ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

যে মানুষগুলোর পরিবার রিকশার উপর নির্ভরশীল তাদের দায়িত্ব কে নেবেন?

Syed Saiful Alam Shovan:

ঢাকায় রিকশা চালানো নাকি অমানবিক পেশা। ঢাকার মানবিক গোষ্ঠীর কাছে এই মানুষগুলোর যে জীবিকাহীন হবে, তাদের পরিবার আর্থিক নিরাপত্তাহীন হবে- তার কথা না বলি। আসুন মানবিক পেশার সংজ্ঞা দেখি।

১. ঢাকায় পুলিশ ডিউটি করে ১০ ঘন্টার বেশি; আর কিছু ক্ষেত্রে ১৩/১৪ঘন্টাও ডিউটি করে। এরমধ্যে ট্রাফিক পুলিশের অবস্থা বলা যাবে না। কারণ তাদের ডিউটি কোনো পর্যায়ে পড়ে না। তাদের কর্মস্থলের পরিবেশ নিয়ে কথা বললে দেশের অন্যতম অমানবিক পেশা হলো ট্রাফিক পুলিশের ডিউটি।

২. ঢাকায় পোশাক শ্রমিকদের ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত ডিউটি করার কথা শুনা যায়। তাদের কর্ম পরিবেশ নিয়ে কোনো আলোচনা করলাম না।

৩. বাস-লেগুনা চালকদের দৈনিক আয় গড়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। তাদের ডিউটি টানা ১০ ঘন্টার বেশি।

৪. যে সাংবাদিক বন্ধুরা অমানবিক পেশা লিখেন, তাদের অবস্থাও খুব একটা ভাল না। মানবিকতার কোনো সংজ্ঞায় তারা নিজেদের দাঁড়া করাতে পারেন না। পেশার নিরাপত্তায় তারা খুবই অসহায়। ঢাকার বাইরে বেশির ভাগ গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের বেতন নেই। আর থাকলেও তা যতটা, তা দিয়ে জীবন যাপন করা খুবই কঠিন।

৫. ইটের ভাটার শ্রমিকদের আয়, দিন মজুরদের আয়, বাসায় যে বুয়া আছেন তাদের আয় এবং মানবিক পেশা নিয়ে কথা বলা বন্ধ রাখলাম।

৬. ঢাকায় মাসিক মাত্র ৩০০০/৪০০০ টাকায় ১৪ ঘন্টায় শ্রম দেয় এমন পেশার নাম বলা যাবে কয়েক ডজন।

৭. সিটি করপোরেশনের এলাকায় ড্রেন যারা পরিষ্কার করে, ছবি দেখলে আপনি নিষ্ঠুর ঢাকা শহরের অন্যরকম ছবি পাবেন।

৮. দেশের কৃষকের পরিশ্রম জানেন? তারপর উৎপাদিত ফসলের কী মূল্য পায় তা কি জানেন?

৯. জানেন নাকি চা শ্রমিকদের বেতন কত?

এ শহরে ৫ লাখ রিকশায় ১কোটির ৩৮ লাখের বেশি ট্রিপ/যাতায়াত হয় প্রতিদিন। এই পাঁচ লাখ রিকশার সাথে শুধু ঢাকার কোটি মানুষ যাতায়াতে নির্ভরশীল নয়। জড়িত আছে আরো দেশের অর্ধ কোটি মানুষের আয়-জীবন-জীবিকা।

ঢাকায় রিকশা চালনা খুব জুইতের পেশা না হলেও, স্বাধীন পেশা। সে যেকোন সময় না বলার ক্ষমতা রাখে। কোন কোন পেশাজীবি আছে এমন স্বাধীন? হাত তুলেন দেখি?

ঢাকার রিকশা চালকদের আয় অনেক উচ্চ শিক্ষিত যুবক থেকে বেশি। রিকশা চালকরা যদি তার পরিশ্রম দিয়ে তার পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে পারে, এই পরিশ্রমকে তারা সুখ ভাবে, আর আপনি তাদের পেশা বন্ধ করে দিয়ে মানবিক হচ্ছেন কোন সূত্রে?

