাজত্ব করে।” তো যে দেশের সবাই খারাপ, সেই দেশের জন্য বিধান কী?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button