মতামত

ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কোনটি?

প্রত্যেকের স্পিরিচুয়াল জার্নি আলাদা। কেউ জীবনে ব্যর্থতার গ্লানি দূর করতে, কেউ আশা খুঁজে পেতে, কেউ প্রিয়জন হারানোর শোক ভুলে থাকতে, কেউ বা আবার জীবনে সাফল্য লাভ করতে বিভিন্ন ভাবে এই স্পিরিচুয়ালিটির শরণাপন্ন হয়৷ সমস্যা হচ্ছে আমাদের সমাজে স্পিরিচুয়ালিটির ধারণাটা যেহেতু ধর্মের সাথে সম্পর্কিত, এবং চাপিয়ে দেয়া ধর্মের বাইরে কেউ কিছু চিন্তাও করতে পারে না, তাই এই যাত্রা সব সময় সঠিক ফল প্রদান করে না৷

অথচ ধর্ম ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়৷ আধ্যাত্মিকতা মনের এক ধরণের প্রশান্তিময় অবস্থা নির্দেশ করে। এখন কেউ নামায পড়ে এই প্রশান্তি পেতে পারে। কেউ কেবল যিকির করে, কেউ পূজা করে, কেউ ধ্যান করে, কেউ বা বিশুদ্ধ সঙ্গীতে এই প্রশান্তি খুঁজে পেতে পারে। হযরত মুহম্মদ হেরা গুহায় ধ্যানের মাধ্যমে যে আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, বুদ্ধের বোধিবৃক্ষের তলায় ধ্যানরত অবস্থায় নির্বাণ লাভ তার থেকে আলাদা কিছু নয়। মাওলানা রুমি নৃত্যের তালে ঘুরতে ঘুরতে যেভাবে বিলীন হয়ে যেতেন, লালনের সঙ্গীতও সেই একই প্রশান্তির দিকে তাকে টেনে নিয়ে যেতো৷

আমি একজনকে চিনি যে কিনা একজন বিশুদ্ধ শিল্পী, সে যখন তার সমস্ত একাগ্রতা দিয়ে ‘পর্দা তোল গোলাপ বালা, দেখি পরাণ ভরিয়া’ কিংবা রাধারমণ গায় তখন তার চোখেমুখে যে ভীষণ আবেগ আর গভীরতা থাকে সেটা অনেক নামাযী ব্যক্তি নামায পড়ার সময়ও অর্জন করতে পারে না। সে জায়নামাযে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার মন থাকে অন্য কোনখানে। আবার এমনো অনেককে চিনি যারা নামাযের পর আল্লাহু আল্লাহু জিকিরে এমন ভাবে হারিয়ে যায় যেন সে পৃথিবীতেই নেই৷

Image Source: wsj.com

ধর্ম জোর করে চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। ধর্মের যে আধ্যাত্মিকতার অংশ, সেটাই কেবলমাত্র মানুষের জন্য উপকারী। আর যে অংশটি মানুষকে বিভিন্ন শিকলে বেঁধে ফেলতে চায়, সে অংশটি রাজনৈতিক। আমরা আধ্যাত্মিকতা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক অংশটি নিয়েই মেতে আছি৷ আর তাই আমরা জোর করে অন্যের উপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চাই৷ যেন এতে করেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হবে!

আমি আজ পর্যন্ত কোন হুজুরকে, কোন ইমামকে সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্য প্রার্থনা করতে শুনিনি৷ তারা দোয়া করেন কেবল মাত্র মুসলমানদের জন্য৷ কখনো শুনিনি তারা বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের কথা বলছেন, তারা বলেন মুসলিম ভ্রাতৃত্বের কথা। কখনো তারা যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার জন্য প্রার্থনা করেন না, তারা প্রার্থনা করেন যুদ্ধে যেন মুসলিমরা বিজয় লাভ করে সে জন্য। কেন? কারণ পুরোপুরি রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক।

