ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

মধ্যবিত্তের বাহন- রিকশা

আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে; হ্যাঁ, ঠিক ১০০ বছর আগে এই বঙ্গে প্রথম রিকশা’র পথচলা শুরু হয়। সেই ১৯১৯ সালে সুদূর মিয়ানমারের রেঙ্গুন থেকে ৩ পায়ে ভর করে তার আগমন। এককালে একে উচ্চবিত্তদের বিলাসিতা বলা হলেও আজকাল একে ডাকা হয় ‘মধ্যবিত্তের বাহন’ নামে। তবে এই শতবর্ষী অতিথিকে বিদায় জানাতে আজ আমরা যেন বড্ড বেশি তৎপর, এ যেন সময়েরও দাবী।

মাঠে কাজ করুন; মাঠ কোথায়?

গত ৭ জুলাই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন যানজট কমানোর লক্ষ্যে রাজধানীর ৩ টি সড়কে (বিশ্বরোড-রামপুরা, মিরপুর রোড হয়ে খিলগাঁও-সায়েদাবাদ, আসাদ্গেট-আজিমপুর, সায়েন্স ল্যাব-শাহবাগ) রিকশা চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন এবং এই ঘোষণার প্রতিবাদে রিকশাচালকরা গত সোমবার এবং মঙ্গলবার সড়ক অবরোধ করে রাজধানীতে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করলে মাননীয় মেয়র খোকন তাদেরকে ‘গ্রামে ফিরে গিয়ে মাঠে কাজ’ করার উপদেশ দিয়েছেন।

কিন্তু আমাদের মেয়র মহোদয়ের নিশ্চয়ই অজানা নয় যে এই রিকশার নগরী ঢাকায় বর্তমানে সর্বমোট রিকশা রয়েছে ১১ লাখ। আর এই ১১ লাখ রিকশা যেহেতু দুই শিফটে চলে সেহেতু এই শহরে রিকশাচালকের সংখ্যা হলো ২২ লাখ এবং এরা মূলত গ্রাম থেকেই আগত। এদের ৩৬% হলো রাজশাহীর, ২২% রংপুরের, ১৩% ময়মনসিংহের, ১১% বরিশালের, ৯% চট্টগ্রামের, ৪% খুলনার, ১% সিলেটে এবং মাত্র ৪% হলো ঢাকার। তাহলে ঢাকার ঐ ৪% বাদে বাকী ৯৬% মানুষ কি সাধ করে তাদের পরিবার পরিজন, গ্রাম এবং ‘মাঠ’ ছেড়ে ঢাকায় এসেছে? মেয়র মহোদয়ের উপলব্ধি করা উচিত যে তারা কেউ সাধে ঢাকায় আসে নি। সাধ করে কেউ এই শহরে রিকশা চালাতে আসে না। কারণ রিকশা চালানো ভীষণ শ্রমসাধ্য এক কাজ; এর জন্য দিন নেই রাত নেই একজনকে রোদে পুড়তে হয়, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, শহরের হরেক রকমের বিষ সানন্দে গলাধঃকরণ করতে হয়, জীবনের অনিশ্চয়তা তো আছেই। তাছাড়া ঐ ২২ লাখ মানুষের মাঝে কতজনের নিজস্ব জমি তথা মাঠ আছে, সেটা সর্বপ্রথম ভাবা উচিত। বিস্ময় জাগানিয়া হলেও সত্য যে এই শহরের কেবল ৬৯.৫০% রিকশাচালকের ভিটে বাড়ি্টুকু আছে, আর মাত্র ১২.৫০% রিকশাচালকের যৎসামান্য চাষযোগ্য জমি আছে।

