খেলা ও ধুলা

ছিয়াত্তর বছর বয়সে দাঁড়িয়ে যিনি গিনেজ রেকর্ডসে নাম লেখানোর কথা ভাবেন!

রানী হামিদের সঙ্গে আমার পরিচয়টা প্রথম আলোর মাধ্যমে। আমি তখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি, ঢাকা থেকে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার দূরের এক মফস্বল শহরে আমার বাস। মাথায় তখন নতুন নতুন দাবার ভূত চেপেছে, খেলাটা শিখেছি ক’দিন আগেই। যেখানে দাবার খোঁজ পাই, ছুট লাগাই। বইপত্র পেলে গোগ্রাসে গিলতে থাকি, পত্রিকায় দাবার খবর তো মুখস্ত হয়েই থাকে।

গ্যারি কাসপারভ থেকে অ্যানাতোলি কারপভ, রগচটা ববি ফিশার থেকে ওই সময়ের ক্রেজ বিশ্বনাথন আনন্দ- সবার নাম আমি জানি। স্বদেশী গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ কিংবা জিয়াউর রহমানদেরও আমি চিনি। তখনই রানী হামিদের নাম শুনলাম, তিনি তখন মহিলা ফিদে মাস্টার। মধ্যবয়েসী এই মহিলা দেশের দাবা অঙ্গনের পরিচিত মুখ, বছর বছর তিনি চ্যাম্পিয়ন হন- তাই তার প্রতি আগ্রহ জাগাটাই স্বাভাবিক। তার ওপর যখন জানলাম ফুটবলার কায়সার হামিদ তার ছেলে, তখন আগ্রহের পরিমাণটা আরও বাড়লো।

দাবার প্রতি আগ্রহটা কমে গেছে অনেক আগেই, জীবনের স্রোতে এখন খেলাটার স্থান প্রায় নেই বললেই চলে। অনেকদিন পরে পত্রিকার পাতায় রানী হামিদের ছবি দেখে চমকে উঠলাম, ভদ্রমহিলা এখনও খেলছেন নাকি! খবর পড়ে জানলাম, ৩৯তম জাতীয় মহিলা দাবায় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন রানী হামিদ। ৭৬ বছর বয়সে জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে রানী হামিদ এতটাই উৎফুল্ল, যেন এই প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছেন!

৭৬ বছর বয়েসে এসে একজন নারী কি করতে পারেন?- এই প্রশ্নটা যদি আপনার মনের মধ্যে কখনও উঁকি দেয়, তাহলে রানী হামিদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখবেন। যে বয়সে আমাদের দেশের শতকরা আটানব্বই জন মানুষ কবরে এক পা দিয়ে রাখে, হাজারটা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি প্রায় হারিয়ে বসে থাকে, এই ভদ্রমহিলা সেই ৭৬ বছর বয়সে এসে দাপটের সাথে দাবা খেলে যাচ্ছেন, এখনও দেশের মহিলা দাবাড়ুদের মধ্যে তিনি সবার ওপরে, তাকে হারাতে পারছে না কেউই! নামের মতোই দেশের দাবা অঙ্গনে তিনি রানীর মতোই রাজ্যপাট সামলাচ্ছেন।

শুধু কি তাই? শিরোপা জেতার পরে তিনি কোথায় অবসরের ঘোষণা দেবেন, তা না করে রানী হামিদ উল্টো বলছেন, সামনের বছর চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিনেজ বুকে নাম লেখাতে চান! একটা মানুষের ভেতর প্রাণশক্তি কি পরিমাণ থাকলে এমনটা সম্ভব?

চার ভাই আর চার বোনের বড়সড় সংসারে রানী হামিদ ছিলেন তৃতীয়। সিলেটে জন্ম নেয়া রানী হামিদের দাবার প্রতি ঝোঁকের শুরুটা শৈশব থেকেই। বাবা মমতাজ আলী প্রতি সন্ধ্যায় বন্ধুদের নিয়ে দাবার আসর বসাতেন, সেখানে হাজির থাকতেন ছোট্ট রানীও। স্কুলজীবনে ভাল ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় ও এ্যাথলেট হওয়া সত্ত্বেও দাবাই ছিল রানীর প্রধান ভালবাসা। জীবনটা যে সেই ভালোবাসার হাত ধরেই কাটাতে পারবেন, সেই নিশ্চয়তা অবশ্য ছিল না তখনও।