কেউ ইসলাম ধর্মের কোন বিধানকে অস্বীকার করলে ধর্মের অবমাননা হয়, নাকি ধর্মের লেবাস ধারণ করে অপরাধমূলক কাজ করলে ধর্মের অবমাননা হয়? এই যে মাদ্রাসার হুজুরদের বিভিন্ন অপকর্মের ঘটনা একের পর এক সামনে আসছে, কেন দেখলাম না ইসলামের খাঁটি অনুসারীরা একত্রিত হয়ে এর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে? অথচ অর্বাচীন কেউ ধর্ম নিয়ে তাদের বিশ্বাসের বিপরীতে দুটো বাক্য বলুক, দেখবেন বায়তুল মোকারমের সামনে প্রতিবাদের জন্য হাজারে হাজারে জড়ো হয়েছে তারা৷ মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধে শয়ে শয়ে মাদ্রাসার ছাত্ররা মিছিলে নেমেছে, অথচ সোনাগাজির সেই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মাত্র দশ পনেরোজনের একটি দল মানববন্ধন করেছিলেন। মসজিদে মাহফিলে মোনাজাতে পহেলা বৈশাখ পালনের বিরুদ্ধে নানাবিধ কথা বলা হয়, বলা হয় না এসব প্রকৃত অপরাধ নিয়ে কোন কথা। বলবে কিভাবে? তারা তো বিশ্বাস করে ধর্ষনের জন্য নারী নিজেই দায়ী৷ দায়ী নারীর পোশাক৷ নারীরা যদি আপাদমস্তক বোরখায় আবৃত হয়ে ঘরে বসে থাকতো তাহলে ধর্ষণ হতো না! কাজেই ওয়াজে, মাহফিলে, মসজিদের খুতবায় ধর্ষনের বিরুদ্ধে যত না কথা হয়, তার থেকে বেশি কথা হয় নারীদের চলাফেরার বিরুদ্ধে। এবং বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এসব অযৌক্তিক নোংরা কথা বিশ্বাস করে।

একজন মডেল যিনি কিনা তার পেশাগত কারণেই ইসলামের বিধান অনুযায়ী ভয়ানক পাপিষ্ঠ, বলেছেন যে তিনি পরকালে বিশ্বাস করেন না। ব্যাস, আর কী লাগে! ফেসবুকীয় ধার্মিকরা তাকে মৌখিক ভাবে এমন ভাবে ধর্ষনেচ্ছা প্রকাশ করে যাচ্ছে, বেচারী শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চেয়ে ‘আল্লাহর কাছে বিচার’ দিয়েছে! এরা নিজেরা বেহেশতে যেতে পারলেই সন্তুষ্ট নয়, বাকিদেরকেও সাথে নিয়ে যেতে চায়। তাই কেউ যদি এদের বিশ্বাস পরিপন্থী কিছু বলে তাকে মেরেকেটে গালিগালাজ করে হলেও লাইনে আনতে হবে!

এদিক শফী হুজুর ‘আহমাদিয়া মুসলিম’দের রাষ্ট্রীয় ভাবে অমুসলিম ঘোষণা দেয়ার দাবী জানিয়েছে এবং তাদের কাফের ঘোষণা করে তাদের সাথে ‘আসল মুসলিম’ দের কোনরকম সম্পর্ক হারাম ঘোষণা করেছে৷ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে এভাবে কেউ কোন গোষ্ঠিকে প্রকাশ্যে হুমকি দিতে পারে না। আমরা অসভ্য বলেই পারছে৷ সভ্য হলে সে এতক্ষণে সে আইনের আওতায় চলে আসতো৷ আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের উপর যদি কোন হামলা হয় সেই দায় কে নেবে? রাষ্ট্র না শফী হুজুর?

আজ দেখলাম কারা যেন ধানমণ্ডি ২৭ নাম্বার রোডের মুখে যে ভাস্কর্যটা আছে, সেটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছে। এসব ঘটনা দেখেই বোঝা যায় আমাদের এখানে মানুষের আধ্যাত্মিকতার অভাব কতটা প্রকট, এদের ঈমান কতটা দুর্বল যে সামান্যতেই তা আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

নিজের বিশ্বাস নিয়ে নিজে থাকা, নিজে তা চর্চা করা এবং অন্যকে অন্যের বিশ্বাস নিয়ে থাকতে দেয়া- এটাতো খুবই সহজ একটা বিষয়৷ কেউ যদি পরকালে বিশ্বাস না করে তাতে তোমার কী বাপু? তুমি তো বিশ্বাস কর। তো সেই পরকালের শান্তির জন্য তুমি কী করেছো? তোমার বিশ্বাস অনুয়ায়ী ঐ অবিশ্বাসীর বিচার স্রষ্টা করবেন, তোমার নিজের আমলনামা ঠিক আছে তো?

কেউ যদি নামায পড়ে শান্তি পায় সে নামায পড়বে, কেউ যদি সঙ্গীত চর্চা করে শান্তি পায় সে সেটাই করবে। কেউ যদি আল্লাহর ভয়ে নামায না পড়ে, আপনার ভয়ে আপনাকে দেখানোর জন্য পড়ে, তাহলে বিধান অনুযায়ী সেটা আরো বড় গুনাহ৷ আপনিও কি এই গুনাহের ভাগিদার হচ্ছেন না? আমি বেহালা বাজিয়ে শান্তি পাই দেখে আমার আশেপাশের সবাইকে বেহালা বাজাতে হবে- এমনটা ভাবলে আশেপাশে শুধু নয়েজই বৃদ্ধি পাবে, সুর সৃষ্টি হবে না।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button