খেলা ও ধুলা

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া কখনোই ‘ছোট দল’ নয়!

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজ শুরু হবার আগেই অ্যারন ফিঞ্চ বলেছিলেন, বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া কখনও ‘আন্ডারডগ’ হিসেবে খেলতে যায়নি, যাবেও না। সদ্যই ভারতের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জিতে আসা অধিনায়ক হয়তো গর্বের চোটেই বলে ফেলেছেন কথাটা- তখন মনে হয়েছিল এমনটা। নইলে ২০১৮ সালে ১৩টা ওয়ানডে খেলে ১১টা ম্যাচেই হেরে যাওয়া দলটা, যারা কিনা ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিঙের পাঁচ নম্বরে আছে, তারা বিশ্বকাপে ‘হট ফেবারিট’ হবে কি করে?

মরুর বুকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে শহীদ আফ্রিদীর ‘বড় দল’ পাকিস্তানকে ৫-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই করে জবাবটা দিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দুইমাস আগেও যারা কিনা প্রতিটা ভার্সনেই খাবি খাচ্ছিল, একটা টিম হয়ে উঠতে পারছিল না কোনভাবেই, পারফরম্যান্সের গ্রাফ ছিল নিম্নমূখী, তারাই কিনা এখন চোখ রাঙাচ্ছে তাবৎ প্রতিপক্ষকে! ২০১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা প্রত্যাশীর তালিকা থেকে অস্ট্রেলিয়াকে যারা বাদ দিয়েছিলেন, তাদের কাছেও বার্তা পৌঁছে গেছে- অস্ট্রেলিয়াকে কখনোই হিসেবের খাতা থেকে বাদ দেয়া যায় না!

ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদিত, সেটা নিয়ে কোন কথাই হবে না। কিন্ত ২০১৫ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ওয়ানডেতে সেভাবে অনূদিত হচ্ছিল না তাদের সামর্থ্যটা। তার ওপরে বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারিতে স্মিথ-ওয়ার্নার নিষিদ্ধ হলেন একসঙ্গে, অস্ট্রেলিয়ার মেরুদণ্ডটাই গেল ভেঙে! এমনিতেই গত তিন/চার বছর ধরে ব্যাট হাতে অস্ট্রেলিয়াকে টেনেছেন এই দুজনই। তারা নিষিদ্ধ হবার পরে যেন অকূল পাথারে পড়লো দলটা! দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিধ্বস্ত হতে হলো ওয়ানডেতে, তাদের মাঠে এসে প্রথমবারেত মতো টেস্ট সিরিজ জিতে নিলো ভারত, জিতলো ওয়ানডে সিরিজও!

ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিঙের এক নম্বর জায়গাটা যাদের জন্যে বরাদ্দ ছিল বছরের পর বছর ধরে, তারাই কিনা নামতে নামতে পাঁচে চলে এলো! দেয়ালে পিঠ ঠেকলে নাকি সেরাটা বেরিয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়ার পিঠ দেয়ালে ঠেকলো ভারতের মাটিতে টানা দুই ওয়ানডে হারের পরে। চারপাশে হাসি-ঠাট্টা, ভারতীয় মিডিয়ার আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল, অস্ট্রেলিয়া নয়, ভারত বুঝি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে খেলছে! সেখান থেকে টানা তিনটে ওয়ানডে জিতে নিলো অস্ট্রেলিয়া, ভারত তো বটেই, চমকে গেল ক্রিকেটবিশ্বও! অস্ট্রেলিয়ার এই তরুণ দলটা এ কি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে!

এরপরের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। এক দুই তিন চার করে টানা পাঁচটে ওয়ানডে জিতে নিলো ক্যাঙারুরা। প্রথম দুই ওয়ানডেতে তো ক্লিনিক্যাল ফিনিশ করেছে তারা, প্রতিপক্ষকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে। যেন স্টিভ ওয়াহ বা রিকি পন্টিঙের অস্ট্রেলিয়া নেমে এসেছিল মাঠে! শেষ দুই ম্যাচে আবার হারের মুখে পড়েও তারা বের করে এনেছে ম্যাচ! দুবাইয়ের স্পিনিং কণ্ডিশনটাকেও আপন করে নিয়েছে দলটা, ব্যাটসম্যানরা রানের ফোয়ারা ছুটিয়েছেন, প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার কাজটা দারুণ কৃতিত্বের সঙ্গে করেছেন বোলারেরা।

অস্ট্রেলিয়ার মূল সমস্যা যেটা ছিল, ব্যক্তিগত ফর্ম, সেটা এখন একটা মধুর সমস্যার নাম! ওপেনিং পার্টনারশিপটা জমছিল না ঠিকঠাক, রান পাচ্ছিলেন না অধিনায়ক ফিঞ্চ। অথচ তার ব্যাটে এখন রানের ফুলঝুরি, সিরিজের প্রথম দুই ওয়ানডেতেই করেছেন সেঞ্চুরি, সেঞ্চুরি তিনি হাঁকিয়েছিলেন ভারতের বিপক্ষেও। আর উসমান খাজা তো আছেন স্মরণকালের সবচেয়ে দুর্দান্ত ফর্মে। এবছর ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক তিনি, যে ফর্মে আছেন, তাতে আশা করাই যায় যে বছরশেষেও এটা নিজের নামের পাশেই ধরে রাখতে পারবেন তিনি।

ম্যাক্সওয়েল শেষদিকে নেমে তাণ্ডব চালাচ্ছেন, রান পাচ্ছেন শন মার্শ বা হ্যান্ডসকম্বেরাও। বোলারেরাও আছেন দারুণ ফর্মে, অ্যাডাম জাম্পা তো ত্রাস হয়ে উঠেছেন গত দুই সিরিজেই। স্টার্ক নেই, প্যাটিনসন ইনজুরিতে, তবুও টানা ম্যাচ জিতে চলেছে অস্ট্রেলিয়া- বিশ্বকাপ সামনে, একারণেই এভাবে জ্বলে ওঠা কিনা কে জানে! অবস্থা এখন এমনই দাঁড়িয়েছে যে, স্মিথ আর ওয়ার্নারের জায়গা হচ্ছে না দলে! এই দুজনের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, দলে ঢুকতে হলে কাকে বাদ দেবেন, এই চিন্তায় এখন অস্থির অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকেরা!

বিশ্বকাপের রঙ নাকি হলুদ। ফুটবলে পাঁঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, আবার ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া- যেখানে অন্য কোন দল দু’বারের বেশি শিরোপা ঘরেই তুলতে পারেনি! দুটো দলেরই জার্সির রঙ হলুদ, কাজেই বিশ্বকাপের রঙ হলুদ বলাটা বাতুলতা নয় মোটেও। বিশ্বকাপ দুয়ারে কড়া নাড়ার আগে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া আরও একবার জানিয়ে দিলো, শিরোপাটা ধরে রাখার চেষ্টায় মোটেও কমতি থাকবে না তাদের…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button