Uncategorized

দুনিয়ার মধ্যে একটা অসভ্য জাতি যদি থেকে থাকে, সেটা হচ্ছি আমরা…

একজন নারী যাকে ছেলে ধরা হিসেবে সন্দেহ হয়েছে। ছেলে ধরা-কল্লাকাটা গুজব কীভাবে এই সভ্যতায় মানুষের মাথায় ঢুকে পড়ল সেটা একটা রহস্য। তারপরও এই দেশ যেহেতু সভ্যতা থেকে এখনো কয়েকটা আলোক বর্ষ দূরে, সুতরাং যে কাউকে রেন্ডমলি ছেলে ধরা হিসেবে সন্দেহ করাকে অপরাধ হিসেবে বলার সাহস ত্যাগ করলাম।

ভদ্রমহিলাকে সন্দেহ হয়েছে, টেনে হিঁচড়ে প্রধান শিক্ষকের রুমে নেয়া হয়েছে; এ পর্যন্তও মানা গেল। কিন্তু সেই রুম থেকে আবার টেনে এনে প্রকাশ্যে স্কুলের গেটের মতো জায়গায় পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, এ কী করে সম্ভব!

একজন নারীকে তিনজন মানুষ ঘিরে ধরে দাঁড়ালে সে পালানো দূরে থাক, কথা বলারই সাহস পাবে না। তার গায়ে হাত তোলার আগে একটু সময় নেয়া যেত না? পুলিশকে কল করা যেত না? আধাটা ঘণ্টা তাকে বেঁধে রাখা যেত না?

জানি বলবেন যারা খুন করেছে তারা তো এই লেখা পড়ছে না। কিন্তু তার মানে কী এই যেসব মানুষ আনন্দের সাথে একটা প্রাণ কেড়ে নিল তারা সবাই অশিক্ষিত, মূর্খ। জ্বি না। এরা সবাই অশিক্ষিত মূর্খ না। ঘটনাটা একটা স্কুলের ভেতর ঘটেছে। এই নারীকে প্রথমে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন স্কুলের অভিভাবকরাই। এরা কেউ অশিক্ষিত না। যারা টেনে হিঁচড়ে প্রধান শিক্ষকের রুমে নিয়ে গেছে তারাও রিকশা ড্রাইভার হওয়ার কথা না। শিক্ষকের রুম থেকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে যখন বাইরে আনা হলো তখন সেই স্কুলের মধ্যে এমন কোনো শিক্ষক-অভিভাবক ছিলেন না যিনি এই হত্যা আটকাতে পারতেন?

 

ভদ্রমহিলা এসেছিলেন তার সন্তানের ভর্তির ব্যাপারে তথ্য জানতে। ঠিক এই সময় কোনো এক বা একাধিক চুল পাকনা অভিভাবকের মাথায় আসল এটা ভর্তির সিজন না। ভর্তির সিজন না হলে ভর্তির ব্যাপারে তথ্য জানা হারাম এবং এমন কথা বলার মানেই মহিলা কল্লাকাটা নারী– যে সব অভিভাবক প্রথম চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল তাদের দায় কীভাবে অস্বীকার করবেন? প্রধান শিক্ষকের অপারগতা কী অপরাধের বাইরে? যারা পিটিয়ে মারার সময় দাঁড়িয়ে দেখেছে, তারাও কী কম অপরাধী? (প্রসঙ্গত বরগুনায় কুপিয়ে হত্যা আর এই হত্যার মধ্যে পার্থক্য আছে। টার্গেট কিলিং এ আম জনতার হিরো হবার সুযোগ সীমিত। কিন্তু এটা যেহেতু টার্গেট কিলিং না, এখানে ২-৩ জন মানুষ রুখে দাঁড়াতে পারলেই একটা জীবন রক্ষা হয়)