এই যেখানে তাদের জমি-জমার সর্বসাকুল্য অবস্থা, তাহলে তারা কাজ করার মতো মাঠটা পাবে কোথায়? অন্যের মাঠে যে দিনমজুর খাটবে, তাদের জন্য সেই উপায়ও তো আমরা রাখিনি। রাখিনি বলেই আজ আব্দুল মালেক শিকদারদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তারা রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে তাদের ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেয়। আব্দুল মালেক শিকদাররা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পায় না, দাম পায় না বলে তারা দিনমজুরকে তাদের শ্রমের পর্যাপ্ত মূল্য দিতে পারে না, আর দিনমজুররাও তাদের শ্রমের পর্যাপ্ত মূল্য পায় না বলে পরের মাঠ সস্তায় কাস্তে হাতে শ্রম বিক্রি করার চেয়ে জাদুর শহরে এসে রিকশার প্যাডেলে শ্রম ব্যয় করা অধিকতর শ্রেয় মনে করে। আর করবেই বা না কেন?

সাধারণত অন্যের জমিতে কাজ করলে গ্রামে একজন মজুরের দৈনিক মজুরী ধার্য করা হয় ২০০-৩০০ টাকা। যদি সে মাসের ৩০ দিনও কাজ করে, তাহলে তার মাসিক আয় ৬০০০-৯০০০ টাকা। আর এই শহরের একজন রিকশাচালকের দৈনিক আয় ৫০০-৭০০ টাকা। সপ্তাহে ৬ দিন রিকশা চালিয়েও মাসে তার সর্বনিম্ন আয় থাকে ১৩,৩৮২ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৪,০০০ টাকা; যা অধিকাংশক্ষেত্রে এ যুগের একজন সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মজুর মতান্তরে চাকরের থেকেও ঢের বেশি।

তাই রিকশাওয়ালাদেরকে মাঠে ফিরে যাওয়ার উপদেশ দেয়ার আগে তবে আপনার রাষ্ট্রের ঘুণে ধরা সিস্টেম এবং তার কৃষি ব্যবস্থার শুদ্ধিকরণ জরুরী। আপনারা শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করুন; দেখবেন, চারিদিক থেকে দারিদ্র্যের তীব্র কষাঘাতের কবলে পড়ে কোনো উপান্তর না পেয়ে যারা পেট এবং পিঠ বাঁচাতে কচুরিপানার মতো ভাসতে ভাসতে ঘোরগ্রস্তের ন্যায় এই জাদুর শহরে এসে থিতু হয়েছে, আপনা-আপনিই তাদের সেই ঘোর কেটে যাবে, লাঙ্গল-কাস্তে হাতে নিয়ে হাসিমুখে ফিরে যাবে মাঠে। আবারও সচল হয়ে উঠবে আপনার দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির চাকা। তার জন্য এভাবে একপ্রকার ঘাড় ধরে ঐসব ছিন্নমূল মানুষগুলিকে গ্রামে পাঠানোর জন্য উঠে পড়ে লাগা নিরর্থক।

রিকশা, রিকশা নিষেধাজ্ঞা

‘রিকশাশূন্য ঢাকা’

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম নগরীকে আগামী ২ বছরের মাথায় রিকশাশূন্য করার ব্রত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার সড়কের মাত্র ১৫ কিলোমিটার এলাকায় রিকশা বন্ধ করা হয়েছে। অতএব, চিন্তার কিছু নেই। তাই কি? ব্রত অনুযায়ী, ২ বছরের মাথায় তো পুরো সড়কেই রিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে ২ বছর পর এই ২২ লাখ রিকশাচালক এবং রিকশার সাথে জড়িত আরও ৫ লাখ, মোট ২৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন তো? আর হিসেবটা কেবল ২৭ লাখ মানুষে থেমে নেই কিন্তু। ২৭ লাখ মানুষের পরিবারের গড় সদস্য যদি ৪ জন করে ধরা হয়, তবে সর্বমোট ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের রুটি-রুজি, পেট-পিঠ নির্ভর করে শুধুমাত্র এই রিকশা’র ওপর।

এতগুলি মানুষের কর্মসংস্থান এবং বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা না দিয়ে এমন ঘোষণা অদূরদর্শীতা ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।

‘বাড়বে অপরাধপ্রবণতা’