অমানবিক পেশা বলে রিকশা উচ্ছেদ করতে চান । কিন্তু কখনো তো রিকশার মান উন্নয়ন বা রিকশাকে মানবিক করার জন্য কোনো অর্থ তো বরাদ্দ করেননি! দেশের এত এত প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেই তো আমরা মানবিক রিকশা পাই। তা না করে কী করেছেন শুনেন। রিকশাকে উচ্ছেদ করে বা নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকায় প্রাইভেট কারের বাজার তৈরি করেছেন। ৫ ভাগ লোকের যাতায়াত যে প্রাইভেট কার, তারা ৬০ ভাগের বেশি জায়গা নিয়ে নেয়। আর বাকি ৯৫ ভাগ লোক চলাচল করে ৪০ ভাগ রাস্তায়। তা সম্ভব হয় শুধুমাত্র রিকশার কারণে। কারণ একটি রিক্সায় সারাদিনে অনেক যাত্রী ব্যবহার করে।

ঢাকা বায়ু দূষণে অন্যতম। তার অন্যতম কারণ যান্ত্রিকযান। সে তুলনায় রিকশা ঢাকার আশীর্বাদ। বায়ুর স্বাস্থরক্ষায় রিক্সা ঢাকার ভবিষ্যত। আর বায় দূষণে কত মানুষ মারা যায় জানেন? পিক আওয়ারে ঢাকায় যেসব রাস্তায় রিকশা উচ্ছেদ হয়েছে, সেই রাস্তায় গাড়ির গতি শুধু রিকশা নয় হাটাঁর চেয়েও কম!

ঢাকায় রিকশা উচ্ছেদের অন্যতম পরামর্শদাতা ছিল বিশ্বব্যাংক। যদিও তারা রিকশা উচ্ছেদের পরিকল্পনা থেকে বের হয়ে এসেছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে এটা ভুল পরিকল্পনা ছিল। তবে হাজার কোটি টাকা কিন্তু গচ্চা গিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের বাতিল করে দেওয়া মোটামোটি সকল পরামর্শক জমা হয়েছে দক্ষিণে। তারা মেয়রকে ভুল বুঝাছে। এদের অনেককেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। ঢাকার কত কত যে অপরিকল্পনার সাথে তারা জড়িত!

এই বাতিল মালদের অনেকের সাথে আমাদের বিশ্বব্যাংক অফিসে তর্ক হয়েছিল তাদের কু পরিকল্পনা নিয়ে। যুক্তি তর্কে হেরে তারা বরাবরই পেশি আর কন্ঠশক্তি দেখাতে চেয়েছিলেন। যদিও তাদের সেই কু পরিকল্পনার কিছু অংশ বাতিল হয়েছে।

যদিও তারা এখন রিকশা উচ্ছেদের জন্য যানজট না বলে শুধুই মানবিক কারণ দেখায়। কারণ একটা স্বীকৃত যে- রিকশায় প্রাইভেট কার যানজটের কারণ। এরা একটা কথা বলে- পৃথিবীর আর কোথায় রিকশা চলে? কোথায় চলে তা নিয়ে তর্ক নয়। বলি এত অল্প স্থানে এত মানুষ কোথায় আছে? এত এত লোকের যাতায়াত কী দিয়ে নিশ্চিত করবেন? যে মানুষগুলোর পরিবার রিকশার উপর নির্ভরশীল তাদের দায়িত্ব কে নিবেন? ঢাকায় প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করুন। যানজট কমবে।

মেয়র আপনি কি জানেন, সিটি করপোরেশনের নিউ মার্কেট এলাকায় যে অংশে রিকশা চলাচলের জন্য বরাদ্দ, সেই অংশের বেশির ভাগ জায়গা লিজ দেওয়া হয়েছে গাড়ি পার্কিং এর জন্য? কত টাকা আয় হয় সেখান থেকে প্রশ্ন করেন। কতটা গাড়ি পার্কিং হয় তথ্য নেন। আর সাথে তথ্য নেন সেই সরু রাস্তা দিয়ে দিনে কতজন রিকশায় পার হয়। কত চালক আর তার পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। এক সপ্তাহের জন্য নিউ মার্কেট এলাকার পার্কিং নিষিদ্ধ করুন। দেখুন কী হয়!

যদি পারেন একদিন ধানমন্ডি এলাকায় রিকশা বন্ধ করুন। অন্য একদিন প্রাইভেট কার বন্ধ করুন। ফলাফল আপনি পাবেন। বাতিল হয়ে যাওয়া পরামর্শকদের বুদ্ধি তখন আর নিতে হবে না। ধনীর মেয়র অনেক হয়েছেন। এবার মানুষের মেয়র হন। কয়েক লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান আর কোটি মানুষের যাতায়াতের মাধ্যমকে উচ্ছেদ না করে রিকশাকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আনুন।

রিকশা ঢাকার গর্ব, রিকশা সবুজ ঢাকার ভবিষ্যৎ, রিকশা আধুনিক। ভালবাসা রিকশার প্রতি। রিকশার পক্ষে থাকুন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button