যারা পিটিয়ে হত্যা করেছে দায়টা শুধু তাদেরকে দিলেই হবে না। একেকটা পাবলিক পরীক্ষায় লাখে লাখে এ প্লাস উৎপাদন হয়, প্রতি বছর দেশের শীর্ষ ভার্সিটি থেকে বের হচ্ছে কয়েক লাখ গ্র্যাজুয়েট, আকাশে পাঠানো হয়ে গেছে স্যাটালাইট।
এ সব কিছুকেই তুচ্ছ মনে হয় যখন দেখি মানুষ এখনো “কল্লাকাটা” তত্ত্ব বিশ্বাস করে নিচ্ছে। অশিক্ষিত মানুষদের কথা বাদ, মেডিকেল ভার্সিটিতে পড়া প্রচুর শিক্ষিত ছেলে মেয়ে এখনো আপাদমস্তক কুসংস্কার, গুজবে মাথা ডুবিয়ে রেখেছে। শিক্ষিত চাকরিজীবী, ছেলে-মেয়েকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যাওয়া আন্টি… এদের অনেকের সাথে কথা বললেই বোঝা যায়, সভ্যতা এই বঙ্গদেশে কখনো আলো দেবে না বলে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পিটিয়ে হত্যা আমাদের মানসিক উগ্রতার একটা সিম্বল মাত্র। মুখে মুখে, আইডিতে আইডিতে মানবিকতার বাঁধ ভাঙ্গা স্রোত দেখা গেলেও দেশের ৮০-৯০% মানুষই যে চরম মাত্রায় উগ্র সেটা বলার জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই। সবাই হত্যা করার মতো সাহস হয়তো রাখে না, কিন্তু হত্যার পরিবেশ তৈরি এবং হত্যাকে জাস্টিফাই করার ক্ষেত্রে বাঙ্গালীকে পেছনে পড়তে দেখা যায় না। এখন নিউজফিডে প্রতিবাদের ঝড়। এটা স্রেফ শো অফ। যার যার জায়গায় উগ্রবাদী হওয়ার সময় কারোরই হুশ থাকবে না।

যে মহিলা মারা গিয়েছেন তাকে তো আর ফেরানো যাবে না। কিন্তু একটা গুজবের বলি আর কতজনকে হতে হবে সেটাই ভাবনার বিষয়। পাগল, ছিন্নমূল মানুষের প্রাণ এখন সরাসরি ঝুঁকিতে। অপরিচত এলাক্য ঢুকলেই মৃত্যু হাতের কাছে চলে আসবে। স্রেফ একটা গুজবের দায়ে একেকটা মানুষকে একদল মানব সন্তান উৎসব করতে করতে মেরে ফেলছে, এই দৃশ্যটা কীভাবে সহ্য করি?

ভারতে গরুর মাংস গুজবে প্রায়ই মুসলমান হত্যা করা হয়। আমি ভাবতাম এদিক থেকে বোধহয় আমরা অনেকটাই সভ্য আছি এখনো। এই ভুল ভেঙ্গে গেছে। ভারতে হত্যা হচ্ছে ধর্মের নামে। ধর্ম বিশ্বাস পৃথিবীর আদি এবং বৃহত্তম বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের জেরে সারা বিশ্বে হত্যা হয় এবং হবেও। আমাদের দেশে হত্যা হচ্ছে কেন? কারণ পদ্মা সেতু চালু করার জন্য অনেক কল্লা লাগবে! বিশ্বাস হয়?

দেশকে ভালো না বেসে উপায় নেই। জাতীয় সঙ্গীত হয়তো মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ক্ষণে ক্ষণে চোখের কোণ ভিজিয়ে দেবে। তবে একই সাথে এই সত্যটাও বিশ্বাস করা জরুরি আমরা দুনিয়ার অসভ্যতম জাতির একটা। দুর্নীতিতে ডাবল হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন এই দেশে জন্ম নেয়া গর্বের কিছু না। যুদ্ধ বিধ্বস্ত কিছু দেশের সাপেক্ষ্যে হয়তো একটু ভালো, কিন্তু এই দেশে জন্ম নেয়াটা মোটের উপর মানব জীবনের শ্রেষ্ঠতম দুর্ভাগ্যের মধ্যেই হয়তো পড়ে।

অতি দেশ প্রেমিক ভাইয়েরা আমার লাস্ট কথাটা হজম করতে না পারলে ইগ্নোর করুন, প্লিজ।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button