খেলা ও ধুলামনের অন্দরমহলরিডিং রুম

চলুন, রশিদ খানকে নিয়ে ট্রল করি!

এশিয়া কাপের সময় রশিদ খান বলেছিলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে তারা ভাবছেন না, তাদের দৃষ্টি ফাইনালে। বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ে তার আলাদা কোন মন্তব্য ছিল না। আর তাতেই অন্ধ অহমিকায় আক্রান্ত আমাদের কারো কারো আঁতে ঘা লেগে গিয়েছিল। এই সেদিনের ছোকরা রশিদ কিনা বাংলাদেশকে পাত্তা দেয় না! টি-২০’র এক নম্বর বোলার হয়েছে তো কি হয়েছে, তাই বলে একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশকে সম্মান দিয়ে কথা বলবে না, তোয়াজ করবে না, তা হয় নাকি!

বাংলাদেশ কতটুকু সম্মান ডিজার্ভ করে, সেটা চট্টগ্রাম টেস্টের দুই ইনিংসে এগারো উইকেট শিকার করে রশিদ বুঝিয়ে দিয়েছেন। প্রথম ইনিংসে হাফসেঞ্চুরী হাঁকিয়েছেন, দ্বিতীয় ইনিংসেও তার ব্যাট থেকে এসেছে ২৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস। রশিদ জানেন তার স্ট্যান্ডার্ডটা কোন জায়গায়, আমরাই ভুলে গেছি, নিজেদের ক্রিকেটের লেভেলটা নামতে নামতে কোথায় এসে ঠেকেছে। এশিয়ার ক্রিকেটে নিজেদেরকে ভারতের সাথে তুলনা করি আমরা, আর আফগানিস্তান এসে চট্টগ্রামের মতো জায়গায় হেসেখেলে হারিয়ে দেয় আমাদের।

রশিদের বয়স নিয়ে বাঙালী যতো হাসিঠাট্টা করেছে, আর কেউ এর এক শতাংশও করেনি, করার দরকারও পড়েনি। দুনিয়াতে একমাত্র দেশ আমরাই, যারা মাঠের খেলার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সিরিয়াস। রশিদও কেন যেন বাংলাদেশকেই প্রিয় প্রতিপক্ষ বানিয়ে নিয়েছেন। দেরাদুনে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজে তার বলের কোন জবাবই জানা ছিল না বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের, খেলিয়ে খেলিয়ে একেকটা উইকেট তিনি আদায় করে নিয়েছিলেন সেই সিরিজে, বাংলাদেশ হয়েছিল হোয়াইটওয়াশ।

গত এশিয়া কাপে আবুধাবীতেও রশিদ একাই হারিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। বিপর্যয়ের মুখে ব্যাট হাতে নেমে ৩২ বলে ৫৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছিলেন, অষ্টম উইকেটে মাত্র ৫৬ বলে ৯৫ রানের জুটি গড়েছিলেন গুলবাদিন নাইবের সঙ্গে। আড়াইশোর পুঁজি হাতে নিয়ে বল হাতেও রশিদ ছিলেন বিধ্বংসী, নয় ওভারে মাত্র ১৩ রানে নিয়েছিলেন দুই উইকেট, বাংলাদেশ হেরেছিল ১৩৬ রানের বিশাল ব্যবধানে।

বিশ্বজুড়ে প্রায় সবগুলো ফ্র‍্যাঞ্চাইজি টি-২০ টুর্নামেন্টে খেলে বেড়ান তিনি, সেখানে রীতিমতো হটকেক তিনি। তখন আমরা বলতাম, রশিদ শুধু টি-২০ টা-ই পারেন। সবচেয়ে কম ওয়ানডে খেলে তিনি যখন শততম উইকেট শিকার করে ফেললেন, তখন আমরা বলতাম, ছোট দলের সাথে খেলে এরকম উইকেট নেয়াই যায়। আসুক আমাদের সাথে, দেখা যাবে কত ধানে কত চাল!

সেই রশিদ যখন ওয়ানডে/টি-২০ তে বাংলাদেশকে আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে একাই ধরাশায়ী করে ফেলেন, তখনও আমাদের মুখ বন্ধ হয় না। তোতাপাখির মতো মুখস্ত বুলি আওড়ে যাই আমরা- রশিদ খান বয়স চুরি করেছেন, উনিশ বছরের কিউট রশিদ, হ্যানত্যান আরও কত কিছু! রশিদ আমাদের মুখে স্কচটেপ মেরে দেন টেস্টে তার পারফরম্যান্স দিয়ে, একাই হারিয়ে দেন বাংলাদেশকে, হয়ে যান ম্যাচসেরা, তাও আমাদেরই মাটিতে! বোলার রশিদের কথা বাদই দিলাম, ব্যাট হাতে রশিদ এই টেস্টে যে রানগুলো করেছেন, সেটাও তো বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যান দুই ইনিংস মিলিয়ে করতে পারলেন না!

একটা সময় বিরাট কোহলি ছিলেন এই বঙ্গের সবচেয়ে ঘৃণিত স্পোর্টস পার্সন। এখন সেই জায়গাটা রশিদ খান দখল করেছেন। অজুহাত, রশিদ খান বেয়াদব, রশিদ খান প্রতিপক্ষকে সম্মান করে না, পাত্তা দেয় না, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, রশিদ খান বয়স চুরি করে উনিশ বছরের ছোকরা সেজে থাকে- আরও কত অভিযোগ। কোহলি কোনদিন মুখে জবাব দেননি, ব্যাট হাতে দিয়েছেন। রশিদও নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েই বুঝিয়ে দিলেন, এই বাংলাদেশ দলকে গোনায় ধরার কিছু নেই, এই বাংলাদেশ দলকে নিয়ে মৌখিক সম্মানের বুলি ফোটানোরও কোন দরকার নেই।

এরপরেও একদল উজবুক হয়তো রশিদের বয়স নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করবে। কারণ কিছু লোকের লজ্জা-শরম হায়া-মায়া এসবের সফটওয়্যারগুলো ব্রেইনের সিস্টেম থেকে আনইনস্টল হয়ে গেছে চিরদিনের জন্যে। যাই হোক, তাতে রশিদ খানের কিছু যায় আসে না। আমরা তাকে নিয়ে ট্রল করবো, তিনি পারফরম্যান্স দিয়ে আমাদের ছারখার করে দেবেন প্রতিবার। কারণ আমরা ট্রলটাই পারি, হোমওয়ার্কটা আমাদের দিয়ে হয় না, হার্ডওয়ার্ক বলে কোন শব্দ তো আমাদের ডিকশনারিতেই নেই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button