১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন আবদুল হামিদের সঙ্গে বিয়ে হলো রানী’র, নামের সঙ্গে হামিদ পদবীটা জুড়ে গেল তখন থেকেই। স্বামী ছিলেন ভীষণ ক্রীড়ানুরাগী মানুষ, প্রতি সন্ধ্যায় ক্যান্টনমেন্টের টেনিস কোর্টে আর কেউ হাজির থাকুক বা না থাকুক, হামিদ সাহেবকে সেখানে দেখা যেতোই। তিনিই স্ত্রীকে উৎসাহ দিয়েছেন খেলাধুলার ব্যাপারে, দাবায় রানীর আগ্রহ আছে জেনে বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে পাঠিয়েছেন।

১৯৭৭ সাল থেকে ঢাকার প্রতিযোগীতামূলক দাবায় রানী হামিদ পরিচিত মুখ, প্রতিবারই দেখা গেছে তাকে।  ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতার আসর অনুষ্ঠিত হয়। অনেকের মতো সেখানে নাম লেখান রানী হামিদ। প্রথম অংশগ্রহণেই সবাইকে চমকে দিয়ে শিরোপা জিতে নেন তিনি। একবার-দু’বার নয়, টানা ছয়বছর ধরে জাতীয় মহিলা দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি, এই রেকর্ডটা কেউ ভাঙত পারেনি এখনও, ধারেকাছেও যেতে পারেনি অন্যরা।

এ পর্যন্ত মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশীপের আসর বসেছে মোট ৩৯ বার, এরমধ্যে বিশবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন রানী হামিদ, অর্ধেকেরও বেশি শিরোপা জমা আছে তার ঘরে! নারী-পুরুষ মিলিয়ে বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি বার শিরোপা জিততে পারেননি আর কেউই। সব মিলিয়ে ১১ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের অবস্থানটি গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের। শুধু নারীদের মধ্যে হিসাব করলে রানী হামিদের পর সবচেয়ে বেশি জাতীয় শিরোপা সৈয়দা শাবানা পারভীনের; মাত্র ৫ বার।

বয়স, বার্ধক্য, শারীরিক অসুস্থতা- কোনকিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। দাবার বোর্ডের সামনে বসলে তার মাথাটা মেশিনের মতো কাজ করতে শুরু করে আজও। বৃটিশ মহিলা দাবায় তিনবারের চ্যাম্পিয়ন তিনি, ১৯৮৪ সালেই ফিদে মাস্টার খেতাব অর্জন করেছিলেন আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশনের তরফ থেকে।

রানী হামিদের সমসাময়িক যারা ছিলেন, তারা তো খেলা ছেড়েছেন সেই কবেই। নব্বইয়ের দশকে যারা এসেছেন, তারাও অতীত হয়েছেন। গত দশকে যারা রানীর সঙ্গে খেলেছেন, তারা এখন সংসার-বাচ্চা সামলাচ্ছেন। অথচ রানী হামিদ এখনও খেলে চলেছেন, জিতে চলেছেন। এখন তার সঙ্গে যারা প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে, এদের অনেকেই তার নাতনীর বয়েসী, তাদের সামনে অনুপ্রেরণার ভাণ্ডার হয়ে টিকে আছেন তিনি এখনও।

৭৬ বছর বয়সে এসেও রানী হামিদ এখনও জিততে চান, বোর্ডে শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণের ছক কষেন। নিজের খেলা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না, চান আরও ভালো করতে। এবারের চ্যাম্পিয়নশীপ জেতার পরেই বলছিলেন-

“এখন তো আমার বয়স ৭৬ চলছে। আমি খেলার আনন্দে খেলছি। হয়তো নিজে ভালো খেলেছি বা অন্যরা খারাপ খেলেছে, তাই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তবে এবার একটু একটু শেকি ছিলাম। সবাই তো চায় চ্যাম্পিয়ন হতে। আমিও চেয়েছি। জাতীয় মিটে ২০টা শিরোপা বোধ হয় বিশ্ব রেকর্ড। আমি আসলে নিশ্চিত না। ৭৬ বছর বয়সে একজন চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম তুলেছে। তাকে সরিয়ে ৭৭ বছর বয়সে আমি চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম তুলতে চাই। তাই আগামী বছরটাও খেলার ইচ্ছা রাখি।”

রানী হামিদের কথাগুলো শুনে অন্যরকম একটা জগতে হারিয়ে গেলাম যেন। এই তরুণ বয়সেই আমাদের ঘিরে ধরে ক্লান্তি, আমরা হতাশ হয়ে যাই কত অল্পে, নিজেকে শেষ করে ফেলি মূহুর্তের ব্যবধানে, আমরা হাল ছেড়ে দেই দু-একবারের ব্যর্থতায়! অথচ রানী হামিদ ছিয়াত্তরে দাঁড়িয়ে পরের বছর চ্যাম্পিয়নশীপ জেতার চেষ্টা করবেন বলছেন! মানুষটার নিবেদনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় মাথা নত হয়ে আসার জন্যে এটুকুই যথেষ্ট…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button