দেখা গেছে যে এই শহরের রিকশাওয়ালাদের মাঝে ৯৪% বিবাহিত এবং বাকী ৬% অবিবাহিত। সুতরাং এটা স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে যে পরিবারের সদস্যদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের যোগান দেয়ার জন্যই তাদের এই হাড় ভাঙ্গা খাটুনি। এদিকে কথায় আছে, অভাবে স্বভাব নষ্ট। আজ ঐ উদ্বাস্তু কিংবা ছিন্নমূল মানুষগুলি গায়ে-গতরে খেটে উপার্জন করছে, কিন্তু কাল থেকে যদি তাদের কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যায় তবে পয়সার জন্য এই এরাই হয়ে উঠতে পারে একেকজন দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী কিংবা ছিঁচকে চোর।

‘রিকশা নয়; প্রাইভেট কার হটাও, ঢাকা বাঁচাও’

ঢাকার মোট আয়তনের মাত্র ৭ % হলো সড়কের জন্য। যেখানে প্যারিসে তা ২৫%, ওয়াশিংটন এবং শিকাগোতে ৪০%। কিন্তু ঢাকার ঐ ৭% রাস্তার ৮০%-ই থাকে আবার প্রাইভেট কারের দখলে। মাত্র ৬% রাস্তা ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন। একটা প্রাইভেট কারে ১-৩ জন যাত্রী থাকে। কখনো-সখনো গাড়িতে কোনো যাত্রী-ই থাকে না। আবার দেখা যায়, একই পরিবারে রয়েছে একাধিক সংখ্যক গাড়ি। আর রাস্তার মাঝে গাড়ি পার্ক করে রাস্তা দখল করে রাখা তো এখানকার চিরাচরিত প্রথা। এ বেলায় আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও চোখে সবসময় কালো চশমা পরিধান করে থাকে। এই লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা প্রাইভেট কারগুলির রাশ টেনে ধরতে না পারলে এই নামেমাত্র মেগাসিটি অচিরেই এক ‘স্থবির’ সিটিতে পরিণত হবে। রিকশা নামক ধীরগতি সম্পন্ন যানকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিলেও তেমন কোনো আহামরি অগ্রগতি হবে না।

রিকশা

প্রধান সড়কগুলিতে কেন ঐ দৈন্যদশা?

ঢাকার যানজট নিরসনের জন্য ফ্লাইওভার, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, জেব্রা ক্রসিং কত কি-ই তো তৈরি করা হলো; এখনো হচ্ছে। এত কিছুর পরও তাহলে যানজট কমছে না কেন? ঐ সড়কগুলিতে তো রিকশা জাতীয় ধীরগতির কোনোপ্রকার যানবাহন চলাচল করে না। কেন তবে এক বিজয় সরণীর সিগন্যালে আটকা পড়লেই ঘণ্টা পার হয়ে যায় আমাদের?

ঢাকার প্রধান সড়কগুলি যে রিকশা জাতীয় ধীর গতির যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ এবং কালক্ষেপণকারী; এ কথা সত্য। কিন্তু সেই সাথে এও সত্য যে ঢাকার রাস্তার ৮০% দখলকারী ঐসব যানবাহনের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে কেবল রিকশা চলাচলে শর্ত আরোপ করাও রাষ্ট্রের একপ্রকার পক্ষপাতদুষ্টতা কিংবা ধ্বজভঙ্গতা’র পরিচায়ক।

রিকশা কেন জরুরী?

এ কথা অনস্বীকার্য যে রিকশা হলো এমন একটা যান যা এই একবিংশ শতাব্দীতে বসে চলতে দেখা বাস্তবিকার্থেই অমানবিক। দু’টো মানুষ আরামে পেছনে বসে আছে। আর একটা মানুষ তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তাদেরকে অনবরত টেনে চলেছে। বিষয়টা কুৎসিত। তবে এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হতে পারে, “রিকশার আধুনিকীকরণ”। পায়ে চালিত রিকশা যেহেতু অমানবিক, সেহেতু মটোরাইজড রিকশা চালু করা হোক। এতে করে গতিও বাড়বে, চালকের কষ্টও কম হবে; দু’দিক-ই রক্ষা।

এছাড়া-

* রিকশা, ভ্যান, সাইকেল জাতীয় ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেইন করা হোক।

* দেশের একটা বৃহৎ ‘শিক্ষিত বেকার’ জনগোষ্ঠী সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে আজ চাকুরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। কিন্তু এই রিকশাচালকদের ৪১% এর-ই নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তবুও তারা বেকার বসে নেই। রাষ্ট্র বছর বছর এরকম শিক্ষিত বেকার উৎপাদন করা বন্ধ না করতে পারুক, নতুন করে এই ২৭ লাখ মানুষকে অন্তত অন্ধকারে না ঠেলে দিক।

* রিকশা চালানোর জন্য কোনোপ্রকার আলাদা যোগ্যতা বা দক্ষতা লাগে না। লাগে না কোনো মুলধনও। রিকশাচালকেরা রাষ্ট্রের মাথা’র ওপর বোঝাস্বরূপ বসে না থেকে নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিজেরাই করে ফেলেছে।

* নির্দিষ্ট জায়গায় জায়গায় রিকশা স্ট্যান্ড চালু করা উচিত। সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য।

* রিকশার লাইসেন্স নতুন করে খতিয়ে দেখা উচিত। সেই সাথে ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকাও বাধ্যতামূলক করা উচিত।

* সর্বোপরি, রিকশা হল পরিবেশবান্ধব যানবাহন, এর ব্যবহার সার্বজনীন হওয়া উচিত।

রিকশার বিকল্প কি গণপরিবণ?

ঢাকায় প্রায় ২.৫ কোটি মানুষের বসবাস। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো এদের ৬০%-ই হলো নিত্য রিকশা ব্যবহারকারী, তারা রিকশা’র উপর পরম নির্ভরশীল। অথচ গত বছরের হিসেব অনুযায়ী এ শহরে নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা প্রায় ৩৯,৭৮২; তবুও মানুষ বাসের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। যারা নির্ভর করছে, তাদের উপায়ন্তর নেই বলে নির্ভর করে। নির্ভর না করার কারণ কি আসলে? জেনে রাখা দরকার যে এ শহরে তিন ধরণের বাস চলাচল করে। লোকাল বাস, কাউন্টার বাস এবং সিটিং বাস। এও নামেমাত্র সিটিং বাসগুলির কাজ-ই হলো চিটিং করা। আর কাউন্টার বাসগুলির ক্ষেত্রে স্টপেজ ছাড়া থামানো বারণ, কিন্তু কে শোনে কার কথা! আর লোকাল বাসের তো কোনো জুড়ি-ই নেই। সকালবেলা বাসে ঝুলে ঝুলে স্কুল-কলেজ-অফিসে যাও, সন্ধ্যাবেলা আবার একই নিয়মে নীড়ে ফেরো। এ এক ভারবাহী গাধা’র জীবন। তাছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ি’র বিড়ম্বনা তো আছেই।

সুতরাং, এই শহরকে সত্যিই বাঁচাতে চাইলে সবার আগে অপ্রয়োজনীয় প্রাইভেট কারগুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাসের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক সিস্টেমকে পুরোপুরি রদবদল করে ফেলতে হবে। সুস্থ স্বাভাবিক আইন প্রণয়ন করে তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

এগুলি যদি বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে একটা কেন, ৫ টা মেট্রোরেলও ঢাকার এই জড়ভরত অবস্থা দূর করতে পারবে না। আর, এই রিকশার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যানজট নিরসনের ছক কাটা তো কেবল নিছক-ই এক কল্পনা।

তথ্যসূত্রঃ

১। https://en.wikipedia.org/wiki/Rickshaw

২। https://bangla.bdnews24.com/

৩। https://www.voabangla.com/

৪। https://www.prothomalo.com/

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button